kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৮। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ২০ সফর ১৪৪৩

মাছ চাষে বাধা, যুবলীগ নেতার হামলায় বিএনপি নেতাসহ আহত ৬

মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি   

১২ আগস্ট, ২০২১ ২১:০৩ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মাছ চাষে বাধা, যুবলীগ নেতার হামলায় বিএনপি নেতাসহ আহত ৬

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে আবাদী জমিতে মাছ চাষে বাধা দেওয়ায় মির্জাপুর পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আল মামুন ও তার অনুসারীদের হামলায় ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসরামসহ অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন।

আজ বৃহস্পতিবার সকাল এগারোটার দিকে পৌর এলাকার বাইমহাটী এসটিবি ইটভাটায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় যুবলীগ নেতা দেওয়ান আল মামুনও আহত হয়েছেন বলে তিনি দাবি করেছেন।

হামলায় আহতদের মধ্যে গুরুতর অবস্থায় নজরুল ইসলাম (৪৫) টাঙ্গাইল সদর হাসাপাতাল  ও বিল্লাল হোসেনকে কুমুদিনী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে চারজনকে আটক করেছে।

এলাকাবাসী জানায়, বাইমহাটি মৌজা ও মীর দেওহাটা মৌজায় শতাধিক ব্যক্তির প্রায় ৫০ একর জমি রয়েছে। এসব জমির প্রায় ৪০ একর জমিতে আবাদ করা হয়। জমিগুলো নিচু হওয়ায় কয়েকজন জমির মালিকের কাছ থেকে জমি ভাড়া নিয়ে মির্জাপুর পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আল মামুন মাছ চাষ করে আসছে। এজন্য যুবলীগ নেতা গ্রামবাসীর কাছ থেকে গত ২০১৫ সালে চার বছর মেয়াদী একটি লিখিত চুক্তি করে।

গত ২০১৯ সালে সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। পরবর্তীতে জমির মালিকরা দেওয়ান মামুনকে ওই জমিতে মাছ চাষের জন্য নিষেধ করে। তারপরও দেওয়ান মামুন গত বছর জোরপূর্বক ওই জমিতে মাছ চাষ শুরু করে।

এ ঘটনায় জমির মালিকরা গত বছর জুন মাসে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পরে মির্জাপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. গিয়াস উদ্দিন পুলিশ সুপার কার্যালয়ের ৪০৯ নম্বর স্মারকের অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত বছর ১৯ জুলাই দুইপক্ষের সভা ডাকেন। সভায় দেওয়ান মানুন ২০২০ সাল মাছ চাষ করতে পারবে এবং ২০২১ সাল হতে ওইসব জমিতে মাছ চাষ না করতে দেওয়ান মামুনকে নিষেধ করে উভয়পক্ষের মধ্যে আপসনামা করেন। আপসনামার প্রতিবেদন পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে পাঠিয়েছিলেন বলে পরিদর্শক (তদন্ত) গিয়াস উদ্দিন জানান।

চলতি বছরও প্রভাব বিস্তার করে সেই জমিতে মাছ চাষের উদ্যোগ নেয় যুবলীগ নেতা দেওয়ান মামুন। আবাদী জমিতে মাছ চাষের কারণে মাছের বিষ্ঠা ও খাদ্যের প্রয়োগের ফলে ধানের ফলন হয় না এবং জমির সীমানা নির্ধারণ করা যায় না উল্লেখ করে মাছ চাষ থেকে বিরত থাকতে ছানোয়ার হোসেন গত ১৮ মে দেওয়ান আল মামুনকে আইনী নোটিশ পাঠান। পরবর্তীতে জমির অধিকাংশ মালিকরা জমিতে আমন ধান চাষ করেন। কিন্তু দেওয়ান মামুন আইনী নোটিশের তোয়াক্কা না করে সেচের মাধ্যমে আবাদী জমিগুলো পানিতে ডুবিয়ে দেয়। 

