kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

পুকুর বিএম কলেজের, মাছ ‘টুটুল মামা’র

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল   

১৩ অক্টোবর, ২০২১ ০৩:২৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পুকুর বিএম কলেজের, মাছ ‘টুটুল মামা’র

বরিশালের ব্রজমোহন কলেজের পুকুরে মাছ চাষের জন্য জালের বেড়া দেওয়ায় শিক্ষার্থীরা গোসল করতে পারছে না।

বরিশালের সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের ১২টি পুকুরে মাছ চাষ করছেন মহানগর আওয়ামী লীগের এক নেতা। করোনাকালে কলেজ বন্ধ থাকার সুযোগে প্রশাসনের কাছ থেকে মৌখিক ইজারা নিয়ে তিনি নেমেছেন মাছ চাষে। ওই নেতা মাছ চাষের জন্য জালের বেড়া দেওয়ায় শিক্ষার্থীরা পুকুরে নিত্যদিনের ব্যবহার্য কাজ সারতে পারছেন না। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরাজ করছে চাপা ক্ষোভ।

জানা যায়, কলেজের ১২টি পুকুরের আয়তন প্রায় ১৬ একর। সেখানেই লাখ লাখ টাকার মাছ চাষে মজেন বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক নিরব হোসেন টুটুল। শিক্ষার্থীসহ দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে তিনি পরিচিত ‘টুটুল মামা’ নামে।

ছাত্ররা অভিযোগ করেন, টুটুল মামার বেড়ার কারণে তাঁরা পুকুরেই নামতে পারছেন না। জামাকাপড় ধুতে হচ্ছে ছাত্রাবাসের শৌচাগারে। চার হাজার ছাত্রের জন্য মাত্র কয়েকটি শৌচাগার থাকায় তাঁদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। মাছ চাষের জন্য খাবার ব্যবহার করায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে আশপাশে। পুকুরের ঘাটে স্তূপাকারে পড়ে থাকে ময়লা-আবর্জনা। এ ছাড়া ব্যবহার না করায় পুকুর ভরে যাচ্ছে কচুরিপানায়।

কলেজ সূত্রে জানা যায়, ক্যাম্পাসের মহাত্মা অশ্বিনী কুমার ছাত্রাবাসের ভেতরে তিনটি, ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হক ছাত্রাবাসের দুটি, কবি জীবনানন্দ দাশ ছাত্রাবাসের একটি, বনমালী গাঙ্গুলী ছাত্রীনিবাসের দুটি, সুরেন্দ্র ভবন ছাত্রাবাসের একটি এবং কলেজ ক্যাম্পাসে তিনটিসহ ১২টি পুকুর রয়েছে। আবাসিক ছাত্রাবাসগুলোতে আসনসংখ্যা এক হাজার ২০০। কিন্তু সেখানে চার হাজার শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে থাকছেন। মহাত্মা অশ্বিনী কুমার ছাত্রাবাসে ৮০০ শিক্ষার্থীর বাস। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য শৌচাগার রয়েছে মাত্র আটটি। বেশির ভাগ সময় সেখানে আবার পানি থাকে না। ফলে অনেক শিক্ষার্থী পুকুরে গোসল সারেন। কিন্তু এখন আর তা সম্ভব হচ্ছে না।

কারণ, পুকুরগুলোতে চলছে মাছ চাষ। একই অবস্থা কলেজের বাকি চার ছাত্রাবাসের আটটি পুকুরেও। আওয়ামী লীগ নেতা টুটুলের কাছে পুকুরগুলোর নিয়ন্ত্রণ যাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা একদিকে যেমন বিপাকে পড়ছেন, অন্যদিকে সৌন্দর্য বিনষ্ট হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী কলেজটির।

ছাত্র মৈত্রী বিএম কলেজ শাখার সভাপতি আরাফাত হোসেন শাওন বলেন, ‘আমরা কলেজ কর্তৃপক্ষকে ইজারা বাতিলের পাশাপাশি পুকুরগুলোর চারপাশ থেকে জালের বেড়া খুলে দেওয়ার জন্য আলটিমেটাম দিয়েছি। ব্যাবসায়িক উদ্দেশ্যে কলেজের পুকুর ইজারা দেওয়া হয়েছে। যিনি ইজারা নিয়েছেন তিনি পুকুরগুলো মাছের ঘের হিসেবে ব্যবহার করছেন।’

কবি জীবনানন্দ দাশ ছাত্রাবাসের সুপার বিলাশ মণ্ডল জানান, তাঁর ছাত্রাবাসে দুটি পুকুর রয়েছে। ওই পুকুর দুটিতে জালের বেড়া দিয়েছেন কলেজ ছাত্রলীগ নেতা কবির হোসেন। জানতে চাইলে কবির বলেন, ‘টুটুল পুকুর ইজারা নিয়েছেন। তাই মাছ রক্ষায় পুকুরে জালের বেড়া দেওয়া হয়েছে।’

মহাত্মা অশ্বিনী কুমার ছাত্রাবাসের সুপার মোহাম্মদ শাহ আলম হাওলাদার জানান, তাঁর ছাত্রাবাসের আওতায় চারটি পুকুর। পুকুরগুলো কলেজ প্রশাসন ইজারা দিয়েছে বলে তিনি শুনেছেন। টুটুল নামের এক ব্যক্তি পুকুরগুলো  ইজারা নিয়েছেন।

বিএম কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ ও সচেতন নাগরিক কমিটি বরিশাল জেলার সভাপতি অধ্যাপক শাহ্ শাজেদা বলেন, ‘পুরো বিএম কলেজকে এখন মাছের ঘের মনে হচ্ছে। লাভের আশায় পুকুরগুলো কলেজ কর্তৃপক্ষ লিজ দিয়ে ঐতিহ্য নষ্ট করেছে।’

বিএম কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক ইমানুল হাকিম বলেন, ‘কলেজের পুকুর ইজারা ছাত্রাবাস কর্তৃপক্ষের কাছেই দেওয়া উচিত। এর আগে তেমনটিই করা হতো। ছাত্ররা ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করত। তবে আগে কাউকে জাল দিয়ে পুকুরের চারপাশ বেড়া দিতে দেওয়া হয়নি।’

বিএম কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. গোলাম কিবরিয়া বলেন, রাজস্ব আদায়ের জন্য পুকুরগুলো ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ইজারা দেওয়া হয়নি। কে বা কারা পুকুরগুলোতে জালের বেড়া দিয়েছে। এতে পুকুরের সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি আবাসিক ছাত্ররা সমস্যায় পড়েছে। জালগুলো সরিয়ে পুকুর ছাত্রদের জন্য উন্মুক্ত করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে মহানগর আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য সম্পাদক নিরব হোসেন টুটুল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কলেজ প্রশাসনের কাছ থেকে মৌখিকভাবে ইজারা নিয়ে মাছ চাষ শুরু করেছি। কিছুদিনের মধ্যেই কাগজে-কলমে ইজারা নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের যাতে কোনো রকম ভোগান্তি না হয় শ্রমিকদের সেদিকে খেয়াল রাখতে বলেছি।’



সাতদিনের সেরা