kalerkantho

শুক্রবার । ২ আশ্বিন ১৪২৮। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ৯ সফর ১৪৪৩

তীরে ট্রলার, লইসকা বিলের পানিতে ডুবে আছে স্বপ্ন!

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

৩০ আগস্ট, ২০২১ ১০:৪৪ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তীরে ট্রলার, লইসকা বিলের পানিতে ডুবে আছে স্বপ্ন!

দুর্ঘটনাকবলিত ট্রলারটি উদ্ধার করে তীরে আনা হয়েছে। ছবি: কালের কণ্ঠ

উৎসুক জনতার প্রচন্ড ভিড়। কেউ নৌকায়, কেউ পাড়ে। হঠাৎ হৈহুল্লুড়। সবাই একত্রিত হলেন। নজর পানি থেকে উঠাতে থাকা ট্রলারের দিকে। চোখেমুখে উৎকণ্ঠা। সেই উৎকণ্ঠার সমাপ্তি হলো, যখন ঘোষণা এলো ট্রলারে আর কোনো লাশ নেই।

দুর্ঘটনায় নিমজ্জিত ট্রলারটি তীরে ভিড়ানো গেলেও বিলের পানিতে ডুবে আছে বহু স্বপ্ন। যে স্বপ্ন আর কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। স্বপ্নের মৃত্যু ঘটা পরিবারগুলোতে এখন চলছে শোকের মাতম। পরিবারের ভবিষ্যত চিন্তায় অনেকেই হতাশ।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরের লইসকা বিলে ট্রলার ডুবির প্রায় ৪২ ঘন্টা পর রবিবার (২৯ আগস্ট) বেলা পৌনে ১১টার দিকে সেটি উদ্ধার করা হয়। তবে ট্রলারতে আর কোনো লাশ পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ আভ্যন্তরীন নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও ফায়ার সার্ভিসের যৌথ অভিযানে ট্রলারটি উদ্ধার করা হয়।

এদিকে ট্রলারডুবির ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ এ। জামিলা খাতুন নামে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাদেকপুর এলাকার এক নারীর মৃত্যুর বিষয়টি রবিবার নিশ্চিত হয় স্থানীয় প্রশাসন। ট্রলার ডুবির দিন ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। স্বজনরা লাশ নিয়ে যান বলে তাৎক্ষনিকভাবে ওই নারী সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জামিলা বেগমের নাতি তানবীর হোসেনও দুর্ঘটনায় মারা যায়।

ডাক্তার হওয়া স্বপ্ন পূরণ হলো না

ট্রলার ডুবির খবরটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে শেয়ার দেন সৌদি প্রবাসী জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া। তখনও তিনি জানতেন না যে ট্রলারের সঙ্গে ডুবে সঙ্গে তাঁর স্বপ্ন। যখন জানলেন তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া দেশে এসেছেন। মেডিক্যাল শিক্ষার্থী ছেলে আরিফ বিল্লাহ মামুনের লাশের পাশে বসে ছেলের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নের কথা বলে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকেন।

শুক্রবারের ট্রলার দুর্ঘটনায় অকালে ঝড়ে যাওয়া আরিফ ঢাকার গ্রীন লাইফ মেডিক্যাল কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। বাড়ি বিজয়নগর উপজেলার চম্পকনগরে। রবিবার দুপুরে সেখানকার পারিবারিক কবরস্থানে আরিফের দাফন সম্পন্ন হয়। প্রবাসী বাবা-মাকে দেখানোর জন্য আরিফের লাশ গত দু’দিন ফ্রিজিং গাড়িতে রাখা হয়। স্বজন, বন্ধু-বান্ধবসহ শত শত মানুষ আরিফের লাশ দেখতে তার বাড়িতে ছুটে আসেন।

আরিফের বাবা জহিরুল হক ভূইয়া বলেন, ‘১৮ লাখ টাকা খরচ করে ছেলেকে মেডিক্যালে ভর্তি করিয়েছিলাম। অনেক স্বপ্ন ছিলো ছেলেকে চিকিৎসক বানানোর। ট্রলারডুবির ঘটনার খবর পাওয়ার পর জানতাম না এটাতে আমার ছেলে ছিলো। খবরটি আমি ফেসবুকেও শেয়ার দেই। পরে স্বজনরা আমাকে ফোন করে জানায়। এখন আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে।’

