kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৩ আশ্বিন ১৪২৮। ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১। ২০ সফর ১৪৪৩

তদন্তে ধরা ঘোরতর অনিয়ম

হুইপের ইউনিয়নে অনুমোদন ছাড়াই দেওয়া হয় ২৬০০ টিকা!

অনলাইন ডেস্ক   

১ আগস্ট, ২০২১ ২০:১১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হুইপের ইউনিয়নে অনুমোদন ছাড়াই দেওয়া হয় ২৬০০ টিকা!

ফাইল ছবিতে হুইপ সামশুল হক চৌধুরী (বাঁয়ে) ও রবিউল হুসাইন (ডানে)

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালকের গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্তেও হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর’র এলাকায় টিকাদানে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ব্যত্যয় ধরা পড়েছে। উঠে এসেছে নানা অনিয়মের চিত্র। আজ রবিবার তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শনকালে এসব অনিয়মের তথ্য জানতে পারে। তদন্ত কমিটি হুইপ সামশুলের ইউনিয়নে বিধিবহির্ভূতভাবে ২ হাজার ৬০০ টিকা প্রদানের আলামত পায়। জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত রবিউল অনুমোদনহীন এই টিকাদানে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন বলেও সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।‌

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশের অন্য কোথায় সরকারি এই টিকাদান কর্মসূচি দলীয় ব্যানারে উদ্বোধন হয়নি, এটি নিয়মও নয়। অথচ হুইপ সামশুল হক চৌধুরী এমপি এই টিকাদান কর্মসূচি দলীয় আয়োজনে উদ্বোধন করেছেন। এ নিয়ে হুইপপন্থীরা সামাজিক মাধ্যমসহ নানাভাবে প্রচারণাও চালায়। হুইপ তার সঙ্গীদের নিয়ে টিকাদান কর্মসূচি পরিদর্শনও করেন।

আগামী ৮ আগস্ট থেকে ইউনিয়ন পর্যায়ে করোনা টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানায় সরকারি সূত্র। কিন্তু এর আগেই ঘটা করে হুইপের প্রচারের জন্যই গত ৩০ ও ৩১ জুলাই শোভনদন্ডি ইউনিয়নে এরকম টিকা বাণিজ্য হয় বলে স্থানীয়রা জানান। 

নির্ভরযোগ্য সূত্র আরও জানায়, এরকম বাছবিচারহীনভাবে একটি ইউনিয়নেরই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকাদানের ঘটনা নজিরবিহীন।‌ এর মধ্য দিয়ে পটিয়ার অন্য ইউনিয়নের বাসিন্দাদের বঞ্চিত হবার আশঙ্কা তৈরি হল।‌ রাজনৈতিক সূত্রের দাবি, হুইপ পোষ্যের এমন টিকা বাণিজ্যে মূলত ‘বলি হলেন’ সাধারণ পটিয়াবাসী।

হুইপ সামশুলের প্রভাবে চাকরি পাওয়া কথিত ছাত্রলীগ নেতা ও মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ইপিআই) রবিউল হুসাইনের বিরুদ্ধে উঠেছে এই টিকা বাণিজ্যের ভয়াবহ অভিযোগ। রবিউল প্রথম পর্যায়ে টিকা প্রদান কালেও অর্থের অবৈধ লেনদেনে জড়িত ছিলেন বলেও অভিযোগ ওঠে।‌ তার দোর্দণ্ড প্রতাপে যেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলরাও কেউ কেউ অসহায়। 

স্থানীয় সূত্র জানায়, হাসপাতালে খাদ্য ও সরঞ্জামসহ নানা রকম সরবরাহের কাজে হুইপ সামশুলের হয়েই নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন এই রবিউল। হুইপ সামশুল সমর্থিত এই  ছাত্রলীগ নেতার ‘টিকা বাণিজ‘ নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে গঠিত হয় তদন্ত কমিটি। প্রাথমিকভাবে রেজিস্ট্রেশন ছাড়াই বিধিবহির্ভূতভাবে অর্থের বিনিময়ে ৭০০ টিকা প্রদানের অভিযোগ উঠলে রবিবার তদন্তের প্রথমদিনেই এই সংখ্যা ২৬০০ বলে তথ্য মেলে।

খোদ হুইপ সামশুলের নিজের ইউনিয়ন শোভনদন্ডীতে এই ঘটনা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকেই যেন বিতর্কে ফেলেছে। গতকাল শনিবার বিকেলে তদন্ত কমিটি গঠন করেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবির।‌ চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. শেখ ফজলে রাব্বী জানান, তিন সদস্যের গঠিত এই তদন্ত কমিটিকে দুই দিনের সময় দেওয়া হয়। আগামী মঙ্গলবার এই তদন্ত রিপোর্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের পরিচালক বরাবরে জমা দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। 

সিভিল সার্জন এ-ও বলেন, প্রয়োজন হলে তদন্তের সময় বাড়ানোও হতে পারে।‌ টিকাদান প্রক্রিয়ায় অনিয়ম প্রমাণিত হলে কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না।

তদন্ত কমিটির সদস্য ডা. অজয় দাশ জানান, বেলা দুইটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত টানা চার ঘণ্টা যারা যারা এই টিকাদান প্রক্রিয়ায় জড়িত তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।‌ ঘটনা যে হয়েছে, তা সত্যি। তবে কী পরিমাণ টিকা প্রদানের অভিযোগ উঠেছে, তা টিকা গ্রহণকারীদের সম্মতিপত্রের বারকোড মিলিয়ে দেখাসহ অন্যান্য নিরীক্ষণ করা হবে। টিকা প্রদানের প্রথম পর্বের পুরনো কাগজগুলোও মিলিয়ে দেখা হবে।

তদন্তের স্বার্থে বিস্তারিত কিছু জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন কমিটির এই সদস্য। এদিকে, পটিয়া স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সব্যসাচী নাথ জানান, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ইপিআই) রবিউল হোসেনের বিরুদ্ধে অনুমোদন ছাড়া টিকা প্রদান, অর্থ আদায়সহ সুনির্দিষ্ট নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। 

অন্যদিকে, অভিযুক্ত রবিউলকে মুঠোফোনে তার বক্তব্য জানতে কয়েক দফা যোগাযোগ করে দিনভর সাড়া পাওয়া না গেলেও এলাকায় কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমকে এ টিকা প্রদানের বিষয়টি আগেই হুইপকে অবগত করার কথা জানিয়েছেন তিনি। রবিউল নিজের এলাকায় টিকা দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।‌ 

রবিউল নিজেই সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে নিজের আইডি থেকে হুইপ সামশুলের সাথে ঘনিষ্ঠতার ছবি প্রকাশ করেছেন। টিকা প্রদান কর্মসূচিতে হুইপের সম্মতি ও উপস্থিতির কথাও জানান। বিভিন্ন সময়ে হুইপপন্থী ছাত্রলীগের ‘সভাপতি’ বলেও দাবি করেন রবিউল- এমন অভিযোগও রয়েছে।

বৃহস্পতিবার থেকেই এই মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলেও শনিবার পর্যন্ত তার তত্ত্বাবধানে টিকা দেওয়া হয় হুইপ সামশুলের নিজের ইউনিয়ন শোভনদন্ডীতে। দেশজুড়ে যখন টিকা নিয়ে সংকট- উৎকণ্ঠা, তখন সরকারি বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করে ব্যক্তিগত উদ্যোগে অর্থ নিয়ে এমন টিকা প্রদানের ঘটনায় এলাকাবাসীর মনে ক্ষোভ দানা বাঁধছে।



সাতদিনের সেরা