kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ কার্তিক ১৪২৮। ২৬ অক্টোবর ২০২১। ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

মির্জাপুরে ব্যস্ত রাস্তায় খানা-খন্দ, ঝুঁকিতে ভারী যান ও পথচারী (ভিডিও)

মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ১৫:২৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মির্জাপুরে ব্যস্ত রাস্তায় খানা-খন্দ, ঝুঁকিতে ভারী যান ও পথচারী (ভিডিও)

দেওহাটা-ধানতারা আঞ্চলিক সড়কের দেওহাটা বাসস্ট্যান্ড হতে শিল্পপতি নুরুল ইসলাম সেতু পর্যন্ত সড়কের দূরত্ব প্রায় সোয়া ৪ কিলোমিটার। সড়কটির ওপর বেশিরভাগ অংশে কার্পেটিং নেই। ওই অংশ দেখে বোঝার উপায় নেই সড়কটি কার্পেটিং করা হয়েছিল। এর মধ্যে আবার সড়কটির একটি ব্রিজের মাঝখানে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ব্রিজটির ওপর বিছানো হয়েছে প্লেনশিট।  

এই চার কিলোমিটার সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে ২০টি ইটভাটা। ওইসব ভাটায় মাটি, কয়লা, লাকড়ি ও ইট বহনে প্রতিদিন শত শত ভাড়ি যানবাহন চলাচল করছে। সড়কটিতে ভাড়ি ট্রাক চলার কারণে ইট, পিচ, খোয়া উঠে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্তের। ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই পাকা সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

এছাড়া সড়কটির বহুরিয়া ইউনিয়নের গেড়ামাড়া এলাকায় প্রায় ২৩০ ফুট রাস্তা বন্যার পানিতে ভেঙে গেছে। এতে এই রাস্তায় চলাচলকারীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। 

অতিদ্রুত মেরামত করা না হলে সড়কে চলাচলকারী জনসাধারণের দুর্ভোগ আরও চরমে উঠবে বলে ওই সড়কে চলাচলকারীরা মনে করছেন। সড়কটি দিয়ে স্থানীয়রা ছাড়াও সাভার, ধামরাই, মানিকগঞ্জ, কালিয়াকৈর ও সাটুরিয়া উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ যাতায়াত করে থাকেন।

সরেজমিন দেখা গেছে, ভারী যান চলাচলের কারণে কার্পেটিং উঠে পুরো সড়কটিতে অসংখ্য গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি হলেই ওইসব গর্তে পানি জমে। বিকল্প রাস্তা না থাকায় সড়কটির এরকম দশার কারণেও যানবাহন ও পথচারীদের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে।  

এছাড়া সড়কটির মীর দেওহাটা এলাকায় দীর্ঘদিনের জরাজীর্ণ ব্রিজের মাঝখানে গর্তের সৃষ্টি হয়ে ভেঙে পড়ায় স্থানীয়রা ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে সংস্কার করলেও ঝুঁকি রয়েছে বলে জানা গেছে। ব্রিজটির ওপর বিছানো হয়েছে একটি প্লেনশিট। সড়কটিতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন।

উপজেলা প্রকৌশল অফিস ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই ইউনিয়নের দেওহাটা থেকে ধামরাই হয়ে ঢাকা যাওয়ার অন্যতম সড়ক দেওহাটা-ধানতারা আঞ্চলিক সড়ক। এই সড়কটি মির্জাপুর উপজেলার সাথে পার্শ্ববর্তী ধামরাই, মানিকগঞ্জ, সাভার, সাটুরিয়া, ঢাকা ও কালিয়াকৈরের কয়েকটি ইউনিয়নে যোগাযোগের সহজ মাধ্যম। প্রতিদিন শত শত যানবাহন ও হাজারও মানুষ এই সড়ক দিয়ে চলাচল করে থাকেন।

১৯৯৪ সালে টাঙ্গাইল জেলা পরিষদ ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ের সড়কটির দেওহাটা এলাকায় ১২ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি ব্রিজ নির্মাণ করে। তারপর থেকে একাধিকবার ওই সড়ক সংস্কার ও পাকাকরণের কাজ হলেও জরাজীর্ণ ব্রিজটি তেমনিই রয়ে গেছে।

মির্জাপুর এলজিইডি অফিস ২০১৮ সালে দেওহাটা থেকে চান্দুলিয়া আলহাজ শিল্পপতি নুরুল ইসলাম ব্রিজ পর্যন্ত সোয়া ৪ কিলোমিটার সড়কটি সংস্কার করে। টাঙ্গাইলের আর এস এন্টারপ্রাইজ টেন্ডারের মাধ্যমে ৮৩ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়কটির সংস্কার বাস্তবায়ন করে। সংস্কারের ১৫ দিনের মধ্যেই এলাকাবাসী হাত দিয়ে কার্পেটিং টেনে তোলেন। এছাড়া কাজের মান নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ করেন। এ নিয়ে কালের কণ্ঠে সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়।  

স্থানীয়রা জানান, গত বছর ওই ব্রিজটির কয়েক স্থানে ফাটল দেখা দেয়। ভারী যানবাহন চলাচল অব্যাহত থাকায় তা আস্তে আস্তে ভাঙনে পরিণত হয়ে গর্তের সৃষ্টি হয়। স্থানীয় লোকজন ওই গর্ত ঢালাই দিয়ে সংস্কার করেন। এছাড়া সড়কটি কার্পেটিং উঠে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। গর্তে বৃষ্টি পানি জমে যানবাহনের চাকার ঘর্ষণে পুরো রাস্তা কাদায় পরিণত হয়। গর্তে পড়ে প্রতিদিন একাধিক যান বিকল হচ্ছে। এছাড়া পথচারীদের চলাচলে প্রতিনিয়নত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

