kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

সরকারি তদন্তেই টিকা বাণিজ্যের জারিজুরি ফাঁস; সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব, ক্ষোভ-অসন্তোষ

অনলাইন ডেস্ক   

২ আগস্ট, ২০২১ ২০:২৭ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সরকারি তদন্তেই টিকা বাণিজ্যের জারিজুরি ফাঁস; সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব, ক্ষোভ-অসন্তোষ

সরকারি তদন্তেই ধরা পড়ল পটিয়ায় হুইপ বাহিনীর টিকা বাণিজ্যের জারিজুরি। গায়েব হয়ে গেছে উপজেলাটির সরকারি টিকা সংরক্ষণাগারের সিসি ক্যামেরার ফুটেজও! তদন্তে উঠে এসেছে, অনুমতি ছাড়া ও যথাযথ নিয়ম না মেনেই প্রদান করা হয় ২৬০০ টিকা। টিকা নিরাপত্তার 'কোল্ড বক্স' ছাড়াই টিকা স্থানান্তর হয়। এ ছাড়া রেজিস্ট্রেশন কার্ড জালিয়াতিসহ ঘোরতর অনিয়ম করা হয়। ‌বারকোড স্ক্যান করতেই ধরা পড়ে যায় শুভঙ্করের ফাঁকি! দুই দিনে প্রদানকৃত ২৬০০ টিকার উপস্থাপিত রেজিস্ট্রেশন কার্ডের মধ্যে অন্তত ২২০০ কার্ডই ভুয়া। অনুমতি ছাড়া এই টিকাদান শুধু নয়, বিশেষজ্ঞ স্বাস্থ্য সহকারীর মতোই হুইপ সামশুলের ভাই মহব্বত নিজেই টিকা দিয়েছেন টিকাপ্রত্যাশীদের! সব মিলে হুইপের পোষ্য বাহিনীর দ্বারা ভয়াবহ 'স্বাস্থ্যঝুঁকি' তৈরি হয়েছে পটিয়ায়- এমন তথ্য-উপাত্তই উঠে এসেছে কিছু সরকারি তদন্তে। ‌

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালকের নির্দেশে গত শনিবার তদন্ত কমিটি গঠিত হয়।‌ দুই দিন তদন্তের সময় দিয়ে গঠিত এ কমিটি তদন্তকাজ শেষ করে সোমবার সন্ধ্যায় পরিচালক বরাবরে রিপোর্ট জমা দেন। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ডা. অজয় দাশ তদন্ত রিপোর্টের ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু জানাতে অপারগতা প্রকাশ করলেও একপর্যায়ে স্বীকার করেছেন 'তদন্তকালে টিকাদান প্রক্রিয়ার অসঙ্গতি ধরা পড়েছে'। 

তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার ঘণ্টাখানেক আগে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এমনটি জানালেও তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে বের হয়ে আসে তদন্তে ওঠে আসা পটিয়ায় হুইপ বাহিনীর টিকা বাণিজ্যের ঘোরতর অনিয়মের চিত্র।

কী আছে সরকারি তদন্তে?
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানায়, যথাযথ অনুমোদন না নিয়ে ও নিয়মবহির্ভূতভাবে পটিয়ার শোভনদন্ডী ইউনিয়নে হুইপ সামশুল হক চৌধুরী এমপির বাড়ি লাগোয়া একটি অস্থায়ী ক্যাম্পে আলোচ্য টিকাগুলো দেওয়া হয়। তদন্তকালে অভিযুক্ত হইপ পোষ্য কথিত ছাত্রলীগ নেতা ও ইপিআই কর্মসূচির টেকনোলজিস্ট রবিউল হুসাইন তদন্ত টিমকে মোট ২৬ শ টিকার রেজিস্ট্রেশন কার্ড উপস্থাপন করেন। কার্ডগুলো সংশ্লিষ্ট বারকোড পরখ করে দেখা যায়, দুই শতাধিক কার্ড পুরনো রেজিস্ট্রেশনকৃত। দুই হাজারের বেশি কার্ড রেজিস্ট্রেশনের জন্য এর পূর্বে আইডি কার্ড নিয়ে আসা মানুষের। আর তাদের নামে রেজিস্ট্রেশন কার্ড রবিবার সকালেই পূরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এটি স্পষ্ট যে, পুরনো জমে থাকা আইডি কার্ড দিয়েই তদন্ত কমিটির ঘটনাস্থল পরিদর্শনের আগে এসব রেজিস্ট্রেশন কার্ড পূরণ করা হয়। 

রাষ্ট্রীয় অপচয়
রেখে যাওয়া আইডি কার্ড দিয়ে রেজিস্ট্রেশন কার্ড পূরণ করা এই প্রায় ২ হাজার মানুষ পরবর্তী সময়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে যখন রেজিস্ট্রেশন করতে আসবেন, তখন পরিস্থিতিটা কেমন দাঁড়াবে, তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন। তখন তাদের জ্ঞাতসারে আবার রেজিস্ট্রেশন হলে তাদের নামে আবার টিকা কি বরাদ্দ হবে? এ ক্ষেত্রে এক ব্যক্তির নামে সরকারি টিকা দ্বিগুণ বরাদ্দ কি রাষ্ট্রীয় অপচয় হবে না?- এমন প্রশ্নও ভাবিয়ে তুলেছে সংশ্লিষ্টদের।

