kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৮। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ২০ সফর ১৪৪৩

১২ বছর পর মনসুর বাড়ি ফিরলেও ফিরে পাননি সংসার, স্ত্রী-সন্তান

আঞ্চলিক প্রতিনিধি, ময়মনসিংহ   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ২৩:৪১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



১২ বছর পর মনসুর বাড়ি ফিরলেও ফিরে পাননি সংসার, স্ত্রী-সন্তান

মানসিক অসুস্থতার কারণে মাঝে মধ্যেই নিজ বাড়ি ছেড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যেতেন আবুল মনসুর (৪৫) বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তান রেখে এক দিন সত্যিই তিনি নিরুদ্দেশ হয়ে যান। কোথাও খোঁজে পাওয়া যায়নি তাকে।

হারিয়ে যাওয়ার দীর্ঘ এক যুগ পর গত শুক্রবার বাড়ি ফিরে এলেও তাঁর জন্য অপেক্ষা করেনি সময়। স্ত্রী সন্তান নিয়ে বিয়ে করেছেন অন্যত্র। বাবা-মা বয়স এবং সন্তানের ভাবনায় এখন রোগাক্রান্ত। যেন সিনেমা, নাটকের গল্প।

নিখোঁজ হওয়া আবুল মনসুর হচ্ছেন- ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার হিজলদানী গ্রামের মো. আবুল মনসুরের ছেলে। হারিয়ে যাওয়ার পর খোঁজে পেতে পরিবার পীর সন্ন্যাসী, মাজার ও কবিরাজ ধরেও সন্ধান পাওয়া যায়নি মনসুরের। এ অবস্থায় ছেলের আশা একরকম ছেড়েই দিয়েছিলেন পরিবারের সদস্যরা। হঠাৎ তাঁকে ‘জীবনের গল্প’ নামে মোবাইলে একটি ইউটিউব চ্যানেলে দেখতে পান এলাকার এক ব্যক্তি। পরে সেই চ্যানেল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত লোকজনের সহায়তায় তাঁকে খুঁজে পান।

আজ রবিবার দুপুরে হিজলদানী গ্রামে গিয়ে আবুল মনসুরকে খুঁজে বের করেন এ প্রতিবেদক। তিনি বিড় বিড় করে কথা বলে বাড়িতে প্রবেশ করেন। গ্রামের লোকজন জানান, তাঁর (মনসুর) মাথা ঠিক নাই। তাঁর বাবা মো. শান্তু মিয়া বলেন, তাঁর তিন ছেলের মধ্যে আবুল মনসুর সবার বড়। সে কৃষি কাজ করতো।

প্রায় ১২ বছর আগে একই গ্রামের এক তরুণীর সঙ্গে মনসুরের বিয়ে দেন। দিন ভালোই যাচ্ছিল। এক পুত্র সন্তান হওয়ার পর মনসুর কিছুটা অপ্রকৃতস্থ হয়ে পড়ে। হাতের কাছে যা পেত তা দিয়ে গাছ-গাছালিতে সমানে আঘাত করতো। হঠাৎ করে এক দিন সে নিখোঁজ হয়। পরে মাসের পর মাস বিভিন্ন স্থানে খুঁজেও মনসুরের সন্ধান পাননি। 

শান্তু মিয়া বলেন, এভাবে দিন যায়, বছর যায়। অনেক কিছু পরিবর্তন হয়। কিন্তু ছেলেটি আর ফিরে আসেনি। এদিকে একমাত্র সন্তান তামিমকে নিয়ে মনসুরের স্ত্রী স্বামীর আগমনের অপেক্ষা করতে থাকেন। কিন্তু মনসুর আর আসেনি। 

স্বামীর অপেক্ষায় থাকতে থাকতে মনসুরের স্ত্রী ঢাকায় গিয়ে পোশাক কারখানায় চাকরি নেন। কিছুদিন পর তাঁর পুত্রবধূ আরেক তরুণকে বিয়ে করে ঘর বাঁধে। মনসুরের সন্তান থেকে যায় স্ত্রীর সঙ্গে। শান্তু মিয়া বলেন, কি করব। মেয়েটি তাঁর স্বামীর অপেক্ষায় দীর্ঘ সময় শ্বশুর বাড়িতে কাটিয়েছে। তাঁরও তো একটা ভবিষ্যত আছে। তাই বিয়েতে তিনি অমত করেননি।

পাড়ার বাসিন্দা ও কলেজছাত্র আকাশ মিয়া বলেন, তাঁদের কিছু স্বজন রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে কর্মসূত্রে বসবাস করেন। এক দিন এক ইউটিউব চ্যানেলে রাস্তার কিছু মানুষের সাক্ষাৎকার প্রচার হচ্ছিল। চ্যানেলটির এক প্রশ্নকর্তা একজন লোককে ‘সাবস্ক্রাইব’ শব্দটি উচ্চারণ করতে বলেন। লোকটি নান্দাইলের আঞ্চলিক ভাষায় ‘সাবস্ক্রাইব’ শব্দটি উচ্চারণ করছিল। তবে উচ্চারণ সঠিক না হলেও প্রশ্নকর্তা ওই লোককে একটি বিস্কুট ও পঞ্চাশ টাকা উপহার দেন। এ দৃশ্য দেখার পর স্বজনরা মনসুরকে চিনে ফেলে।

পরে খোঁজ-খবর করে মনসুরকে পাওয়া যায়। তাঁকে উদ্ধার করে তাঁর নিজ গ্রাম নান্দাইল উপজেলার রাজগাতী ইউনিয়নের হিজলদানীতে নিয়ে যায় স্বজনরা। সেখানে গিয়ে তিনি বাবা-মা ও ভাইকে চিনতে পারেন। 

মনসুরের মা লতিফা বেগম একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বলেন, এক দিন আমার ছেলের সংসার, সন্তান সব ছিল। এখন কিছুই নেই। গ্রামের সড়কে আপন মনে বিড় বিড় করে সে ঘুরে বেড়ায়। আমরা গরিব মানুষ। সহায়-সম্পদ বলতে কিছুই নেই। পরের জমি চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকি। এক যুগ পর ছেলেকে ফিরে পেয়ে তাঁর চিকিৎসা করাচ্ছি। আপনারা যদি পারেন কিছু সহায়তার ব্যবস্থা করেন। 

প্রতিবেশীরা জানান, ছেলেটি যদি পরিবারের সঙ্গে থাকতো হয়তো কিছুটা ভালো হতো। এখনো যদি ভালো চিকিৎসা করোনো যায় তবে সুস্থ হতে পারে। এ অবস্থায় বিত্তবানদের সহায়তা প্রয়োজন।



সাতদিনের সেরা