kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১।৮ সফর ১৪৪৩

চোখের আর বিলের জল একাকার

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

২৮ আগস্ট, ২০২১ ০০:১৮ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চোখের আর বিলের জল একাকার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর থেকে বিজয়নগর উপজেলায় যোগাযোগের জন্য তৈরি হচ্ছে শেখ হাসিনা সড়ক। প্রায় ১০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই সড়কের দুই পাশের বেশির ভাগ অংশেই থইথই পানি। বিলের ওই পানি আর চোখের পানি যেন একাকার হয়ে যায় গতকাল শুক্রবার রাতে। 

সড়কের পাশে নৌকা ডুবে প্রাণ গেছে ১৯ জনের। নিখোঁজ রয়েছে ৫০ জনের বেশি। নিখোঁজদের স্বজনরা সড়কের পাশে বসে আহাজারি করছিল। আহাজারিতে জেলা সদর হাসপাতালের বাতাসও ভারি হয়ে ওঠে।

জেলা সদর হাসপাতালে কথা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সাদেকপুর গ্রামের আঁখি বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান, স্বামী-সন্তানদের নিয়ে তিনি বিজয়নগরের চম্পকনগর গ্রাম থেকে নৌকায় করে ফিরছিলেন। পথিমধ্যে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবাহী নৌকা ধাক্কা দিলে তাঁদের বহনকারী নৌকাটি ডুবে যায়।

এ সময় তাঁর বাঁ হাতে এক বছর বয়সী মেয়ে মোবাশ্বিরা এবং ডান হাতে আট-দশ বছর বয়সী ছেলে তানবীর হোসাইন ধরা ছিল। এক পর্যায়ে বড় ছেলে তাঁর হাত থেকে ছিটকে যায়। এর পর থেকে তাকে পাচ্ছেন না। তাঁর স্বামী মুরাদ মিয়া হাসপাতালে ভর্তি আছেন। 

বিলের পারে থাকা বিজয়নগরের জহিরুল ইসলাম জানান, সাত দিন আগে তিনি বিয়ে করেছেন। স্ত্রী শারমিনকে নিয়ে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শ্বশুরবাড়িতে আসছিলেন। নৌকাডুবিতে তিনি বেঁচে গেলেও স্ত্রীর খোঁজ পাচ্ছেন না।

জহিরুলের বড় ভাই শফিকুল ইসলাম কান্না করতে করতে বলছিলেন, ‘আমি তরে (জহিরুল) কইছলাম নতুন বউরে লইয়া নৌকা দিয়া আইছ না। তরে কইছলাম সিএনজি দিয়া আ। অহন কি বিফদ আইলো। শারমিনরে তো খুইজ্জা পাইতাছি না।’        

নৌকা ডুবিতে নিখোঁজ তাফসিয়া মীম নামে এক শিশুর মায়ের কান্না শুনে অনেকেই ভিড় জমান। এ সময় তিনি বলতে থাকেন, ‘আমার মাইয়া কই। আমার মাইয়ারে পাইতাছিনা কেরে। আফনেরা আমার মাইয়ারে আইন্না দেন না।’ 

সরজমিনে গেলে আহত অনেকেই জানান, বিজয়নগরের চম্পকনগর থেকে ব্রাহ্মণাবাড়িয়ার আনন্দ বাজার ঘাটে আসা থাকা নৌকাটিতে দেড় শ’র মতো যাত্রী ছিল। বেলা সাড়ে ৫টার দিকে মনিপুরের বাতালা এলাকায় নৌকাটি আসার পর বালুবাহী নৌকা ধাক্কা দেয়। এতে যাত্রীবাহী নৌকাটি ডুবে যায়। সড়কের পাশে নৌকাটি ডুবে যাওয়ায় অনেকে তীরে উঠতে সক্ষম হয়। তবে বেশিরভাগই ডুবে যান। স্থানীয় লোকজন খবর পেয়ে এসে উদ্ধার কাজ শুরু করে। চর ইসলামপুর এলাকায় আটক করা হয় বালুবাহী নৌকাটিকে।
 
নিখোঁজ ভাইয়ের জন্য আহাজারি করছিলেন এনামুল ইসলাম মুন্না। মনিপুর ঘাট থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আনন্দ বাজার আসার জন্য তার ভাই সিরাজুল ইসলাম নৌকায় উঠেন বলে জানান তিনি। কয়েক ঘণ্টা খোঁজাখুঁজি করেও ভাইকে পাচ্ছেন না বলে তিনি বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন। 

জেলা সদর হাসপাতালে কথা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সাদেকপুর গ্রামের আঁখি বেগমের সঙ্গে। এ প্রতিবেদককে তিনি জানান, স্বামী সন্তানদের নিয়ে বিজয়নগরের চম্পকনগর গ্রাম থেকে নৌকায় করে ফিরছিলেন। পথিমধ্যে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবাহী নৌকা ধাক্কা দিলে তাদেরকে বহনকারি নৌকা ডুবে যায়। এ সময় তার বাম হাতে এক বছর বয়সি মেয়ে মোবাশ্বিরা ও ডান হাতে আট-দশ বছর বয়সি ছেলে তানবীর হোসাইন ধরা ছিল। এক পর্যায়ে বড় ছেলে তার হাত থেকে ছিটকে যায়। এরপর থেকে তাঁকে পাচ্ছেন না। তার স্বামী মুরাদ মিয়া হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
 
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহত ফারুক মিয়া জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসার পথে বালুবাহী নৌকার ধাক্কায় তাদের ট্রলার ডুবে যায়। তিনি স্ত্রী ও মেয়েকে খোঁজে পাচ্ছেন না। কে বা কারা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে এনে ভর্তি করে।  

ঘটনাস্থল থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের মনিপুর গ্রামের মো. কবির মিয়া নামে এক ব্যক্তি জানান, খবর পেয়ে তিনিসহ কয়েকজন মিলে এসে উদ্ধার কাজে অংশ নেন। তিনিসহ অন্যান্যরা মিলে অন্তত ১৮ জনের লাশ উদ্ধার করেন। এছাড়া অর্ধমৃত অবস্থায় ১৫-২০ জনকে স্বজনসহ অন্যান্যরা নিয়ে যায়। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি। 

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খান, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুর রহমান ঘটনাস্থলে ছুটে যান। জেলা প্রশাসক জানান, ঘটনার তদন্তে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. রুহুল আমিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। দাফনের জন্য নিহতদের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। পুলিশ সুপার জানান, স্থানীয় লোকজনের পাশাপাশি ডুবুরি, ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছে। 



সাতদিনের সেরা