kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৫ কার্তিক ১৪২৮। ২১ অক্টোবর ২০২১। ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

যেভাবে রাজনৈতিক গুরু ও অধ্যাপকের স্ত্রীর টাকা মেরে দিয়েছিল বিচ্ছু সামশু!

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০৭:৪১ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



যেভাবে রাজনৈতিক গুরু ও অধ্যাপকের স্ত্রীর টাকা মেরে দিয়েছিল বিচ্ছু সামশু!

হুইপ সামশুল হক চৌধুরী।

চট্টগ্রামের পটিয়া আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর দালালি ও টাকা আত্মসাতের থাবার ঘা আজও সামলে উঠতে পারেননি বিচ্ছুর রাজনৈতিক গুরুখ্যাত প্রবীণ রাজনীতিবিদ একরামুল করিম এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রয়াত অধ্যাপকের স্ত্রী নিলুফার চৌধুরী। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম কাঁদছেন ব্যাবসায়িক টাকা হারিয়ে। আর অধ্যাপকের স্ত্রী কাঁদছেন তাঁর স্বামীর কাছ থেকে প্লট বিক্রির নামে নেওয়া টাকা প্রায় তিন দশকেও ফেরত না পাওয়ার দুঃখে।

চট্টগ্রামের প্রবীণ রাজনীতিবিদ একরামুল করিম। নব্বইয়ের দশকে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা এই প্রবীণ নেতা এখন বয়োবৃদ্ধ-রোগাক্রান্ত। শিষ্য হিসেবে রাজনীতির মাঠে এনেছিলেন সামশুল হক চৌধুরীকে। তখন একরামুল করিম ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের সভাপতি। তিনি বিচ্ছু সামশুলকে ডবলমুরিং থানা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক পদ দিয়ে রাজনীতির মাঠে আনেন। তিনি পরে নিজের ব্যাবসায়িক অংশীদার করে ব্যবসায়ও যুক্ত করেছিলেন বিচ্ছুকে। কিন্তু একদিন ‘রাজনৈতিক গুরুর’ ৪৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন সামশু। পরে অবস্থা এমন হয়, পুরো প্রতিষ্ঠানটিই বিক্রি করতে বাধ্য হন একরামুল করিম।

যেভাবে ‘গুরু’র টাকা আত্মসাৎ : যুবদল ছেড়ে ‘ডিগবাজি’ দেওয়া সামশু যুব সংহতি হয়ে পুনরায় বিএনপির মহানগর সাধারণ সম্পাদকের কাছে ফিরে যান এবং তাঁর আশ্রয়ে থেকে ব্যবসা করার চেষ্টা চালান। এ কারণেই চট্টগ্রামে প্রচার আছে, সামশুর রাজনৈতিক গুরু একরামুল করিম। কিন্তু প্রতারিত হতে হয় গুরুকেও।

একরামুল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি এক বন্ধুসহ রিচি অ্যাপারেলস নামে এনায়েত বাজার এলাকায় একটি গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি গড়ে তুলি। সেই ব্যবসায় যুক্ত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন সামশু। আমরা দুই বন্ধু তাঁকে রাখার সিদ্ধান্ত নিই। তিনজনে মিলে ভালোই চালাচ্ছিলাম। এক পর্যায়ে আমি রোগাক্রান্ত হয়ে একাধিকবার ভারতে চিকিৎসার জন্য যাই। ভারতে যাওয়া-আসা করতে করতে অনেক সময় পেরিয়ে যায়। পরে ব্যাবসায়িক হিসাব-নিকাশ করতে বসে দেখি রিচি অ্যাপারেলস থেকে সামশু প্রায় ৪৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে। এতে আমি মারাত্মকভাবে মনঃকষ্ট পাই। সামশু আমার সঙ্গে এভাবে প্রতারণা করবে সেটা সহ্য করতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত রিচি অ্যাপারেলস বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছি। এই মনঃকষ্ট আমি কখনোই ভুলতে পারিনি।’