এ নিয়ে গ্রামবাসীর পক্ষে ছানোয়ার হোসেন মির্জাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে আবাদী জমি রক্ষার জন্য লিখিত আবেদন করেন। পরে বিষয়টি নিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তদন্ত পূর্বক ইউএনওর কাছে গত ২৪ জুন প্রতিবেদন দেন। এতে তিনি ওই এলাকায় মাছ চাষ নিয়ে আইশৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

এ ছাড়া তাছাড়া মাছ চাষ বন্ধে গত ৯ জুলাই বাইমহাটী গ্রামের কৃষকদের সংগঠন বাইমহাটী কৃষক একতা সংঘের সভা হয়। সুলতান মিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় কৃষকেরা ধানের আবাদী জমিতে মাছ চাষ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন। একই সঙ্গে দেওয়ান আল মামুনকে মাছ চাষ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেন। কিন্তু তাতে তিনি রাজী না হয়ে বর্ষার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জোরপূর্বক জমিগুলো জাল দিয়ে ঘেরাও করেন।

বৃহস্পতিবার সকালে নজরুল ইসলামসহ কয়েকজন ঘেরাও দেয়া জাল তুলে ফেলতে এসটিবি ইটভাটার কাছে গেলে যুবলীগ নেতা মামুনের নেতৃত্বে তার ভাই জুয়েল, পৌর স্বেচ্ছাসেবকলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল লতিফ, দলিল লেখক রাকিব, আরিফ হোসেন, শামীম, পনিরসহ ১৫/২০ জনের একটি দল রাম দা, টেটা ও লাঠি নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় তাদের হামলায় পৌর এলাকার ৬নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম, বিল্লাল হোসেন, শাহিন, শামীম ও স্জ্জাাত আহত হন। তাদের মধ্যে নজরুলকে টাঙ্গাইল সদর ও বিল্লালকে কুমুদিনী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদের স্থানীয় ক্লিনিকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে বল জানা গেছে। এ ঘটনায় যুবলীগ নেতা মামুন মাথায় আঘাত পেয়েছেন বলে তার বন্ধু শামীনুর জানিয়েছেন। তাকে জামুর্কী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রয়েছেন।

বাইমহাটী গ্রামের মো. বাদশা মিয়া ও নুর ইসলাম জানান, দেওয়ান মামুনকে আইনী নোটিশ দেওয়ার পর তারা প্রায় ৯ একর জমিতে আমন ধানের চাষ করেন। মামুন আইনী নোটিশের তোয়াক্কা না করেই জোরপূর্বক সেচ দিয়ে তাদের আবাদী জমি ডুবিয়ে দেয়।

আহত নজরুল ইসলাম ও সাজ্জাত জানান, যুবলীগ নেতা দেওয়ান মামুন ভয় দেখিয়ে জোর করে তাদের জমিতে বছরের পর বছর মাছ চাষ করে আসছে। নিষেধ করায় তাদের উপর হামলা চালিয়েছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বরাবার লিখিত অভিযোগ করা হয়েছিলো। এ ছাড়া আইনি নোটিশ করা হলেও আমলে না নিয়ে জাল দিয়ে ঘেরাও দিয়েছে।

যুবলীগ নেতা দেওয়ান আল মামুন জানান, নজরুল ইসলামের জমি বাদ দিয়ে জাল দিয়ে ঘেরাও করে মাছ চাষ করা হয়েছে। নজরুল ইসলাম বৃহস্পতিবার সকালে কয়েক মিটার জাল তুলে ফেলে। বাধা দেওয়ায় নজরুল প্রথমে আমার ওপর হামলা চালায়। পরে উভয়পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয় বলে তিনি জানান।

মির্জাপুর থানার উপরিদর্শক (এসআই) রুবেল হোসেন জানান, যুবলীগ নেতা দেওয়ান আল মামুনের বাবাকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া নজরুল ইসলামের পক্ষের তিনজনকেও আটক করা হয়েছে। উভয়পক্ষের মামলার প্রস্তুতি চলছে।

মির্জাপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) গিয়াস উদ্দিন জানান, গ্রামবাসীর অনুমতি ছাড়া আবাদী জমিতে মাছ চাষ করা যাবে না মর্মে গত বছর আপসনামা করা হয়েছিল। তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে বলে তিনি জানান।



সাতদিনের সেরা