kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২ ডিসেম্বর ২০২১। ২৬ রবিউস সানি ১৪৪৩

বিশ্ব ডাক দিবস

চিঠি এখন শুধুই গল্পে, স্মৃতিতে, ইতিহাসে!

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

৯ অক্টোবর, ২০২১ ১৮:৩৪ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চিঠি এখন শুধুই গল্পে, স্মৃতিতে, ইতিহাসে!

ফজলুল হকের বাবা ও ভাই প্রবাসে থাকার সূত্র ধরে তিনি প্রতিমাসেই একাধিকবার ডাকঘরে আসতেন। চিঠি এসেছে কি-না জানতে কিংবা ডাক বাক্সে চিঠি ফেলার জন্য তাকে আসতে হতো। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার আজমপুরের ফজলুল হকের দুই ভাই এখানো প্রবাসে থাকেন। কিন্তু গত কয়েকবছরেও তাদের সঙ্গে চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ হয়নি। তিনি জানান, এখন মোবাইল ফোনেই চিঠির কাজ সেরে নেওয়া যাচ্ছে।

প্রবাসে থাকা বাবা ও চাচাদের চিঠি সংগ্রহের জন্য ডাকঘরের লাইনে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতার কথা বললেন আখাউড়া পৌর এলাকার কলেজপাড়ার বাসিন্দা শিরিন আক্তার। বাবা-চাচাদের পাশাপাশি স্বজনদের কাছেও প্রতিনিয়ত চিঠি লিখে ভালোমন্দ খোঁজ রাখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক কিছুর মতো চিঠি লেখাটাও উঠে গেছে। গত কয়েক বছরের মধ্যেও কাউকে চিঠি লেখা হয়নি বলে জানান তিনি।’

ডাকঘর যে ১১টি সেবা দেয় এর মধ্যে চিঠি পৌঁছানোর সেবা অন্যতম। চিঠি নিয়ে একটি জনপ্রিয় গান হলো, ‘ডাক পিয়নের হাজারো চিঠির ভিড়ে, তোমার চিঠি আসবে কিগো আমার কাছে ফিরে? কোথায় আছো নাকি হারিয়ে গেছো প্রলয়ও ঝড়ে।’ চিঠির গুরুত্বের কথা এ গানে খুবই স্পষ্ট।

তবে ৯ অক্টোবরের বিশ্ব ডাক দিবসকে সামনে রেখে খোঁজ নিয়ে গিয়ে জানা গেল, চিঠি যেন এখন শুধুই গল্পে, স্মৃতিতে, ইতিহাসে। সাধারণ মানুষ এখন আর খুব একটা চিঠি লিখেন না বলে ডাকঘরে এখন ইনভেলাপ (চিঠির খাম), পোস্টকার্ড বিক্রি একেবারেই উঠে গেছে। ইনভেলাপের দাম বাড়লেও কদর একেবারে নেই বললেই চলে। শুধুমাত্র সরকারি কিছু কাজে এর ব্যবহার হচ্ছে। অথচ বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিলি করতে দেখলেই পিয়নের কাছে জানতে চাওয়া হতো কোনো চিঠি এসেছে কি-না। চিঠি লেখার জন্যও গ্রামে লোক থাকত। একইভাবে কেউ চিঠি পড়েও দিতেন।

আখাউড়া পৌর এলাকার তারাগনের মো. আমান নামে এক ব্যক্তি বলেন, 'আমার কাছে অনেকেই আসতেন চিঠি লিখে দিতে কিংবা পড়তে। গত কয়েক বছর ধরেই চিঠি লিখতে বা পড়ানোর জন্য কেউ আসে না। মূলত প্রযুক্তির সুবিধার কারণে চিঠির প্রচলন উঠে গেছে।'

জেলার কসবা উপজেলা ডাকঘর সূত্রে জানা যায়, সেখানে চলতি মাসে কয়েকটা ইনভেলাপ বিক্রি হয়েছে। দুই টাকার ইনভেলাপ দাম বেড়ে পাঁচ টাকা হলেও এর কদর এখন শূন্যের কোঠায়। আখাউড়া উপজেলা ডাকঘর সূত্র জানায়, কয়েক বছর আগেও এখানে ৭০-৮০টি ব্যক্তিগত চিঠি এসেছে। কিন্তু এখন শুধুমাত্র কিছু অফিসিয়াল চিঠি আসে। সরাইল উপজেলা ডাকঘর সূত্র জানায়, এখানে কিছু ব্যক্তিগত চিঠি আসে। তবে সেগুলো আগের মতো ভালো মন্দ জানতে চাওয়ার নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডাকঘর সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী বলেন, ‘ডাকঘরগুলো এখন মূলত সঞ্চয়পত্র বিক্রি নির্ভর হয়ে পড়েছে। আগে যেমন চিঠির জন্য লাইন থাকতো এখন মাসের শুরুর দিকে সঞ্চয়পত্রের লাভের জন্য গ্রাহকরা এসে লাইন ধরেন। মূলত আধুনিকার ছোঁয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মোবাইল ফোনে যেখানে প্রতি সেকেন্ডেই বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে থাকা স্বজনদের খবরও নেওয়া যাচ্ছে সেখানে দিনের পর দিন মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয় বলে কেউ চিঠির দ্বারস্থ হবেন না সেটাই স্বাভাবিক।’

গল্পের টেলিগ্রাম

ডাকঘরে পাঠানো টেলিগ্রামের মাধ্যমেও একজন আরেকজনের ভালো-মন্দের খবর নিতেন। সেটিও এখন গল্পে পরিণত। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ২০১৩ সালে টেলিগ্রাম ব্যবহার বন্ধ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র ২০১৬ সালে, যুক্তরাজ্য ১৯৮২ সালে টেলিগ্রামের ব্যবহার বন্ধ করে। তবে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে টেলিগ্রামের ব্যবহার বন্ধ করা হলেও একটি এখন একেবারেই বিলুপ্ত।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে বিলুপ্ত এক টেলিগ্রামের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেখানকার গুনিয়াউক ১০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক মেশকাত আরা ফেরদৌস পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে গত বছরের ৭ জুলাই সেটি খুঁজে পান। ১৯৬৬ সালের ওই টেলিগ্রামে লেখা আছে, ‘ওয়াইফ সিরিয়াস কাম সোন।’ কাজী আসাদুল্লাহ, গ্রাম-গুনিয়াউক, পোস্ট-গুনিয়াউক ঠিকানায় ওই টেলিগ্রামটি আসে। টেলিগ্রামের উপরের দিকে লেখা পাকিস্থান টেলিগ্রাফ অ্যান্ড টেলিফোন ডিপার্টমেন্ট। ধারণা করা হচ্ছে, কারো স্ত্রীর অসুস্থতার খবর জানাতে স্থানীয় ডাকঘরে এ টেলিগ্রামটি পাঠানো হয়।



সাতদিনের সেরা