বার বার মূর্ছা যাওয়া নিহত আরিফের মা পারভীন আক্তার বলেন, ‘এমন মৃত্যু যেন আর কারো না হয়। আমার ছেলের মৃত্যুই যেন হয় শেষ মৃত্যু।’ এ ঘটনায় দায়ী সকলের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়ে বিচারের দাবি জানিয়েছেন তিনি।

সেলিমের পরিবারে শোকের মাতম

ট্রলার ডুবির ঘটনায় বিজয়নগর থানায় দায়ের শুক্রবার রাতে দায়ের করা একমাত্র মামলার বাদী উপজেলার গেরাগাঁও গ্রামের মো. সেলিম মিয়া। মা, খালাসহ চার স্বজনকে হারিয়েছেন সেলিম। নিহত সবার দাফন শেষ হয়েছে। সেলিম মিয়া ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বালুবাহী ট্রলারের চালকসহ সাতজনকে আসামী করে মামলা দায়ের করলে পুলিশ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠায়।

‘মা আমারে ঠেলা দিয়া লোকের কাছে দিয়া দিছে’

‘নৌকা ডুইব্বা জাঅনের সম মা আমারে ঠেলা দিয়া একটা লোকের কাছে দিয়া দিছে। পরে অই লোকটা আমারে পাড়ে লইয়া আইছে।’ ট্রলার ডুবির ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ছয় বছরের মন্দিরা বিশ্বাস এভাবেই বলছিলো। মামা পরিচয় দিয়ে মোবাইল ফোনে কৌশলি আলাপচারিতায় মিনিট খানেক কথা বলে মন্দিরা।

শুক্রবার বিকেলে ট্রলার ডুবির ঘটনায় মন্দিরার মা অঞ্জনা বিশ্বাস (৩০) ও আড়াই বছর বয়সী বোন ত্রিদিবা বিশ্বাস মারা যায়। তবে সাঁতরে তীরে উঠে বেঁচে গেছে মন্দিরার বড় ভাই সৌরভ বিশ্বাস (১৭)। ট্রলার ডুবির ঘটনা মন্দিরাকে তাড়া করে।

পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিজয়নগর উপজেলার চম্পকনগর ইউনিয়নের আদমপুর গ্রামের পরিমল বিশ্বাসের স্ত্রী অঞ্জনা বিশ্বাস দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে তার প্রবাসীফেরত ভাই হরিপদ বিশ্বাসকে দেখতে বাবার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার গোকর্ণ ঘাটে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে লইসকার বিলের মনিপুর এলাকায় বালু বোঝাই ট্রলারের সাথে ধাক্কায় তাদের ট্রলার ডুবে যায়। ট্রলারের ভেতরের অংশে থাকা অঞ্জলি মেয়ে মন্দিরাকে নৌকার ফাঁক দিয়ে বালু বোঝাই ট্রলারে থাকা লোকদের হাতে তুলে দেন। মন্দিরাকে বের করে দিতে পারলেও অঞ্জলি ও তার আড়াই বছরের কন্যা ত্রিদিবা বিশ্বাস ট্রলার থেকে বের হতে পারেননি।

পরিবারের সদস্যরা আরো জানান, মন্দিরার মনে এখন কি যেন একটা ভয় কাজ করছে। সে খুব একটা কথা বলতে চাইছে না। মায়ের জন্য কান্নাকাটি করছে। এটা সেটা বুঝিয়ে তাকে রাখা হচ্ছে। মন্দিরা এখনো জানেনা তার মা বেঁচে নেই।

নবপরিণিতার শেষ পরিণতি

বিয়ে, বৌভাত শেষে ফিরতি আনুষ্ঠানিকতা শেষে স্ত্রী শারমিন আক্তারকে নিয়ে শশুর বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভাটপাড়া গ্রামে যাচ্ছিলেন বিজয়নগর উপজেলার পাহাড়পুর গ্রামের আউলিয়া বাজারের জহিরুল ইসলাম। ট্রলার দুর্ঘটনায় তাদের দাম্পত্য জীবনের চির সমাপ্তি ঘটিয়েছে।

দুর্ঘটনার পর বিলের পাড়ে জহিরুলের কান্না দেখে অনেকের চোখেই পানি চলে আসে। লাশ উদ্ধারের পরও জহিরুলের কান্নায় বাতাস ভারি হয়ে উঠে। দুর্ঘটনার জন্য জহিরুল তাদেরকে বহনকারী ট্রলারের মাঝিকে দায়ী করেন। ট্রলারে ধারণ ক্ষমতার বেশি যাত্রী ছিলো বলেও তিনি অভিযোগ আনেন।



সাতদিনের সেরা