kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

‘আমরা কি দ্যাশ ছাইড়ে চইলে যাব’

জলাবদ্ধতায় ভবদহের ৮০ গ্রামবাসীর হাহাকার

গৌরাঙ্গ নন্দী, ভবদহ ঘুরে    

১৬ অক্টোবর, ২০২১ ০৮:০৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘আমরা কি দ্যাশ ছাইড়ে চইলে যাব’

শোরের অভয়নগরের নওয়াপাড়া অনেক বড় বাজার, গঞ্জ। দেশের মধ্যে নামডাক সার-কয়লার ডিপো হিসেবে। খুলনা-যশোর সড়কের দুই পাশ ঘিরে উঁচু উঁচু বাণিজ্যিক স্থাপনা। নওয়াপাড়ার দক্ষিণে দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পগোষ্ঠী আকিজ গ্রুপের নানা প্রতিষ্ঠান। এরই পশ্চিম দিকে ভবদহ বলে পরিচিত বিশাল এলাকাজুড়ে চলছে মানুষের নীরব কান্না। তিন-চার বছর ধরে এলাকাটি কমবেশি জলাবদ্ধ। তবে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে প্রচুর বৃষ্টিপাতে সেই যে এলাকাটির ৮০টি গ্রাম পানিতে তলিয়ে গেছে, আর জাগেনি।

গ্রামগুলোর মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় এসে বসবাস শুরু করেছে। নওয়াপাড়া-মশিহাটি সড়কে গরু বাঁধতে বাঁধতে এক নারী বলে ওঠেন, ‘ডুবে মরা থেকে আমাইগে নিষ্কৃতি নেই। ফিবছর কার এই যন্ত্রণা ভালো লাগে! আমরা কি দ্যাশ ছাইড়ে চইলে যাব!’

ভবদহ প্রকৃতপক্ষে ২২টি কপাটের একটি স্লুইস গেট বসানো জায়গার নাম। ৫২টি বিলের পানি নিষ্কাশনের জন্য এখানকার শ্রী নদীর গলা টিপে ষাটের দশকে গেটটি বসানো হয়েছিল। ২০-২৫ বছর এটি নিষ্কাশনে কাজ করলেও পরে এলাকাবাসীর জন্য ‘মরণফাঁদ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভয়নগর উপজেলার পায়রা ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামে এই ভবদহ স্লুইস গেটের অবস্থান। অভয়নগর ছাড়াও ভবদহ এলাকা যশোরের মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলার অংশবিশেষ জুড়ে বিস্তৃত। মুক্তেশ্বরী, টেকা, হরি ও শ্রী নদী ছিল আগেকার প্রাকৃতিক নিষ্কাশন চ্যানেল। পলি পড়ে মুক্তেশ্বরী, টেকা, হরি ও শ্রী নদী নাব্যতা হারিয়ে ফেলায় পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় বৃষ্টির পানিতে বিলগুলো প্লাবিত হয়েছে, গ্রামগুলো ডুবে গেছে, এলাকার স্কুল-কলেজ, উপজেলা সংযোগকারী সড়ক—সবই জলমগ্ন হয়েছে। এর প্রভাবে এখন ৮০টি গ্রাম জলমগ্ন বলে ভুক্তভোগীদের দাবি। ভবদহের বেশির ভাগ সদস্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের। বছরের পর বছর একই সমস্যা জিইয়ে থাকায় এলাকাবাসী ত্যক্তবিরক্ত। অনেকেই বলা শুরু করেছে, ‘এটি মনে হয় পরিকল্পিতভাবে উচ্ছেদের চেষ্টা!’

নওয়াপাড়া থেকে মশিহাটি যেতে কিছুদূর এগোলেই রাস্তার ওপর পানির স্রোত চোখে পড়ে। সম্প্রতি সেখানে গেলে দেখা যায়, দু-একজন মানুষ হাঁটুপানি ভেঙে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ছোট ডিঙি নৌকায় কেউ কেউ পার হচ্ছে। ওটা পেরোলেই ডুমুরতলা গ্রাম। গ্রামের ১৪৮টি পরিবারের বাড়ি একেবারে পানির তলায়। এ ঘর ও ঘর যেতেও নৌকা বা সাঁকোর প্রয়োজন হচ্ছে। বেশির ভাগ বাড়িতে সাঁকো। বেশির ভাগ নলকূপ ডুবে গেছে। খাবার পানির সংকট। পয়োনিষ্কাশনের সুবিধাও নেই। ডুমুরতলার বাসিন্দা ও ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক রণজিৎ বাওয়ালী কালের কণ্ঠকে জানান, গত বছরের গ্রামের পানি একেবারে শুকায়নি। সেপ্টেম্বরের অতিবৃষ্টিতে গ্রাম, এলাকা একেবারে ডুবে গেছে। ৮০টি গ্রামের মানুষ জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে কষ্টের জীবন যাপন করছে।

