kalerkantho

শুক্রবার । ৯ আশ্বিন ১৪২৮। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৬ সফর ১৪৪৩

'অহন ক্যামনে চলুম?', ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ক্ষেতের সবজি কেটে ফেলল বন বিভাগ

শ্রীবরদী (শেরপুর) প্রতিনিধি   

১৩ আগস্ট, ২০২১ ১০:৫৮ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



'অহন ক্যামনে চলুম?', ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ক্ষেতের সবজি কেটে ফেলল বন বিভাগ

'আমরা আদিবাসী। এইহানে যুগ যুগ ধইরা বসবাস করে আসছি। পাহাড়ের টিলায় বাড়ি। এইহানেই সবজির চাষ করি। মাত্র দুই কাঠা জমিতে বরবটি, শিমুল, আলু আর বেগুনের চাষ কইরা সংসার চালাই। ফরেস্টের লোকেরা আইয়া ক্ষেতের সব গাছ কাইটা ফালাইছে। অহন ক্যামনে চলুম?' এ প্রশ্ন করেছেন শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার পাহাড়ি এলাকা খ্রিস্টানপাড়া গ্রামের বিহার জাম্বিলের স্ত্রী ভারতীয় মৃ (৫৫)। তিনি বলেন, 'আমার দুই ছেলে দুই মেয়ে। এডার ওপর সংসার। ধারদেনা কইরা সবজির ক্ষেত করছি। এডাও শেষ কইরা দিল। আমরা কার কাছে এর বিচার চাইমু?' গতকাল বৃহস্পতিবার (১২ আগস্ট) বিকেলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এসব কথা বলেন সংখ্যালঘু হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীর এই নারী। 

তার মতো একই অভিযোগ তুলেছেন তার প্রতিবেশী লিন্দার সনের স্ত্রী সভানি সিমসাং (৫৬)। তিনি বলেন, 'আমি ২০ শতাংশ জমিতে লাউ, ঝিঙা আর বরবটির আবাদ করছিলাম। আজ ফরেস্টের লোক আইয়া ক্ষেতের সব গাছ কাটছে। আমরা অহন কী করমু?' তাদের মতো এই গ্রামের বাসিন্দা মৃত ভিমসিং ম্রংয়ের স্ত্রী সবিতা মৃ (৬০), বেনটিং রাংসার স্ত্রী কমলা রেমাসহ অনেকে জানান, তারা যুগ যুগ ধরে পাহাড়ি টিলায় বসবাস করে আসছেন। পাহাড়ের টিলায় সামান্য জমিতে তারা সবজির চাষ করে কোনোমতে সংসার চালান। সম্প্রতি বন বিভাগের বালিজুরি রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম ও তার অফিসের লোকজন কয়েকজন ক্যাডার শ্রেণির লোক এনে তাদের সবজিক্ষেতের সব গাছ কেটেছে। এতে আমাদের একমাত্র আয়ের উৎস একেবারেই বন্ধ হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে হাজার হাজার টাকা। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে কিভাবে সংসার চালাবেন তা নিয়ে চরম শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন খ্রিস্টানপাড়াসহ আশপাশের গ্রামের শত শত আদিবাসী। বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিন গেলে সেখানকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, সমাজসেবক, জনপ্রতিনিধিসহ বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে উঠে আসে এমন তথ্য। 

জানা যায়, শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্ত এলাকা রানীশিমুল ও সিংগাবরনা ইউনিয়নের সীমান্ত এলাকাজুড়ে গারো পাহাড়। এখনে ব্রিটিশ আমল থেকে বসবাস করে আসছে ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর গারো, হাজং, বানাই, কুচসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক। আগে তারা জুম চাষ করত। কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে জুম চাষ। এখন একমাত্র আয়ের উৎস কৃষি। স্থানীয় বাসিন্দা ব্রতীন মারাক বলেন, আজ বালিজুরি রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা রবিউল ইসলামের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে খ্রিস্টানপাড়া গ্রামের পাহাড়ি টিলায় চার-পাঁচজনের প্রায় ৪০ শতাংশ জমির সবজিক্ষেত ও বসতবাড়ির শতাধিক সুপারির চারা কর্তন করেছে। এতে অসহায় হয়ে পড়েছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো। তিনি আরো বলেন, সবজিক্ষেত করার অনুমতি দিয়ে এখন তারা কর্তন করছে। এতে তাদের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। আমরা চাই, বন বিভাগ যেন তাদের ক্ষতিপূরণ দেয়। 

তবে বালিজুরি রেঞ্জ কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম বলেন, বন বিভাগের জমিতে তারা জোরপূর্বক সবজি চাষ করেছে। সেখানে সুফল প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এ জন্য ওইসব সবজিক্ষেতের গাছ কেটে সুফল প্রকল্পের বৃক্ষের চারা বেড়ে ওঠার জন্য পরিষ্কার করা হচ্ছে। এই কার্যক্রম নিয়মিত চলছে। এদিকে বন কর্মকর্তাদের এমন সিদ্ধান্তে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন আদিবাসীরা।



সাতদিনের সেরা