kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

ফুটপাত নেই, সার্ভিস লেন দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলছে মানুষ

মির্জাপুর (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি   

৪ আগস্ট, ২০২১ ২০:৫৯ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ফুটপাত নেই, সার্ভিস লেন দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলছে মানুষ

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মির্জাপুর উপজেলার সোহাগপাড়া বাজারে ফুটপাত না থাকায় সার্ভিস লেন দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে প্রতিনিয়ত চলাচল করতে হচ্ছে হাজারো মানুষকে। সার্ভিস লেনে মানুষ চলাচল করায় ছোট ছোট যানবাহনও চলছে ঝুঁকি নিয়ে। এতে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েও জমির মালিকরা জমি না ছেড়ে দোকান ঘর নির্মাণ করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগে জানা গেছে। অজ্ঞাত কারণে তাদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই এলাকা শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। এই এলাকায় ছোট বড় কমপক্ষে ৫০টি শিল্পকারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক কাজ করে। তাদের মধ্যে অনেকেই সোহাগপাড়া এলাকায় বসবাস করেন। তারা সোহাগপাড়া বাজারের ওপর দিয়ে আধাকিলোমিটার হেঁটে কর্মস্থলে যান বলে জানা গেছে।

টাঙ্গাইল সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জনসাধারণের দুর্ভোগ লাঘবে সরকার যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ ও সড়কটি প্রশস্ত করেন। এরপর থেকে এ মহাসড়কে টাঙ্গাইল জেলাসহ উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ২৬টি জেলার যানবাহন চলাচল শুরু হয়। যানবাহনের চাপ প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকায় মহাসড়কটি যানজটের সড়কে পরিণত হয়। যাত্রীদের দুর্ভোগ লাঘবে জয়দেবপুর-চন্দ্রা-টাঙ্গাইল-এলেঙ্গা পর্যন্ত মহাসড়কের ৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ মহাসড়কটি প্রথমে চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্পটি ২০১৩ সালে একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। ২০১৬ সালে এর কাজ শুরু হয়। এর আগে সরকার মহাসড়কের উভয়পাশে চাহিদামত ভূমি অধিগ্রহণ করেন। ইতিমধ্যে জমির মালিকরা ক্ষতিপুরণের টাকাও উত্তোলন করেছেন।

পরবর্তীতে মহাসড়কটির ছয় লেনের কাজ শুরু হয়। মহাসড়কটিতে ১৩টি আন্ডারপাস ও সাতটি ফ্লাইওভার রয়েছে। চার প্যাকেজ কাজটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। মহাসড়কের দক্ষিণপাশ দিয়ে সার্ভিস লেনের কাজ প্রায় সমাপ্ত। কিন্তু মির্জাপুর উপজেলার সোহাগপাড়া বাজার এলাকায় সার্ভিস লেনের পাশে ফুটপাত না থাকায় জনসাধারণের চলাচলে দুর্ভোগ বেড়েছে। ঝুকি নিয়ে সার্ভিস লেনের ওপর দিয়ে হেটে চলাচল করতে হচ্ছে হাজারো মানুষকে।

জমির মালিকরা সার্ভিস লেন ঘেষে প্রায় ৩০/৩৫টি ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েয়েছেন। প্রতি মাসে হাজার হাজার টাকা ভাড়াও তুলছেন তারা। ওইসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কেনাকাট করতে হয় পাকা সড়কে দাঁড়িয়ে। পাশ দিয়েই চলছে ছোট ছোট যানবাহন। এতে প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা।

জমির মালিকরা বলছেন, অধিগ্রহণের জমিতে নয়, নিজেদের মালিকানা জমিতে ঘর তুলে ব্যবসায়ীদের কাছে ভাড়া দিয়েছেন। তারা জানান, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের সার্ভিস লেনের পাকা রাস্তার পাশে ওই বাজার এলাকায় অধিগ্রহণকৃত সরকারি কোনো জমি নেই।

সোহাগপাড়া গ্রামের শামছু শিকদার, ইমরান শিকদার, মজিবুর শিকদার, সাজু শিকদার, বাদশা মিয়া, খোরশেদ আলম, হুমায়ুন কবির, আলম মিয়া, জসিম উদ্দিন আতোয়ার রহমান আতাবর সরকারি জমিতে দোকানঘর ও ভবন নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন।  তারা বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে অধিগ্রহণকৃত সরকারি জমি উদ্ধারপূর্বক জনসাধারণের চলাচলের জন্য ফুটপাত নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।

