kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৮। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ২০ সফর ১৪৪৩

কাছে আসছে না প্রশাসনের উদ্যোগ

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ঠাকুরগাঁওয়ে বাড়ছে বাল্যবিয়ে

পার্থ সারথী দাস, ঠাকুরগাঁও    

২৪ আগস্ট, ২০২১ ০৯:৩২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ঠাকুরগাঁওয়ে বাড়ছে বাল্যবিয়ে

করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় যখন সরকারিভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে, তখন ঠাকুরগাঁওয়ে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে চলেছে বাল্যবিয়ের ঘটনা।  স্বাভাবিক সময়ের থেকে বর্তমানে বাল্যবিয়ের ঘটনা ঘটছে  কয়েকগুণ বেশি।

এদিকে, বাল্যবিয়ে রোধ করতে বেসরকারি এনজিও ও স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগ তেমন কোনো কাজে আসছে না। সচেতন মহল মনে করছে, এখনি বাল্যবিয়ে রোধ করা না গেলে ভবিষ্যতে এটি জেলায় ভয়ংকর আকার ধারণ করবে। ঠাকুরগাঁও জেলায় করোনাকালে গত দুই বছরে কতগুলো বাল্যবিয়ে সম্পন্ন হয়েছে সরকারি ও বেসরকারিভাবে তার কোনো সঠিক তথ্য কেউই দিতে পারেননি। 

করোনার কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তার প্রভাব পড়েছে ঠাকুরগাঁওয়ে। জেলার অধিকাংশ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বর্তমান করোনাকালে বাল্যবিয়ের এই ঘটনা অনেক বেশি। 

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা সালান্দর ইউনিয়নের চৌধুরীহাট কচুবাড়ি কিয়ারিগাঁও খালেদা জিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী রুমি আক্তার। সে জানায়, তার স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষ করে অনেক বড় হবে, চাকরি করে নিজে স্বাবলম্বী হবে। কিন্তু করোনায় স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারের বোঝা হয়ে যায় সে। লকডাউনের কারণে দরিদ্র এই পরিবারের উপার্জন কমে যাওয়ায় তাকে অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেয় তার অবিভাবক। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ করেই তার ঠিকানা হয় স্বামীর বাড়ি। বিয়ের পর থেকেই বন্ধ হয়ে যায় তার লেখাপড়া। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন অতিক্রান্ত হতে না হতেই শ্বশুরবাড়ির লোকজন তার ওপর যৌতুকের জন্য চাপ দিতে থাকে। এর পর শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন। প্রায় ছয় মাস পর যৌতুকের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় তাকে ফিরে আসতে হয় মা-বাবার বাড়িতে। বর্তমানে খুব কষ্টে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে তার। কম বয়সে বিয়ের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল তা এখন বুঝতে পেরেছে সে। তাই নিজের পায়ে দাঁড়াতে আবারও লেখাপড়া শুরু করতে চায় রুমি, চায় স্কুলে যেতে।

শুধু রুমিই নয়, তার মতো এ অঞ্চলে আরো অনেকেই রয়েছে। যে বয়সে লেখাপড়া ও খেলাধুলা করার সময়, সে বয়সে তাদের বিয়ে, সংসার। যাদের অনেকেরই এমন অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে শুধু বেঁচে থাকবার জন্যই বছরের পর বছর সহ্য করতে হয় নির্যাতন।

অবিভাবকরা জানান, একদিকে করোনা, অন্য দিকে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ। দারিদ্র্য, সামাজিক বদনামের কারণে কম বয়সেই অনেকটা নিউপায় হয়ে মেয়েদের বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। আবার অনেকে বলছেন, সব সময় সুপাত্র পাওয়া খুবই কঠিন। তাই চাকরিওয়ালা ও বড় ব্যাবসায়ী পাত্র পেলে হাতছাড়া করতে চান না তাঁরা।

সদর উপজেলা খালেদা জিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, করোনায় স্কুল বন্ধ থাকায় তাঁর বিদ্যালয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ মেয়ে শিক্ষার্থীর বিয়ে হয়ে গেছে। একই কথা জানান হাজি কমরুল হুদা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মশিউর রহমান।

নারগুন গিলাবাড়ি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক শাহজান হাবিব বলেন, স্থানীয় এনজিওগুলো দেশি-বিদেশি  ফান্ড সংগ্রহ নিয়েই ব্যস্ত। খাতা কলমে তাঁরা অনেক কাজ করলেও প্রকৃতপক্ষে মাঠপর্যায়ে তাঁদের ওপর অর্পিত কাজ তাঁরা করছেন না। সঠিকভাবে জরিপ করলে দেখা যাবে জেলার প্রতিটি বিদ্যালয়েই গত দুই বছরে শতাধিক শিক্ষার্থীর বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।

সদর উপজেলা সালান্দর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মাহবুব আলম মুকুল বলেন, রাতের আধারে গোপনে বাল্য বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বিয়ে রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কাজিরা টাকার বিনিময়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বয়স কাগজে কলমে বাড়িয়ে সুকৌশলে বিয়ে দিচ্ছেন।

ঠাকুরগাঁও জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা রোকসানা বানু হাবিবের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি গত দুই বছরে বাল্যবিয়ের সঠিক তথ্য দিতে পারেননি।

বেসরকারি এনজিও মানবকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী পরিচালক রবিউল আলম জানান, শহর থেকে গ্রামে বাল্য বিয়ের হার স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয়ভাবে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এনজিও ও প্রশাসনকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে জেলায় আগামী কয়েক মাসে এটি মহামারিতে রূপ নেবে।

ঠাকুরগাঁও সিভিল সার্জন ডা. মাহফুজার রহমান সরকার বলেন, বাল্যবিয়ে মা এবং সন্তান উভয়েই মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকেন।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, 'বাল্যবিয়ে রোধে তৎপর রয়েছে প্রশাসন। এ বিষয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বাল্যবিয়ে প্রতিরোধের ক্ষেত্রে এনজিও ও সংশ্লিষ্টরা তাদের দায়িত্বটুকু সঠিকভাবে পালন করছেন না। বাল্যবিয়ে রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।'  



সাতদিনের সেরা