kalerkantho

সোমবার  । ১২ আশ্বিন ১৪২৮। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৯ সফর ১৪৪৩

করোনার ছোবল : ৪ কিন্ডারগার্টেনের মালিক এখন মুদি দোকানি!

জাহাঙ্গীর হোসেন, রাজবাড়ী   

১৬ আগস্ট, ২০২১ ১৭:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



করোনার ছোবল : ৪ কিন্ডারগার্টেনের মালিক এখন মুদি দোকানি!

আমিরুল ইসলাম বাবু রাজবাড়ী জেলা শহরের বিভিন্ন এলাকায় সানরাইজ কোয়ালিটি স্কুল নামে চারটি কিন্ডার গার্টেন স্থাপন করে অর্ধশতাধিক শিক্ষক কর্মচারীদের সহযোগিতায় হাজারো শিশুকে গড়ে তোলার মহান কাজ করে আসলেও করোনার থাবায় সব শেষে তার। এখন তিনি তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোর অধ্যক্ষ নেই, পেটের দায়, ব্যাংক ঋণের দায় এবং সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে মুদি দোকান পরিচালনা করছেন।

আজ সোমবার দুপুরে রাজবাড়ী-ফরিদপুর সড়কের জেলা শহরের টিএন্ডটি পাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশে প্রায় পরিত্যক্ত একটি ঘরের মুদি দোকান পরিচালনা করছেন আমিরুল ইসলাম বাবু। তার দোকানের পেছনে এবং সড়কের পাশে ফেলে রাখা হয়েছে এক সময় হই হুল্লর করে শিশু শিক্ষার্থীদের বসবার সেই বেঞ্চগুলো। একই সাথে রয়েছে বোর্ড, চেয়ার, টেবিলসহ মূল্যবান শিক্ষা উপকরণ। রোদ, ঝড় ও বৃষ্টিতে সেগুলোর প্রাণ এখন যায় যায় অবস্থা। হয়তো আর কিছু দিনের মধ্যে সেগুলো জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা ছাড়া কোনো কাজেই আসবে না।

আমিনুল ইসলাম বাবুর মুদি দোকানে গিয়ে, মুদি মালামালের পাশাপাশি পাওয়া গেলো পুরনো সিলিং ফ্যান এবং খাতাপত্র। তার পরিস্থিতি এতোটাই নাজুক যে স্বল্পমূল্যে সিলিং ফ্যান ও খাতাপত্রগুলোও তিনি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

তিনি বলেন, শিশু শিক্ষার্থীদের সঠিকভাবে পাঠদানের লক্ষে ২০০৬ সাল থেকে সানরাইজ কোয়ালিটি স্কুল নামে তিনি কিন্ডারগার্টেনের কার্যক্রম শুরু করেন। তার পাঠদানে শিক্ষার্থীদের অধিক আগ্রহ থাকায় তিনি একে একে আরো তিনটি শাখা খোলেন। প্রায় ৫০ জন শিক্ষক ও কর্মচারীর কর্মসংস্থান হয় তার এই চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ২০২০ সালের মার্চে করোনার প্রথম ধাপ শুরু হয়। সে সময় থেকে তিনি পুনরায় স্কুল খোলার আশায় প্রতিষ্ঠানগুলো স্ব স্ব স্থানে রেখে ঘর মালিককে ভাড়া প্রদান শুরু করেন। এভাবে ব্যাংক ঋণসহ নানা স্থান থেকে অর্থ ধার এনে টানা ৬ মাস ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ পরিচালনা করেন। যদিও তারপর তিনি আর ওই ব্যয় বহন করতে পারছিলেন না। যে কারণে বাধ্য হয়ে গুটিয়ে ফেলেন তার চারটি স্কুলের কার্যক্রম। কেউ কেউ প্রাইভেট টিউশনি করলেও বেশির ভাগ শিক্ষক-কর্মচারী তাদের শিক্ষাকতার মহান পেশা করেছেন পরিবর্তন। তাদের মতো তিনিও তার নিজ বাড়ির সামনে থাকা একটি পরিত্যক্ত দোকান ঘরে মুদি মালামাল বিক্রি শুরু করেন। বর্তমানে স্ত্রী, ৩ মেয়ে ও ১ ছেলেকে নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। দেনা মেটাতে স্কুলের সিলিং ফ্যানসহ অন্যান্য মালামাল পানির দরে বিক্রিও করছেন। আর জায়গা না থাকায় শিক্ষা উপকরণগুলো খোলা স্থানে রেখেছেন। যা এখন চোখের সামনে রোদ, ঝড়, বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে।

রাজবাড়ী জেলা কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম গাজী টিপু জানিয়েছেন, আমিরুল ইসলাম বাবু তাদের সংগঠনের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক। শুধু আমিরুল ইসলাম বাবুই নয়, জেলার ২০৭টি কিন্ডারগার্টেনের ২ হাজার ১৭২ জন শিক্ষক-কর্মচারীর অবস্থায় একই।

তিনি আরো বলেন, জেলায় কিন্ডারগার্টেনগুলোতে ৫৪ হাজার শিক্ষার্থী ছিল। এদের মধ্যে মাত্র ৪১টি স্কুলেই ২০১৯ সালের পিএসসি পরীক্ষায় ৪২৯ জন শিক্ষার্থী পায় জিপিএ-৫। তার মধ্যে বৃত্তি পায় ১৬৭ জন। অথচ করোনায় তারা অমানবিক অবস্থায় জীবন-যাপন করছেন। শিক্ষকরা কারো কাছে হাত পাততে পারছে না, আবার কেউ ইচ্ছে করেও তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না। যে কারণে তারা সোমবার রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসকের কাছে আর্থিক প্রণোদনা পাবার লক্ষে আবেদনপত্র দাখিল করেছেন।

রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক দিলসাদ বেগম জানিয়েছেন, আর্থিক প্রণোদনা দেবার সুযোগ তার নেই। তবে সমাজ সেবা অধিপ্তরের মাধ্যমে খানিটা সহযোগিতা করা সম্ভব হবে। অধিক মানবিক অবস্থায় থাকা শিক্ষকরা ব্যক্তিগতভাবে আবেদন করলে বিবেচনা করা হবে।



সাতদিনের সেরা