kalerkantho

রবিবার । ১১ আশ্বিন ১৪২৮। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৮ সফর ১৪৪৩

ঘানি টেনে চলছে মা-মেয়ের জীবনযুদ্ধ! (ভিডিও)

১২০০ গ্রাম তেল উৎপাদনে মা-মেয়েকে ঘানির জোয়ালে হাঁটতে হয় ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার

মো. আব্দল হালিম, ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ)   

১ আগস্ট, ২০২১ ০৮:৩৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঘানি টেনে চলছে মা-মেয়ের জীবনযুদ্ধ! (ভিডিও)

দেশি সরিষা পেষাই করে তেল বের করার যন্ত্রকে ঘানি বা ঘানিগাছ বলা হয়। সাধারণত ঘানি টানার জন্য কলুরা গরু ব্যবহার করেন। তবে দরিদ্র কমলা বেগমের গরু কেনার সামর্থ্য নেই। অভাবের সংসার। এক দিন ঘানি না ঘোরালে সংসারের চাকা ঘোরে না। অভাব যখন ঘরের দরজায় উঁকি দেয়, চারদিক তখন অন্ধকার হয়ে আসে পরিবারটির। কখনো স্বামী-স্ত্রী, কখনো মা-মেয়ে কাঠের তৈরি কাতলার ওপর প্রায় ৪০০ কেজি ওজন বসিয়ে ঘাড়ে জোয়াল নিয়ে ঘানি টানছেন প্রায় ৩২ বছর ধরে। ঘানির টানে ডালার ভেতর সরিষা পেশাই হয়ে পাতলানী দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা তেল পড়ে ঘটিতে। বাজারে বা গ্রামে সেই তেল বিক্রি করতে পারলেই সংসার চলে তাঁদের।

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার কুশমাইল কড়ইতলা গ্রামে তারা মিয়ার স্ত্রী কমলা বেগম। তাঁদের দুই ছেলে ও এক কন্যাসন্তান রয়েছে। দুই সন্তান বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেছে। জমিজমা নেই। ভিটাবাড়িটুকুই সম্বল। মানুষকে নির্ভেজাল তেল খাওয়াবেন বলে বংশপরম্পরায় এ পেশা তাঁরা এখনো ছাড়ছেন না। তাঁদের বংশের সবাই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। গ্রামের মানুষ এ পেশা ছেড়ে দিতে বলেন এবং মাঝেমধ্যেই কটূকথাও বলেন। সব কিছু সহ্য করে বাপ-দাদার পেশা আগলে ধরে রেখেছেন। মেশিনের তৈরি সরিষার তেলের দাম বাজারে কম। ঘানি ভাঙা তেলের দাম বেশি। সাধারণ মানুষ বেশি দামে ঘানির তেল কিনতে চায় না। যারা ভেজালমুক্ত ঘানি ভাঙা খাঁটি সরিষার তেল কেনেন, সংখ্যায় তাঁরা একেবারেই কম।

ফুলবাড়িয়ায় কড়ইতলা ও পানেরভিটা দুই গ্রামে একসময় অনন্ত দুই শতাধিক পরিবারের ঘানিগাছ ছিল। কালের বিবর্তনে আর ইঞ্জিলচালিত যান্ত্রিক চাকার কারণে ঘানিশিল্প এখন প্রায় বিলুপ্তের পথে। কুশমাইল কড়ইতলা গ্রামে দুটি বাড়িতে এখন মাত্র তিনটি ঘানিগাছ রয়েছে। শমসের আলী, চান মিয়া ও তাঁর ছেলে তারা মিয়া- এই তিনজনের ঘানিগাছ রয়েছে। শমসের আলী ছেলে-মেয়েরা ঘানিগাছের জোয়াল টানেন।

চাঁন মিয়ার বয়স প্রায় ৬৫ বছর, তাঁর স্ত্রী ফিরোজা বেগমের বয়স ৫৮ বছর। একসময় তাঁরা ঘানি ভাঙা ৬ থেকে ৭ কেজি তেল উৎপাদন করতে পারতেন। বয়সের কারণে আগের মতো শরীরের শক্তি নেই। হতদরিদ্র স্বামী-স্ত্রী এখন মাঝেমধ্যে নিজেরাই ঘাড়ে জোয়াল নিয়ে ঘানি টানেন। ১ থেকে ২ কেজি তেল উৎপাদন করতে পারলে বাজারে নিয়ে বিক্রি করে কোনোরকমে সংসার চালান। বয়সের ভারে মাঝেমধ্যে শরীর ভালো থাকে না। সে সময়টা দরিদ্র সন্তানের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয় এক মুঠো ভাতের জন্য।

