kalerkantho

সোমবার  । ১২ আশ্বিন ১৪২৮। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৯ সফর ১৪৪৩

স্মৃতিচিহ্ন মোছার অপতৎরতা

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর প্রেমীরা দমবার নয়

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

৬ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ১০:১৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর প্রেমীরা দমবার নয়

সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে। তবে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার কুমারশীল মোড়ের বাড়িতে থেকে তিনি নিয়মিত সংগীত চর্চা করতেন। নিজের কেনা বাড়িতেই ১৯৫৬ সালে সংগীতাঙ্গন গড়ে তোলেন আলাউদ্দিন খাঁর ভাই আয়াত আলী খাঁ।

পাঁচ বছরের ব্যবধানে দুইবার সেখানে নারকীয় তাণ্ডব চালানো হয়। পুড়িয়ে দেওয়া হয় সংগীতাঙ্গনের ভবনসহ নানা ধরনের স্মৃতিচিহ্ন। তবে তার পরও দমে থাকার নয় আলাউদ্দিনপ্রেমীরা। পাঁচ বছর আগের মতো আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে।

সংগীতজ্ঞ আলাউদ্দিন খাঁর ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকী সামনে রেখে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চোখে পড়ে। সংগীতাঙ্গনে প্রথমবারের মতো তৈরি করা হয়েছে আলাউদ্দিন খাঁর ম্যুরাল। যেখানে আজ সোমবার সকালে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে সুরসম্রাটকে শ্রদ্ধা জানানো হবে। স্মৃতিচিহ্ন ধরে রাখতেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী পালন উপলক্ষে নিজ উপজেলায়ও কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

কথা হয় সুরসম্রাট দি আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলমের সঙ্গে। এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘যতবার আঘাত আসে সেটার পর আরো তেজদীপ্ত হয়ে আমরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনকে আবারও নতুন করে সাজানো হয়েছে। এখানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে। অচিরেই ক্লাস শুরু হবে। বর্তমান সরকারের কাছে আমি আবেদন জানাব যে এ ধরনের তাণ্ডব থেকে রক্ষা পেতে দ্রুত যেন পদক্ষেপ নেওয়া হয়।’

রবিবার দুপুরে সরজমিনে গিয়ে সংগীতাঙ্গনে প্রবেশ করতেই দেখা যায়, ম্যুরালের সামনে টাইলস লাগানোর কাজ করছেন চারজন শ্রমিক। চলছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজও। এসবের তদারকি করছেন সংগীতাঙ্গনের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম।

সংগীতাঙ্গন ভবন ও সরোদ মঞ্চে গিয়ে দেখা যায়, সব কিছুই আবার নতুন করে করা হয়েছে। পুড়ে যাওয়া ভবনে নতুন করে পলেস্তারার পর রং করা হয়েছে। দরজা-জানালাও লাগানো হয়েছে নতুন করে। ভবনের একটি কক্ষে গিয়ে দেখা গেছে লোহার তৈরি খুবই মজবুত একটি টং। যেটিতে আলাউদ্দিন খাঁ নিজের বাদ্যযন্ত্র রাখতেন। দুইবারের তাণ্ডব থেকেই রক্ষা পায় এটি। ওই কক্ষেই রয়েছে আলাউদ্দিন খাঁর হাতের স্পর্শ পাওয়া দুটি তবলা। জাদুঘরে বেহালাসহ রয়েছে আরো তিনটি বাদ্যযন্ত্র।

সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে ছিল আড়াই শর মতো দুর্লভ বই, ছবি, দলিলপত্র, আলাউদ্দিন খাঁর হাতে লেখা চিঠি। বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল সরোদ, ১২টি হারমোনিয়াম, ১৯ জোড়া তবলা, সেতার, বেহালা, খঞ্জন, রবাব। এর মধ্যে কিছু কিছু বাদ্যযন্ত্র আলাউদ্দিন খাঁর ব্যবহৃত। প্রথমে ২০১৬ সালের ১২ জানুয়ারি ও সর্বশেষ এ বছরের ২৮ মার্চ তাণ্ডব চালিয়ে এসব স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করে ফেলা হয়। ২০১৬ সালে অটোরিকশার ভাড়াকে কেন্দ্র করে মাদরাসাছাত্ররা ও এ বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলামের ডাকা হরতালের সমর্থনকারীরা এ তাণ্ডব চালায়।

আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনকে ঘিরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সুরের মূর্ছনা বয়ে যায়। এখানে নাচ, গানসহ চারটি বিভাগে আড়াই শর মতো শিক্ষার্থী রয়েছে। আলাউদ্দিন সংগীতাঙ্গনের সরোদ মঞ্চে সংগঠনটির নিজেদের অনুষ্ঠানের পাশাপাশি বছরজুড়েই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়ে থাকে।

আলাউদ্দিন খাঁ সংগীতাঙ্গনের সহ-সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল-মামুন সরকার রবিবার সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রাণের মূল ভিত্তি হলেন উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ সংগীতজ্ঞ ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ। যে মৌলবাদীগোষ্ঠী সংস্কৃতিকে বিশ্বাস করে না তারাই বারবার এ ধরণের হামলা করছে। তারা যতবারই হামলা করেছে ততবারই ঘুরে দাঁড়ানো হয়েছে।’

ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ১৮৬২ সালের ৮ অক্টোবর নবীনগর উপজেলার শিবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯১৮ সাল থেকে তিনি ভারতের মাইহারে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানকার ‘মদিনা ভবনে’ ১৯৭২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তিনি মারা যান।



সাতদিনের সেরা