kalerkantho

শুক্রবার । ৯ আশ্বিন ১৪২৮। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৬ সফর ১৪৪৩

যুবলীগ নেতা মামুনের বহিষ্কার-গ্রেপ্তার দাবিতে সড়কে সমাবেশ

মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি   

১৯ আগস্ট, ২০২১ ১৭:৪৪ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



যুবলীগ নেতা মামুনের বহিষ্কার-গ্রেপ্তার দাবিতে সড়কে সমাবেশ

টাঙ্গাইলের মির্জাপুর পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক সন্ত্রাসী দেওয়ান আল মামুনের বহিষ্কার, গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছে বাইমহাটী ও কদিম দেওহাটা গ্রামবাসী। গত ১২ আগস্ট মামুনের নেতৃত্বে নজরুল ইসলাম ও বিল্লাল হোসেনসহ ছয়জনকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। তারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় মির্জাপুর থানায় ১৪ আগস্ট মামলা হলেও পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

এ ঘটনার প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের (পুরাতন) মির্জাপুর উপজেলা পরিষদ চত্বর এলাকায় এ মানববন্ধন ও সমাবেশ করেন। এ সময় যুবলীগ নেতা মামুনের বিরুদ্ধে এলাকার লোকজন জমি দখল, হামলা ও চাঁদাবাজির অভিযোগ আনেন।

সমাবেশে পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি নঈম উদ্দিনের সভাপতিত্বে কদিম দেওহাটা গ্রামের বাসিন্দা সাবেক প্রধান শিক্ষক শামসুল আলম লোবান, পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু বক্কর সিদ্দিক, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সুলতান উদ্দিন, ৬ নম্বর ওয়ার্ড সেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক ছানোয়ার হোসেন, প্রবীণ গ্রামবাসী আব্দুর রহমান, নুরুল ইসলাম, বাবুল মিয়া, ইউসুফ মিয়া, শরিফুল ইসলাম, লালভানু, সদর ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য খবির উদ্দিন, জিয়াসমিন আক্তার ও অ্যাডভোকেট উজ্জল মিয়া প্রমুখ বক্তৃতা করেন। 

এ সময় বাইমহাটী ও কদিম দেওহাটা গ্রামের লোকজন মির্জাপুর পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আল মামুনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং উপস্থিত সাংবাদিকদের কাছে লিখিত অভিযোগপত্র প্রদান করেন। এই মানববন্ধনে ওই এলাকার নারী-পুরুষসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত থেকে দেওয়ান আল মামুনকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কারসহ সকল আসামিদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি জানান।

পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুর রাজ্জাককে হুকুমদাতা উল্লেখ করে গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানিয়ে মামুন বাহিনীর ছবি দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় পোস্টারও সাঁটানো হয়েছে।

লিখিত অভিযোগে জানা যায়, ৭/৮ বছর আগে বাইমহাটী গ্রামে 'একতা সততা যুব সংঘ' নামে একটি ক্লাব গঠন করা হয়। ওই ক্লাবের শতাধিক সদস্য ছিলেন। ক্লাবটিতে সদস্যদের জমানো কয়েক লাখ টাকাও ছিল। যুবলীগ নেতা দেওয়ান আল মামুন গ্রামের ও বিভিন্ন এলাকার ২০/২৫ জন যুবক নিয়ে একটি সন্ত্রাসী বাহিনী গঠন করেন এবং ক্লাবের টাকাগুলো প্রভাব খাটিয়ে আত্মসাত করে বলে ক্লাবের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন।

সদস্যরা টাকা চাইতে গেলে ওই বাহিনী দিয়ে তাদের ভয় দেখানো হয়। এ ছাড়া দেওয়ান আল মামুন বাইমহাটী গ্রামে অর্ধশত বাড়িতে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। পরবর্তীতে টাঙ্গাইল গ্যাস অফিস অভিযান চালিয়ে ওই অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। গ্রামের লোকজন টাকা ফেরত চাইলে মামুন তার বাহিনী দিয়ে হুমকি প্রদর্শন করেন। 
মামুন তার বাহিনী দিয়ে বাইমহাটী গ্রামের এনামুল ও উপেন্দ্র মন্ডলের ছেলে হারাধনের জমি দখল নিয়ে তাদের বাড়িছাড়া করেছেন। ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু বক্কর সিদ্দিকের ৪ শতাংশ জমি জোর পূর্বক দখলে নিয়েছেন। জমি দখলে বাধা দিলে মামুন বাহিনী আবু বক্কর সিদ্দিকীসহ পরিবারের লোকজনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর আহত করে। এ ঘটনায় আদালতে মামলা চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।

গত এক যুগ আগে দেওয়ান মামুন বাইমহাটী গ্রামের মৃত সোনাম উদ্দিনের ছেলে বাকপ্রতিবন্ধী মিনহাজকে পিটিয়ে হাত ভেঙে ফেলে বলে গ্রামবাসী অভিযোগ করেন।

এ ছাড়া উপজেলা পরিষদের পাশে সড়ক ও জনপথ বিভাগের রাস্তা দিয়ে মাটি ও ইটভর্তি ট্রাক চলাচলের সময় ট্রাক আটকে রেখে চাঁদা তোলেন বলেও অভিযোগ করে এলাকাবাসী।