চবি অধ্যাপকের টাকা আত্মসাৎ : বিএনপি নেতা একরামুল করিমের মাধ্যমে সামশুল হকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেমের। শান্তিপ্রীয় মানুষটি নগরীর কোতোয়ালি থানার আসকারদীঘির পাড় এলাকায় ভাড়া থাকতেন। এরশাদ আমলে মাহামুদুল ইসলাম চৌধুরী মেয়র থাকাকালে বর্তমানে সুগন্ধা নামে পরিচিত এলাকাটি ছিল সিটি করপোরেশনের ময়লার ভাগাড়। পরে সিটি করপোরেশন প্লট আকারে বিক্রির উদ্যোগ নিলে নামে-বেনামে কয়েকটি প্লট হাতিয়ে নেন সামশু।

অধ্যাপক আবুল কাশেমের স্ত্রী নিলুফার চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একদিন অধ্যাপক আবুল কাশেমের কাছে সামশুল হক পাঁচ কাঠার একটি প্লট বিক্রির প্রস্তাব দেন। এতে রাজি হয়ে অধ্যাপক কাশেম দুই দফায় পাঁচ লাখ করে ১০ লাখ টাকা দেন সামশুল হককে। ১৯৯৫ সালে সামশুল হক আমাদের প্লটটি চিহ্নিত করে দেন এবং বেড়া দেওয়ার জন্য অধ্যাপককে পরামর্শ দেন। অধ্যাপক কাশেম শ্রমিক ও নির্মাণসামগ্রী নিয়ে নিজের প্লট বেড়া দিতে গেলে একদল সন্ত্রাসী ওই প্লটে গিয়ে হাজির হয়। বেড়া দিতে বাধা দেয় তারা। পরে আমরা জেনেছি সামশুল হকই সন্ত্রাসীদের পাঠিয়েছিল। বাধা পেয়ে নিরীহ অধ্যাপক বাসায় ফেরেন এক বুক বেদনা নিয়ে। সামশুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি ‘টাকা ফেরত দিব, দিচ্ছি’ করে ১৭ বছরেও আর টাকা ফেরত দেননি। এই ক্ষোভ-দুঃখ নিয়েই ২০১২ সালে অধ্যাপক মারা যান।

নিলুফার চৌধুরী দুঃখ করে বলেন, ‘নব্বই দশকের ১০ লাখ টাকা মানে বর্তমানে কোটি টাকারও বেশি। শেষে নানা সূত্র থেকে জেনেছি, চট্টগ্রামের একটি শিল্প গ্রুপের কাছে এই জমি বিক্রি করে দিয়েছেন সামশুল হক। এই কারণেই অধ্যাপক আবুল কাশেমের সঙ্গে প্রতারণা করেছিলেন। অথচ এই প্লটটির বর্তমান মূল্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘অধ্যাপকের মৃত্যুর পর আমি একাধিকবার সামশুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করি। কিন্তু তিনি আর টাকা দেননি। এখন তো হুইপ পদে আছেন। বিশাল ক্ষমতাধর ব্যক্তি। ফলে এখন আর ফোন ধরেন না।’ ‘আমি নিজেও এখন বার্ধক্যে উপনীত হয়েছি’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জানি না, মৃত্যুর আগে স্বামীর হকের টাকা ক্ষমতাধর বিচ্ছুর কাছ থেকে ফেরত পাব কি না।’ জানা যায়, অধ্যাপকের স্ত্রী নিরুপায় হয়ে চট্টগ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

