kalerkantho

রবিবার । ১ কার্তিক ১৪২৮। ১৭ অক্টোবর ২০২১। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ইলিশ আছে, ইলিশ নেই

ফারুক আহম্মদ, চাঁদপুর   

২৫ আগস্ট, ২০২১ ০১:১৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ইলিশ আছে, ইলিশ নেই

রাজধানী পুরান ঢাকার নারিন্দার বাসিন্দা ওয়াসেক জামান। যৌথ পরিবারে বসবাস করেন তিনি। বর্ষা এলেই ইলিশের টানে চাঁদপুরে আসেন। পুরান ঢাকার এই পরিবারটির খাবারের তালিকায় অন্যতম পছন্দ চাঁদপুরের ইলিশ। তাই এবারও পরিবারের চাহিদা মেটাতে বর্ষার শুরুতে এমন অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু করোনার কঠোর বিধি-নিষেধের কারণে সময়মতো আসা হয়নি। তাই একটু দেরি হলেও মঙ্গলবার সকালের লঞ্চে চাঁদপুরের বড় স্টেশনের পাইকারি মাছবাজারে আসেন ওয়াসেক জামান। দুই ঘণ্টা ঘুরেফিরে দুই হালি ইলিশ কিনেছেন তিনি। তার বিশ্বাস, চাঁদপুরের নদীর ইলিশ। কারণ, দেখেশুনেই কিনেছেন। তবে দরদাম নিয়েও তার কষ্ট নেই। সাড়ে ১২শ গ্রাম থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত এমন ইলিশ প্রতি কেজি ১ হাজার ৩৫০ টাকা দরে কিনেছেন তিনি।

শুধু এমন একজন খুচরা ক্রেতাই নয়, আরো খুচরা এবং পাইকারি ক্রেতাদের চাঁদপুরের ইলিশের প্রতি আগ্রহ একটু বেশি। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, চাঁদপুরের পাইকারি বাজারে স্থানীয় নদীর ইলিশের সঙ্গে দক্ষিণের সাগর ও উপকূলের নদীর ইলিশ মিলছে। তবে সাগরে ধরা ইলিশই বেশি।

জেলে এবং মাছ ব্যবসায়ীদের দাবি, ইলিশের এখন ভরা মৌসুম। দক্ষিণের সাগর ও উপকূলীয় নদীতে ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়ছে। তবে চাঁদপুরের পদ্মা ও মেঘনায় জেলেদের প্রত্যাশিত কাঙ্ক্ষিত ইলিশ মিলছে না। তার পরও চাঁদপুরের প্রধান পাইকারি ইলিশের বাজার বড় স্টেশনে ইলিশে সয়লাব। মূলত দরদাম ভালো পাওয়ায়  সাগর ও উপকূলের নদীতে ধরা এসব ইলিশ পাইকারি এই বাজারে মিলছে। আর তা রাজধানী ঢাকার কারওয়ান বাজারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হচ্ছে। আকারভেদে ইলিশের দরদামও আলাদা।

মঙ্গলবার চাঁদপুর বড় স্টেশন পাইকারি বাজারে এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশ প্রতি মণ ৪৪-৪৫ হাজার টাকা। এক কেজির নিচে অর্থাৎ ৮ শ গ্রামের বেশি প্রতি মণ ৩৩-৩৪ হাজার টাকা এবং ৬ শ থেকে ৮ শ গ্রাম ওজনের প্রতি মণ ২০-২১ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমিতি লিমিডেটের সভাপতি আব্দুল বারী মানিক জানান, পাইকারি বাজার বড় স্টেশনে সাগর ও উপকূলে ধরা পড়া ইলিশের চালানই মূল উৎস। তবে স্থানীয় নদীতে যে পরিমাণ ধরা পড়ে তা চাহিদা অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত নয়। তা ছাড়া স্থানীয় ইলিশের সঙ্গে সাগরের ইলিশের দরদামও ভিন্ন। আকারভেদে চাঁদপুরের ইলিশ প্রতি মণ ২-৩ হাজার টাকা বেশি।

সুমন খান নামে একজন ব্যবসায়ী জানান, দক্ষিণাঞ্চলের জেলে এবং বেপারিরা দরদাম ভালো পাওয়ায় চাঁদপুরে ইলিশ নিয়ে আসেন। বিপ্লব খান নামে আরেক ব্যবসায়ী, যিনি সরাসরি ও অনলাইনে ইলিশ বিক্রি করেন, তিনি জানান- চাঁদপুরে ইলিশের প্রসিদ্ধির কারণে সব শ্রেণির ক্রেতার আলাদা একটা আগ্রহ থাকে। যে কারণে দেশের উপকূলের জেলে ও বেপারিরা এখানে ইলিশের চালান নিয়ে আসেন। আর ইলিশের এসব চালান রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ দেশে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হচ্ছে। 