প্রসঙ্গত, বাইমহাটি ও কদিম দেওহাটা মৌজায় শতাধিক ব্যক্তির প্রায় ৫০ একর জমি রয়েছে। ওই সব জমির প্রায় ৪০ একর জমিতে আবাদ করা হয়। মির্জাপুর পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আল মামুন কয়েকজন জমির মালিকের কাছ থেকে চার বছর মেয়াদি চুক্তি করে পুরো জমিতে জোরপূর্বক মাছ চাষ করে আসছিল।

গত ২০১৯ সালে সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। পরবর্তীতে জমির মালিকরা দেওয়ান মামুনকে ওই জমিতে মাছ চাষের জন্য নিষেধ করে। তারপরও দেওয়ান মামুন জোরপূর্বক ওই জমিতে মাছ চাষ শুরু করেন।

এ ঘটনায় জমির মালিকরা গত বছর জুন মাসে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পরে মির্জাপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. গিয়াস উদ্দিন পুলিশ সুপার কার্যালয়ের অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত বছর ১৯ জুলাই দুই পক্ষের সভা ডাকেন। সভায় দেওয়ান মানুন ২০২০ সাল মাছ চাষ করতে পারবে এবং ২০২১ সাল হতে ওই সব জমিতে মাছ চাষ না করতে দেওয়ান মামুনকে নিষেধ করে উভয় পক্ষের মধ্যে আপসনামা করেন। আপসনামার প্রতিবেদন পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পাঠিয়েছেন বলে পরিদর্শক (তদন্ত) গিয়াস উদ্দিন জানান।

চলতি বছরও প্রভাব বিস্তার করে ওই জমিতে মাছ চাষের উদ্যোগ নেয় যুবলীগ নেতা দেওয়ান মামুন। আবাদি জমিতে মাছ চাষের কারণে মাছের বিষ্ঠা ও খাদ্যের প্রয়োগের ফলে ধানের ফলন হয় না এবং জমির সীমানা নির্ধারণ করা যায় না উল্লেখ করে মাছ চাষ থেকে বিরত থাকতে ছানোয়ার হোসেন গত ১৮ মে দেওয়ান আল মামুনকে আইনি নোটিশ পাঠান। পরবর্তীতে জমির অধিকাংশ মালিকরা জমিতে আমন ধান চাষ করেন।

কিন্তু দেওয়ান মামুন আইনি নোটিশের তোয়াক্কা না করে সেচের মাধ্যমে আবাদি জমিগুলো পানিতে ডুবিয়ে দেয়। এ নিয়ে গ্রামবাসীর পক্ষে ছানোয়ার হোসেন মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে আবাদি জমি রক্ষার জন্য লিখিত আবেদন করেন। পরে বিষয়টি নিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তদন্তপূর্বক ইউএনওর কাছে গত ২৪ জুন প্রতিবেদন দেন। এতে তিনি ওই এলাকায় মাছ চাষ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা অবনতির আশঙ্কা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

গত ৯ জুলাই বাইমহাটী গ্রামের কৃষকদের সংগঠন বাইমহাটী কৃষক একতা সংঘ একটি সভা করেন। সুলতান মিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় কৃষকেরা ধানের আবাদী জমিতে মাছ চাষ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন। একই সঙ্গে দেওয়ান আল মামুনকে মাছ চাষ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেন। কিন্তু তাতে তিনি রাজি না হয়ে বর্ষার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জোরপূর্বক জমিগুলো জাল দিয়ে ঘেরাও করেন।

আবাদী জমিতে মাছ চাষে বাধা দেওয়ায় দেওয়ান আল মামুন তার বাহিনী নিয়ে গত ১২ আগস্ট জমির মালিক নজরুল ইসলাম ও বিল্লাল হোসেনের ওপর হামলা করে কুপিয়ে আহত করেন। এ ঘটনায় আরো চারজন জমির মালিক আহত হয়। নজরুল ইসলাম (৪৫) ও বিল্লাল হোসেন (৬২) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।

এদিকে যুবলীগ নেতা দেওয়ান আল মামুনের বাবা আরফান দেওয়ান বাদী হয়ে উল্টো ১২ জন জমির মালিককে আসামি করে ওইদিনই থানায় মামলা করেন। পুলিশ দুইজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠান।

এ ছাড়া যুবলীগ নেতার হামলায় আহত জমির মালিকদের পক্ষে ছানোয়ার হোসেন বাদী হয়ে ১২ আগস্ট রাতে ১৩ জনকে আসামি করে অভিযোগ দিলেও অজ্ঞাত কারণে ১৪ আগস্ট মামলা রেকর্ড হয় বলে গ্রামবাসী জানিয়েছেন। তবে এ মামলার কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মির্জাপুর থানার এসআই মো. হাবিবুর রহমান উকিলের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

মির্জাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মীর শরীফ মাহমুদের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আল মামুনের বিষয়ে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একাব্বর হোসেন এমপি ও উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক শামীম আল মামুনের সঙ্গে কথা বলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান। 



সাতদিনের সেরা