পৌর নালা দখল করে মার্কেট, অতঃপর : চট্টগ্রাম পৌর করপোরেশনের কমিশনার পদে থাকার সুবাদে রিয়াজউদ্দিন বাজারে নালা দখল করে একাধিক মার্কেট গড়ে তোলেন বিচ্ছু সামশু। এর মধ্যে একটি মার্কেটের তথ্য তিনি নির্বাচন কমিশনে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন, যার আয়তন প্রতি ফ্লোরে ৯০০ বর্গফুট। চার ফ্লোরে ৩৬০০ বর্গফুটের এই মার্কেটের মূল্য তিনি দেখিয়েছেন মাত্র দুই লাখ ৮০ হাজার টাকা। প্রতি বর্গফুটের গড় মূল্য প্রায় ৭৮ টাকা মাত্র। মূলত দখল করা নালায় মার্কেট নির্মাণ করার কারণেই কম মূল্য দেখানো হয়েছে বলে মনে করছেন কর আইনজীবীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্বৈরশাসক এরশাদ ক্ষমতা দখলের পর চট্টগ্রাম পৌরসভাকে পৌর করপোরেশন ঘোষণা করে একজন ব্রিগেডিয়ারকে প্রশাসক পদে নিয়োগ করা হয়। ওই পৌর প্রশাসকের হাত ধরে বিচ্ছু সামশুর আর্থিক উত্থান হয়েছিল। ওই সময়ই পৌরসভার ড্রেনের ওপর মার্কেট নির্মাণের ‘সাহস’ দেখিয়েছিলেন বিচ্ছু সামশু। ওই মার্কেট থেকে বিপুল পরিমাণ আয় হয়েছিল তাঁর। এই প্রশাসকের হাত ধরে আর্থিক উত্থানের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী পৌর করপোরেশনের মেয়র হওয়ার পর পর্যন্ত। মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী উদ্যোগ নিয়েছিলেন পাঁচলাইশ থানার অদূরবর্তী ময়লার ভাগাড় সরিয়ে প্লট তৈরির। সেখান থেকেই বিচ্ছু সামশু কৌশলে বেশ কয়েকটি প্লট বরাদ্দ নেন। সেই প্লট বিক্রির নাম করেই অধ্যাপক আবুল কাশেমের ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছিলেন বিচ্ছু সামশু।

বিচ্ছু সামশুকে চেনেন-জানেন এমন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতাদের একজন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি অভিজিৎ ধর বাপ্পি। কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, ‘আশির দশকে সামশু সিনেমার টিকিট ব্ল্যাকার, শাড়ি চোরাকারবারি ও আদমবেপারী ছিল। ছিনতাইয়ের সঙ্গেও যুক্ত ছিল বলে জানি। ওই সময় যুবদল নেতা সেজে যাওয়া বিচ্ছু পরে জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়। জমির দালালি করার পাশাপাশি পৌর শহরের নালা ভরাট করে দোকান নির্মাণের পর বিক্রি করে টাকা হাতিয়ে নেয়। সেই বিচ্ছু এখন আওয়ামী লীগের কোলে দোল খাচ্ছে।’

ডিগবাজির আদ্যোপান্ত : জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসেন এরশাদ। ক্ষমতালোভী সামশুল এই সুযোগে ডিগবাজি দেন। হয়ে যান জাতীয় পার্টির অঙ্গসংগঠন যুব সংহতির নেতা। নোঙর করেন আলকরণ এলাকায়। যেখান থেকে তাঁর হকার জীবনেরও শুরু। এরপর ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রাম পৌর করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে আলকরণ ওয়ার্ড থেকে কমিশনার হন। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় একটি কমিটি করেছিল। সেই কমিটিরও সদস্য সচিব হয়েছিলেন বিচ্ছু। অথচ তাঁর বিরুদ্ধেই অভিযোগ ছিল আলকরণ নিউ মার্কেট ও রিয়াজউদ্দিন বাজার এলাকায় ছিনতাইকারীদের নিয়ন্ত্রণ করার। কমিটিতে ঢুকে তিনি উল্টো ছিনতাইকারীদের রক্ষক হয়ে ওঠেন।

এরশাদের পতনের পর আবারও ডিগবাজি! কালের কণ্ঠকে একরামুল করিম চৌধুরী আরো বলেন, ‘১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করে। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমার কাছে আশ্রয় পাবে ভেবে সামশু ফিরে আসে আমার কাছে। আমিও না করিনি।’

জানা যায়, এরশাদের পতনের পর ‘রাজনৈতিক এতিম’ হয়ে পড়েন বিচ্ছু সামশু। তখন আন্দরকিল্লা মোড়ে উত্তম-মধ্যমও দিয়েছিল যুবদল কর্মীরা। তার পরই সামশু ফের গুরুর কাছে ফিরে যান।



সাতদিনের সেরা