শুক্র ও শনিবার দুই দিনেই একটি ইউনিয়ন পর্যায়ের ক্যাম্পে এতগুলো টিকা প্রদানের ঘটনা অস্বাভাবিক মনে হয়েছে তদন্ত কমিটির কাছে। গণমাধ্যমের এক প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কমিটির প্রধান তা স্বীকারও করেন। সরকারি একটি সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম বিভাগের টিকাদান প্রক্রিয়ায় চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল সর্বোচ্চ জনবল দিয়ে পরিচালিত হয়। অথচ এখানেও দুই দিনে শোভনদন্ডী ইউনিয়নের সেই ক্যাম্পটির মতো এত বেশি গতিতে টিকা প্রদান সম্ভব হয়নি। ওই ক্যাম্পে দুই দিনে ২৬০০ টিকা প্রদানের ঘটনা একেবারেই অস্বাভাবিক। তা ছাড়া ক্যাম্পটিতে কোনো ইপিআই প্রশিক্ষিত লোকবলও ছিল না।

স্থানীয় সূত্রের ধারণা, প্রশিক্ষণহীন উপজেলার সুইপার তথা ঝাড়ুদার পর্যায়ের লোকজন দিয়ে এই টিকা প্রদান করা হয়ে থাকতে পারে। এদিকে, ঘটনাস্থলে হুইপ সামশুলের ভাই মহব্বত টিকা দিচ্ছেন এমন ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টিও কর্তৃপক্ষকে কম-বেশি উদ্বিগ্ন করছে।

সরকারি অভিন্ন সূত্র জানায়, সাধারণত সিভিল সার্জন অফিস থেকে উপজেলা পর্যায়ে স্থানান্তর করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইপিআই টিকা সংরক্ষণাগারের ফ্রিজেই টিকা সংরক্ষণ করা হয়। সেখান থেকেই কোনো ইউনিয়ন বা ক্যাম্প পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সে ক্ষেত্রে 
স্বাস্থ্য নিরাপত্তার কথা ভেবে ভ্যাকসিন ক্যারিয়ারের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শোভনদন্ডী ইউনিয়নে হুইপের বাড়ি লাগোয়া ওই ক্যাম্পে টিকা স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত রবিউল এই ক্ষেত্রে কোল্ড বক্সে টিকা নিয়ে যাননি। এমন অভিযোগ উঠলে তদন্তদলের কর্মকর্তারা উপজেলার ওই সংরক্ষণাগারের সিসি ফুটেজ খোঁজ করতে গিয়ে অবাক হন! তদন্ত কমিটি বৃহস্পতিবারের পরে ওই সিসি ক্যামেরার কোনো ফুটেজের হদিশ পাননি। 

সরকারি নির্ভরযোগ্য সূত্রটি আরো জানায়, উপজেলার হেল্থ কমপ্লেক্সেই পূর্ণ লোকবল নিয়ে গোটা দিনে (সকাল ৯টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত) মাত্র চার শ থেকে পাঁচ শ টিকা দৈনিক প্রদান করার সক্ষমতা আছে। সেখানে একটি ক্যাম্পে প্রশিক্ষিত লোকবল ছাড়া কিভাবে দুই দিনে ২৬০০ অর্থাৎ দিনে ১৩০০ করে টিকা প্রদান করা হলো এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

টিকার বদলে অন্য কিছু নাতো? 
এলাকার সচেতন ও সাধারণ মানুষের অনেকের মুখে নানা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। তারা বলছেন, উপজেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে ওই টিকা নিয়ে যাওয়ার পরে তা কি আদৌ কোনো ফ্রিজ বা কোল্ড বক্সে ঠিক মাত্রায় রক্ষিত ছিল? যদি না থাকে তবে সেই অরক্ষিত টিকা কিভাবে এলাকার জনগণকে দেওয়া হলো! নাকি সেই টিকা অন্য কারো হাতে চলে গেছে? বা অন্য কোথাও মজুদ বা বিক্রি হয়েছে? টিকার বদলে সাধারণ মানুষকে সাদা পানি বা অন্যকিছু দেওয়া হয়েছে?

এলাকায় ক্ষোভ-অসন্তোষ
হুইপ বাহিনীর এমন টিকা বাণিজ্যে এলাকায় ক্ষোভ-অসন্তোষ বাড়ছেই।‌ হুইপ সামশুলের এলাকায় টিকা প্রক্রিয়ার অপবাণিজ্য নিয়ে যখন তুমুল অভিযোগ- তখন এলাকাটিতে করোনায় ত্রাণ নিয়ে অবস্থানরত কেন্দ্রীয় যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক মুহাম্মদ বদিউল আলম 'টিকা নিয়ে নয়ছয় বরদাশত করা হবে না' বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

জেলা আওয়ামী লীগের নেতা মোহাম্মদ সেলিম নবীসহ অনেকেই মনে করেন, 'দেশের সাধারণ মানুষকে টিকা প্রদানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিক উদ্যোগ কোনো লুটেরা দুর্নীতিবাজের গ্রাসে যাতে বিতর্কিত না হয়, সেটি দেখভাল করার দায়িত্ব সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের।‌'

পটিয়ায় হুইপ ও তার পুত্র শারুন চৌধুরীকে নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। মুক্তিযোদ্ধা শামসুদ্দিন আহমেদকে লাঞ্ছনা ও হুমকির অভিযোগে অতিসম্প্রতি হুইপ বাহিনীর বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম শহরের রাজপথেও বিক্ষোভ মিছিল করেন মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের সন্তানেরা।



সাতদিনের সেরা