kalerkantho

বুধবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৮। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ২১ সফর ১৪৪৩

মদনের উচিতপুর ট্র্যাজেডির এক বছর আজ

ফয়েজ আহম্মদ, মদন (নেত্রকোনা)   

৫ আগস্ট, ২০২১ ০০:২২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মদনের উচিতপুর ট্র্যাজেডির এক বছর আজ

আজ ৫ আগস্ট। উচিতপুর ট্র্যাজেডির এক বছর। গেল বছরের এই দিনে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চল মদন উপজেলার উচিতপুরে হাওরে এক ট্রলার ডুবির ঘটনা ঘটে। আর এতে মুহূর্তের মধ্যে ঝরে যায় ১৮টি তাজা প্রাণ।

জানা গেছে, বর্তমান সময়ের ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক আকর্ষণীয় নাম উচিতপুর। হাওর উপকূলের এ এলাকাটি বছরের ছয় মাস (বর্ষাকাল) পানিবেষ্টিত থাকে। আর বাকি ছয় মাস অর্থাৎ শুষ্ক মৌসুমে পরিণত হয় বিশাল আবাদ ভূমিতে। তবে বর্ষা এলেই যেন উচিতপুর তার প্রাণ ফিরে পায়। চারিদিক তখন কানায় কানায় পানিতে ভরে ওঠে। নজর কেড়ে নেয় দিগন্তবিস্তৃত বিশাল জলরাশি। দেখলে মনে হয়- কূলকিনারাহীন এক সাগর।

বছর পাঁচেক আগে উচিতপুরের অদূরে বালই নদীতে একটি সুদৃশ্য পাকা সেতু নির্মাণের পর আশুলিয়ার মতো এ জায়গাটি ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণীয় স্থানে পরিণত হয়। তাই বর্ষা এলেই হাওরের উত্তাল ঢেউ আর স্বচ্ছ জলরাশির সৌন্দর্যের টানে ছুটে আসে হাজার হাজার পর্যটক। ইতিমধ্যে উচিতপুরের বিকল্প নাম হয়ে ওঠেছে মিনি কক্সবাজার। গোটা বর্ষাকাল জুড়েই দূর-দূরান্তের অগণিত মানুষের পদচারণে মুখর থাকে উচিতপুরের ট্রলার ঘাটটি।

কিন্তু গেল বছরের ৫ আগস্ট (বুধবার) এক অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনায় উচিতপুরে রাজ্যের বিষাদ নেমে আসে। জানা গেছে, ওইদিন সকালে ময়মনসিংহ সদরের চরসিরতা ইউনিয়নের কোনাপাড়া, গৌরিপুর ও নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার তেলিগাতি এলাকার কয়েকটি মাদরাসা থেকে ৪৮ শিক্ষক-শিক্ষার্থী উচিতপুর হাওরে বেড়াতে আসেন।

উচিতপুর ট্রলার ঘাটে এসে তারা কুলিয়াটি গ্রামের লাহুত মিয়ার ট্রলারে ওঠে হাওরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। কিন্তু ঝড়ো হাওয়ার কারণে হাওরে সৃষ্ট উত্তাল ঢেউয়ের কবলে পড়ে ট্রলারটি আড়াই কিলোমিটার দূরের রাজালীকান্দা নামক স্থানে ডুবে যায়। তখন প্রায় ৩০ জন যাত্রী সাঁতরিয়ে পাড়ে উঠতে পারলেও পানিতে ডুবে মারা যান ১৮ জন। ফলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয় উচিতপুর ঘাটে। রোল পড়ে কান্নার।

এদিকে ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন কিছুটা নড়েচড়ে বসে। জেলা প্রশাসক মদন উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা বুলবুল আহমেদকে প্রধান করে ৪ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেন। এ কমিটি দুর্ঘটনার কারণে হিসেবে ঝড়োবাতাস ও ঢেউকে দায়ী করে ১৯ আগস্ট জেলা প্রশাসক বরাবর প্রতিবেদন দাখিল করেন। তবে ভবিষ্যতে উচিতপুর এলাকায় নৌ দুর্ঘটনা রোধে বেশকিছু সুপারিশ উল্লেখ করেন তারা। এর মধ্যে রয়েছে : নৌযানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম রাখা, নৌযানের রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস পরীক্ষা, অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন বন্ধ করা, চালকদের প্রশিক্ষণ, ডুবরি ইউনিট গঠন ও পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন প্রভৃতি।

এছাড়া দুর্ঘটনার পর ভাই ভাই পরিবহন নামক ট্রলারটির মালিক লাহুত মিয়া, চালক আল আমিন ও কামরুল ইসলামকে আসামি করে ঢাকার নৌ আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলার প্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ২৬ এপ্রিল রাতে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায় মদন থানা পুলিশ। আদালত থেকে জামিন পেয়ে আবারও ঘাটে ট্রলার নিয়েই সময় কাটাচ্ছেন তারা।

এদিকে এবারের বর্ষায়ও জমে ওঠেছে উচিতপুর ট্রলার ঘাট। দূর-দূরান্ত থেকে আসছে অগণিত যাত্রীবাহী ট্রলার। করোনা মহামারির কারণে বিধিনিষেধ থাকলেও আসছেন কিছু কিছু ভ্রমণ পিপাসুও। আর এ সুযোগে অতীতের মতো এবারও যাত্রী পরিবহনের প্রতিযোগিতায় নেমে গেছেন ট্রলার মালিক ও চালকরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ঘাটে স্থানীয় প্রশাসন কিছুটা নজরদারি বাড়ালেও ট্রলার মালিক, চালক ও যাত্রীরা কোনো বিধি-নিষেধই মানছেন না। প্রতিটি নৌকায় লাইফ জ্যাকেট, বয়াসহ জীবনরক্ষার সরঞ্জামাদি রাখার শর্ত দেওয়া হলেও তা করছে না কেউই। পরিবহন করা হচ্ছে ধারণ ক্ষমতার অধিক যাত্রী। চালানো হচ্ছে ফিটনেসবিহীন নৌকাও। অনেক ছোট এবং পুরনো ভাঙ্গাচোরা নৌকায়ও ইঞ্জিন স্থাপন করে বানানো হচ্ছে ট্রলার। আর এসব ট্রলাররের চালক হচ্ছে শিশু-কিশোররা।

ফলে আবারও দেখা দিয়েছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। এদিকে তদন্ত কমিটির সুপারিশে দমকল বাহিনীর ডুবুরি ইউনিট রাখার প্রস্তাব করা হলেও অদ্যাবধি ডুবুরি দল পাঠানো হয়নি সেখানে। ট্রলার ঘাটে পুলিশ ক্যাম্প থাকার কথা থাকলেও তাও হয়নি।

এসব অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার ব্যাপারে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার বুলবুল আহমেদ জানান, বর্ষা শুরু আগেই আমরা জেলা প্রশাাসকের উপস্থিতিতে ট্রলার মালিক, চালক ও ইজারাদারের সঙ্গে মতবিনিময় করেছি

 ট্রলার চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া চালকদের মাঝে লাইফ জ্যাকেট ও বয়া বিতরণ করেছি। ট্রলার মালিকদের উদ্বুদ্ধ করেছি- যাতে তারা প্রতিটি নৌকায় এসব সরঞ্জামাদি রাখে। এছাড়া প্রায় সময় আমরা ঘাটের ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিদর্শন করছি।



সাতদিনের সেরা