গত রবিবার ওই এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ঝুঁকি নিয়ে জরাজীর্ণ ব্রিজের ওপর দিয়ে ছোট বড় যানবাহন চলছে। একটি যান ব্রিজের ওপর উঠলে অপর প্রান্তে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে।

২০১৮ সালে সড়কটির গেড়ামাড়া নামক স্থানে বন্যার পানিতে রাস্তাটি ভেঙে যায়। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. একাব্বর হোসেন এমপি বরাদ্দ দিয়ে রাস্তাটি মাটি ভরাট করান। কিন্তু গত বছরের বন্যায় পানির স্রোতে সড়কটির ওই স্থানে আবার ভেঙে যায়। এতে ওই সড়ক দিয়ে চলাচলকারীরা পড়েন দুর্ভোগে। বন্ধ হয়ে যায় সকল ধরনের যানবাহন চলাচল। 

মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে বহুরিয়া ইউপির পক্ষ থেকে চেয়ারম্যান মো. আব্দুস সামাদ দুই লাখ ৩০ হাজার টাকা খরচ করে একটি বাঁশের সাঁকো তৈরি করেন। সাঁকোটি ভেঙে বর্তমানে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো দিয়েই প্রতিদিন শত শত মানুষ ঝুকি নিয়ে চলাচল করছে বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী।    
রাস্তাটি ভেঙে যাওয়ায় দক্ষিণ মির্জাপুরসহ বিভিন্ন স্থানে যানবাহনের সরাসরি চলাচলও বন্ধ রয়েছে। সড়কটির ওই স্থানে সেতু না হওয়ায় এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।

সড়কটি দিয়ে ইউপি কার্যালয়, গেড়ামাড়া উচ্চ বিদ্যালয়, গেড়ামাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক, গেড়ামাড়া বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে শিক্ষার্থীসহ ইউনিয়নবাসী চলাচল করে থাকেন। এতে দক্ষিণ মীর্জাপুরে ফসলি জমিতে উৎপাদিত ধান, পাট, সরিষা, আখ, গম ও সবজিসহ বিভিন্ন প্রকার ফসল বিক্রিতে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষক।

মীর দেওহাটা গ্রামের টুটুল, কাদের, জুয়েল, শাজাহান ও রাজ্জাক জানান, সড়কটি ব্যস্ততম সড়ক। সময় বাঁচাতে ও দুর্ঘটনা এড়াতে ঢাকা, ধামরাই, সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ, কালিয়াকৈর ও মির্জাপুরের লোকজন এই সড়কটি ব্যবহার করে থাকেন। তিন বছর আগে সড়কটি নির্মাণ করা হলেও নিন্মমানের কাজ হওয়ায় নানা প্রশ্ন উঠেছিল। এছাড়া শুষ্ক মৌসুমে সড়ক দিয়ে ভাটার মালিকরা ড্রাম ট্রাক দিয়ে মাটি নেয়ায় দুর্ভোগের সৃষ্টি করে।

ওই সড়কে নিয়মিত চলাচলরত যানবাহনের চালক শওকত হোসেন, আরজু মিয়া, মফিজ উদ্দিন জানান, সড়কটির এমন অবস্থা হয়েছে বোঝার উপায় নেই যে সড়কটি কখনো কার্পেটিং করা হয়েছিল। ঝুঁকি নিয়ে যান চালাতে হচ্ছে বলে তারা জানান।  

সড়কটি দিয়ে নিয়মিত চলাচলকারী ধামরাই উপজেলার যাদবপুর গ্রামের আলমগীর হোসেন বলেন, ধামরাইয়ের যাদবপুর, বাইশাকান্দা, কুশুরিয়া, বাইল্যা, চৌহাট, সুতিপাড়া ও কালিয়াকৈর উপজেলার ডালজোড়া ও আটবহর ইউনিয়নের লোকজন এই সড়ক ব্যবহার করে থাকেন। ওইসব ইউনিয়নের মানুষ চিকিৎসাসেবা নিতে বিশেষ করে কুমুদিনী হাসপাতালে নিয়মিত আসেন। তাদের বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হয়। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মির্জাপুরের কয়েকজন ঠিকাদার বলেন, সড়কটিতে ৮/১০ টনের যানবাহন চলাচলের উপযোগী। সেখানে ২০/২৫ টনের যানবাহন চলাচল করছে। সড়কটি দিয়ে ২০টি ভাটা ও একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ভাড়ি ট্রাক চলাচল করে থাকে। এছাড়া প্রতি বছর শুস্ক মৌসুমে মাটি ভর্তি শত শত বড় ড্রাম ট্রাক ভাটায় চলাচল করে। এ কারনে সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। 

মির্জাপুর উপজেলা প্রকৌশলী মো. আরিফুর রহমান বলেন, প্রশস্ত ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পে এবং বিশ্বব্যাংকের ব্রিজ ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে তথ্য দেওয়া হয়েছে। এছাড়া গেড়ামাড়া গ্রামের ওই স্থানে ব্রিজ নির্মাণের জন্য প্রাক্কলন তৈরি করে সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে টেন্ডার হবে বলে তিনি জানান।



সাতদিনের সেরা