সরেজমিনে কড়ইতলা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের ভেতরে একসঙ্গে দুটি বাড়ি। বাড়ি দুটিতে তিনটি ঘানিগাছ রয়েছে। দুটিতে তেল উৎপাদন হচ্ছে। তারা মিয়ার ঘানিগাছ বন্ধ রয়েছে। কমলা বেগমের স্বামী তারা মিয়া খুপরি একটি ঘরের বারান্দায় বসে তেল মেপে দিচ্ছেন মামুন রানা নামের এক যুবককে। মামুন রানার ‘ফেরিওয়ালা’ নামে অনলাইনে একটি ব্যবসা সাইট রয়েছে। ঘানি ভাঙা খাঁটি সরিষার তেল সংগ্রহ করে তিনি অনলাইনে বিক্রি করেন। পাশের একটি ছোট্ট ভাঙা ঘরে ঘানি টানছেন কমলা বেগম (৪৬) ও তাঁর মেয়ে কাকলি বেগম (২২)। ঘানির ডালার ভেতরে দেশি চার কেজি সরিষা দিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা যাবৎ ঘানি টেনে ১২০০ গ্রাম পরিমাণ তেল উৎপাদন করেছেন। খৈল হয়েছে প্রায় তিন কেজি। দেশি সরিষার দাম এখন বেশি হওয়ায় প্রতি কেজি তেল বিক্রি করেন ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা। আর খৈল বিক্রি করেন ৬০ টাকা কেজি দরে। ফোঁটায় ফোঁটায় চুইয়ে ১২০০ গ্রাম তেল উৎপাদন করতে গিয়ে ঘাড়ে জোয়াল নিয়ে মা-মেয়েকে হাঁটতে হয়েছে অন্তত ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার। প্রতিদিন তেল বিক্রি করে যা আয় হয় তাই দিয়ে তাঁদের সংসার চলে। ভাগ্যবদলের আশায় স্বামীর পূর্বপরুষদের এ পেশা কমলা বেগম বিয়ের পর বেছে নিলেও অভাব পিছু ছাড়েনি তাঁদের। সকাল ৬টা থেকে ১০টা, বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘানি টানেন। প্রতিদিন ৮ থেকে ১২ কেজি সরিষা ভাঙতে পারেন।

কড়ইতলা গ্রামের আবুল হোসেন বলেন, একসময় এ গ্রামে অনেক গাছ ছিল (ঘানিগাছ) এখন নেই বললেই চলে, বর্তমানে দুটি বাড়িতে রয়েছে। কমলা বেগমের পরিবার অভাবগ্রস্ত, গরু কেনার সামর্থ্য নেই। ঘাড়ে জোয়াল নিয়ে স্বামী, স্ত্রী ও মেয়ে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেন।

কমলা বেগম জানান, টাকার অভাবে গরু কিনতে পারি না, মা-মেয়ে ও স্বামীকে নিয়ে বুকে ডেঙ্গা বাধিয়ে জোয়াল টানি, একদিন জোয়াল টানতে না পারলে খাব কী? বয়স হচ্ছে, আগের মতো পারি না, দুটি না হলেও একটি গরু থাকলেও এমন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম মা-মেয়ের করতে হতো না। মাঝেমধ্যে বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ি ঘানি টেনে সহযোগিতা করেন।

তারা মিয়া বলেন, আগের মতো দেশি সরিষা পাওয়া যায় না, গ্রামে ঘুরে ঘুরে সরিষা সংগ্রহ করি, তার পরও দাম বেশি। বাপ-দাদার সঙ্গে জোয়াল (ঘানি) টানতে টানতে অন্য কোনো পেশা শিখতে পারিনি। প্রায় চার যুগ ধরে নিজে জোয়াল টানছি। এখন আর শরীর চায় না, স্ত্রীর সঙ্গে মেয়ে কাকলি জোয়াল টানে। একটি গরু থাকলে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বংশপরম্পরায় পেশাটি ধরে রাখতে পারতাম।



সাতদিনের সেরা