বড় স্টেশনে ইলিশের চালান নিয়ে আসা ভোলার চরফ্যাশনের বেপারি আমজাদ আলী জানান, নদীপথে যাতায়াত ভালো, সঙ্গে দামও। যেটা দক্ষিণাঞ্চলের আড়তগুলোতে পাওয়া যায় না। তার মতো আরো কয়েকজন বেপারি ও জেলে একই কথা জানান। বিশাল সাগরের কিছু এলাকা ছাড়াও এখন নোয়াখালী ও ভোলা অঞ্চলের উপকূলে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ছে এমন তথ্য জানান, নোয়াখালীর চেয়ারম্যানঘাট থেকে ইলিশ নিয়ে চাঁদপুরে আসা আরেক বেপারি। চাঁদপুরের হরিণাঘাট এলাকার কয়েকজন জেলের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, নিজস্ব পুঁজির অভাবে মহাজন ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তারা জাল-নৌকা গড়েন। সুতরাং মহাজনের দেনা আর এনজিওর কিস্তি পরিশোধে তাদের তাড়া থাকে। যে কারণে মহাজনের বেঁধে দেওয়া দামেই মাছ বিক্রি করে দিতে হয়।

এদিকে, অন্য বছরের তুলনায় এবার সাগরে ইলিশ মিলছে না। চট্টগ্রামসহ আরো কয়েকটি স্থানের জেলে এবং সংশ্লিষ্টদের এমন অনুযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কথা বলেন দেশের বিশিষ্ট মৎস্যবিজ্ঞানী, ইলিশ গবেষক ও মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, নদীকেন্দ্র চাঁদপুরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিছুর রহমান।

তিনি বলেন, ভৌগোলিক ও পরিবেশগত কারণে ইলিশের ঝাঁক সাগরে অবস্থান করে। কারণ, ইলিশ মূলত সাগরের মাছ। পরিভ্রমণশীল হওয়ায় সব সময় একই স্থানে ইলিশের প্রাচুর্য সমান থাকবে না। সেপ্টেম্বর এবং অক্টোবর মাসজুড়ে ইলিশের ভরা মৌসুম। তা ছাড়া সামনে প্রজনন মৌসুম। তাই এখন থেকেই ছোট আকারের চেয়ে বড় ইলিশ মোহনা ও নদীর দিকে ছুটে আসতে শুরু করেছে। তবে চলতি বছর ভারি বৃষ্টিপাত হলেও ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি, আকাশে বিদ্যুৎ চমকালে ইলিশ আহরণে আরো সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। ড. আনিছুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, সাগরে অনেক জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে। এটি কেন হচ্ছে, তা সামুদ্রিক গবেষণার দরকার আছে। তবে এখন যে পদ্মা ও মেঘনায় কাঙ্ক্ষিত ইলিশ নেই, তার জন্য নদীদূষণ ও যেখানে নদী সাগর মোহনায় মিলিত হয়েছে, সেখানে নতুন করে চর ও ডুবোচর সৃষ্টিকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, মূলত স্রোতের বিপরীতে ইলিশ ছুটে চলে। কোথাও বাধাগ্রস্ত হলে সেখান থেকে ইলিশ ফিরে যায়। একই সঙ্গে অমাবস্যা ও পূর্ণিমার একটা প্রভাবও আছে। যেটাকে জেলেদের ভাষায় জো বলে। অর্থাৎ এই সময় অমাবস্যার চেয়ে ভরা পূর্ণিমায় ইলিশ ধরা পড়ে বেশি। ড. আনিছুর রহমান বলেন, এবারও মা ইলিশ রক্ষায় অক্টোবরজুড়ে একটি নিষেধাজ্ঞা জারি হতে পারে। তবে তার মেয়াদকাল সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।

প্রসংগত, গত বছর দেশে ইলিশ আহরণ ছিল সাড়ে পাঁচ লাখ মেট্রিক টন। এবার তা ছাড়িয়ে পৌনে ৬ লাখ মেট্রিক টন ইলিশ ধরা পড়বে। এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।



সাতদিনের সেরা