মশিহাটি, ডহর মশিহাটি ও ডাঙ্গা মশিহাটি, মণিরামপুরের সুজাতপুর, বাজেকুলটিয়া, হাটগাছা প্রভৃতি গ্রামের একই দশা। ঘরবাড়ি হারিয়ে হাটগাছায় মণিরামপুর-নওয়াপাড়া সড়কের ওপর টং বানিয়ে অনেকে আশ্রয় নিয়েছে। রাস্তায় রয়েছে গৃহপালিত পশুও। মানুষের পাশাপাশি পশুর খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে।

মশিহাটি কলেজটি পানিতে ডুবে আছে। নিচতলার কক্ষগুলোয় ক্লাস করানো যাচ্ছে না। মাঠটি যেন জলাভূমি। বছরের পর বছর ধরে অবস্থা কখনো একটু ভালো হয়, আবার খারাপ হয়। অধ্যক্ষ মণিশান্ত মণ্ডল বলেন, এলাকার অবস্থাপন্ন পরিবারগুলো আর গ্রামে বসবাস করে না। নওয়াপাড়া, যশোরে গিয়ে তারা বসবাস করে। কাজের সুবাদেও অনেকে বাইরে থাকে। ফলে কলেজের শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে।

ভুক্তভোগীরা পানি নিষ্কাশনের এই সমস্যার জন্য বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রকৌশলীদের ভুল পরিকল্পনাকে দায়ী করছে। পরিকল্পিত জোয়ারাধার প্রকল্প (টিআরএম বা টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) বাস্তবায়ন না করে পাউবো এখন পাম্প করে পানি অপসারণের আজগুবি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বলে অনেকেই মন্তব্য করে। ভবদহ স্লুইস গেটের ওখানে বেশ কিছু পাম্প বসানো হয়েছে। গত বছর পাম্প বসানোয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পানি অপসারিত হয়েছে বলে তাদের দাবি। পাউবো যশোরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তাওহীদুল ইসলাম জানান, এই মুহূর্তে সেচযন্ত্র দিয়ে পানি বের করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে সাড়ে ৯ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। অর্থ বরাদ্দের পর এর কার্যক্রম শুরু করা হবে। ভবদহ ও সংলগ্ন এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার জন্য প্রায় ৮০৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, সেচযন্ত্র দিয়ে ভবদহের জলাবদ্ধতা দূর করার চেষ্টা অবাস্তব, হাস্যকর। ভবদহ অঞ্চলকে বিরান হওয়া থেকে রক্ষা করতে হলে টিআরএম বাস্তবায়ন করতে হবে। এটা না করে নদী খননের নামে অর্থ লুটপাটের জন্য বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। পাঁচ বছর ধরে শুধু নদী খনন করা হচ্ছে। এতে নদীর অবস্থা আরো খারাপ হয়েছে। খনন করে নদী বাঁচানো যাবে না। নদী বাঁচাতে প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে।

শ্রী নদীর যেখানে স্লুইস গেট বসানো হয়েছে সেখানে নদীতে ছিল তীব্র ঘূর্ণন স্রোত। সেখানে যেকোনো নৌকা একটু অসাবধান হলেই ডুবে যেত, মাঝিদের ভবলীলা (জীবন) সাঙ্গ হতো। তাই লোকমুখে এর নাম হয় ভবদহ। ভবদহে ষাটের দশকে নেদারল্যান্ডসের জ্ঞানে ও ইউএসএইডের ঋণে পোল্ডার ব্যবস্থাপনার আওতায় উত্তর দিককার ৫২টি বিলের পানি নিষ্কাশনের জন্য ২২ কপাটের গেট তৈরি করা হয়। অবশ্য পাশে ৯ কপাটের আরো একটি স্লুইস গেট তৈরি করা হয়। ১৯৮৬ সালে ভবদহে প্রথম বড় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।



সাতদিনের সেরা