সোহাগপাড়া বাজারের আমের ব্যবসায়ী আলহাজ মিয়া জানান, তিনি ৫ ফুট পাশের ১৫ ফুট লম্বা তিনটি সাটার ভাড়া নিয়েছেন। এজন্য ৯ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে। একই মালিকের ৫ ফুট বাই ৫ ফুট আকারের একটি ঘর ভাড়া নিয়ে জসিম উদ্দিন গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করছেন। এজন্য তাকে ৩ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হচ্ছে বলে জানান। বিকাশ নামের এক ব্যবসায়ী মজিবুর শিকদারের ঘর ভাড়া নিয়ে ৮ হাজার টাকা ভাড়া দিচ্ছেন। আম ব্যবসায়ী মনির হোসেন সাজু শিকদারের ৬ ফুটের এক সাটার ঘর ভাড়া নিয়ে ২ হাজার টাকা ভাড়া দিচ্ছেন। বাদশা মিয়াও ব্যবসায়ীদের কাছে একই পরিমাপের প্রতিটি ঘর ২৫০০ টাকায় ভাড়া দিয়েছেন।  

ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম জানান, তিনি আতোয়ার রহমান আতাবরের কাছ থেকে ১৮০০ টাকা বাড়ায় ঘর নিয়েছেন। তার পাশের এক ব্যবসায়ীর কাছে জানতে চাইলে বলেন, সরকারি জায়গায় ব্যবসা করি কাকে ভাড়া দেব।

পথচারীরা জানান, সোহাগপাড়া বাজারে প্রতি সপ্তাহের শনিবার ও মঙ্গলবার হাট বসে। হাটে ব্যবসায়ীসহ হাজারো মানুষের উপস্থিতি ঘটে। এ ছাড়া প্রতিদিন শত শত মানুষ চলাচল করে থাকে।

দোকান ঘরের মালিক আতোয়ার রহমান আতাবরের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, সরকার যে পর্যন্ত অধিগ্রহণ করেছেন তার বাইরে চারটি ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছি। ভাড়া দেয়া দোকানে লোকজন কোথায় দাঁড়িয়ে কেনাকাটা করেন জানতে চাইলে বলেন, পাকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে কেনাকাটা করছে। তাহলে সরকার পাকা রাস্তার পাশে জমি অধিগ্রহণ করেননি জানতে চাইলে লাইন কেটে দেন। 

ইমরান শিকদার নামে ঘরের আরেক মালিক বলেন, আমার আড়াই শতাংশ জমি ছিল। সরকার ১.৫৯ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ করেছে। সরকারি জমির পরে নিজের জমিতে ঘর নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন বলে জানান।

গোড়াই ইউনিয়ন (পশ্চিম) আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. হুমায়ুন কবির জানান, সার্ভিস লেনের পর ৬/৭ ফুট সরকারি জমি রয়েছে। আমি সার্ভিস লেনের ১০ ফুট পর নিজের জমিতে দুটি ঘর নির্মাণ করেছি। পূর্বদিকে অনেকেই সার্ভিস লেন ঘেঁসে ঘর করে ভাড়া দিয়েছেন। সার্ভিস লেনের পাশে ফুটপাত না থাকায় রাস্তায় হেটে চলাচল করতে হয়।  চলাচলের সময় যানবাহন এসে মানুষকে ধাক্কা মারছে। সঠিক পরিমাণ করে জনসাধারণের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে ফুটপাত নির্মাণের দাবি জানান তিনি।

ফোর লেন প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক এ বি এম খোরশেদ আলম জানান, প্রকল্পের শেষ সময়ে যোগদান করেছি। জমির পরিমাণ সম্পর্কে আমার জানা নেই। তবে বাজার এলাকায় যেভাবে ঘর নির্মাণ করা হয়েছে তাতে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। জনসাধারনের চলাচলে নিরাপত্তার জন্য সরকারি জমি উদ্ধারে পরিমাপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সড়ক সংযোগ প্রকল্পের উপসহকারী প্রকেশৈলী মো. সাইফুর রহমান জানান, বাজার এলাকায় পাকা রাস্তার দক্ষিণপাশে অধিগ্রহণকৃত জমির পরিমাণ কম। কিছু জমি দখল করে ঘর নির্মাণ করা হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে দ্রুত সময়ের মধ্যে অধিগ্রহণকৃত জমি পরিমাপ করে উদ্ধারপূর্বক ফুটপাত করা হবে বলে তিনি জানান।

টাঙ্গাইলের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা মোসা. মারিয়াম খাতুনের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে পারবেন না। কোনো অভিযোগ থাকলে লিখিত আকারে জানানোর পরামর্শ দেন।

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মো. আতাউল গণির সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে খোঁজ নিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



সাতদিনের সেরা