kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ আশ্বিন ১৪২৮। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৩ সফর ১৪৪৩

অতিবৃষ্টিতে রাঙ্গাবালীতে জলাবদ্ধতা

খাল-নালা দখল করে প্রভাবশালীর মাছের ঘের, নামছে না পানি

এম সোহেল, রাঙ্গাবালী   

২৯ জুলাই, ২০২১ ১৬:৩৬ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



খাল-নালা দখল করে প্রভাবশালীর মাছের ঘের, নামছে না পানি

কদিন আগেও ছিল বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ। চার দিনের টানা বর্ষণে আমনের বীজতলা তলিয়ে অথৈয় পানিতে ঘেরা। দৃষ্টি যতদূর যায়, থৈ থৈ পানি। কৃষি জমির কোথাও হাঁটু সমান, কোথাও কোমর সমান পানি জমে আছে। বাড়িঘরের চারপাশ পানিতে ডুবে আছে। কারও কারও বাড়ির উঠোনেও পানি চলে গেছে।

আজ বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিনে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নের উত্তর চরমোন্তাজ, মধ্য চরমোন্তাজ, চরমণ্ডল, চরলক্ষ্মী, পূর্ব চরমোন্তাজ গ্রামে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে।

শ্রাবণের অতিবর্ষণের কারণে ওই সব গ্রামে কদিন ধরে এ জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। কিন্তু পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। এতে করে আমন আবাদের বীজতলা ডুবে বীজ পচে গিয়ে আমন আবাদ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। এমন অবস্থায় হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন তারা। স্থানীয় কৃষকদের মতে, পানি নিষ্কাশনে বাধা প্রভাবশালীদের মাছের ঘের। খাল-নালা দখল করে প্রভাবশালীরা মাছের ঘের করায় কৃষি জমি থেকে পানি নামছে না।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২ হাজার ৫৯৪ হেক্টর আমন বীজতলা আবাদ করা হয়েছে এর মধ্যে ২ হাজার হেক্টর পানির নিচে রয়েছে। এ ছাড়া ৮৪০ হেক্টর আউশ আবাদ করা হয়েছে এর ৩০০ হেক্টর রয়েছে পানির নিচে, উফশী ১ হাজার ৩৪০ হেক্টর এর মধ্যে পানির নিচে রয়েছে ১ হাজার ৭২ হেক্টর, সব্জি ৪৫০ হেক্টর এর মধ্যে পানির নিচে ১৮০ হেক্টর।

এদিকে, চরমোন্তাজ ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মফিজুল ইসলাম বলেন, চরমোন্তাজ ইউনিয়নে গ্রামে ৪৫২ হেক্টর জমিতে আমনের বীজতলা করা হয়েছে এর ৮০ শতাংশ পানির নিচে নিমজ্জিত, উফশী ৩২০ এর মধ্যে ২৫৬ হেক্টর পানির নিচে এবং স্থানীয় ১৩২ এর মধ্যে ১০৫ হেক্টর পানির নিচে নিমজ্জিত রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বলা যাচ্ছে না। স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে বীজতলার ক্ষতি হবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় শ্রাবণের এই দ্বিতীয় সপ্তাহের অতিবর্ষণে চরমোন্তাজ ইউনিয়নের কৃষি জমিতে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এখন বিস্তীর্ণ আমনের বীজতলা ডুবে গেছে ক্ষেতজুড়ে পানি আর পানি। শুধু কৃষি জমিতে নয়, বাড়িঘরের আশপাশও পানিতে একাকার। তাই বিপর্যস্ত হচ্ছে জীবন-জীবিকা।

উত্তর চরমোন্তাজর গ্রামের কৃষক শহিদুল খান বলেন, 'বৃষ্টির পানিতে আমার ক্ষ্যাত (ক্ষেত), বাড়িঘর তলাইয়া রইছে। বীজতলা করতে পারতাছি না। এবার মনে হয় আমার ৫ একর জমিই খিল (অনাবাদি) থাকবে।'

ওই গ্রামের বাসিন্দা রাশেদ খান বলেন, 'পানি সরানোর ব্যবস্থা না করলে লাগাতার বৃষ্টিতে পুরা গ্রাম তলাইয়া যাইবে। এখনি ঘরের চাইরপাশে পানি। ঘর থেকে বাইর হইতে পারি না।'

স্থানীয় কৃষকরা জানায়, বর্ষা মৌসুমে ওই গ্রামের কৃষিজমির বৃষ্টি-বর্ষার পানি খাল-নালার মাধ্যমে চরগঙ্গা স্লুইস গেট দিয়ে সরে যেত। কিন্তু কৃষি জমি ঘেঁষে বয়ে যাওয়া সরকারি খাল-নালা ১০ বছর আগেই দখল করে অন্তত ১০-১৫টি মাছের ঘের করেছে প্রভাবশালীরা। যার কারণে কৃষি জমিতে বৃষ্টি-বর্ষায় জলাবদ্ধতা দেখা দিলেও স্লুইস গেট দিয়ে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে পানি নামার বিকল্প হিসেবে থাকা একমাত্র কালভার্টটিও দুই বছর আগে ভেঙে গেছে। এই কারণে কৃষকদের দুর্ভোগ আরো বেড়ে গেছে।

স্থানীয় রহমান দফাদার ও জিয়া ফরাজি বলেন, ‘সব জায়গায় ঘের। পানি নামার সুযোগ নেই। খাল-নালা বাঁধ দিয়ে ঘের করার কারণে পানি সরছে না। ঘেরে মাছ চাষ করে কিছু মাথাওয়ালা প্রভাবশালীরা লাভবান হয়। কিন্তু চাষবাস না করে শত শত কৃষক অভাবে পড়ে।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, টানা কয়েকদিনের ভারি বর্ষণে উপজেলার নিচু এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে এখনি ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বলা যাচ্ছে না কারণ ওইসব জমিতে যদি স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয় সেক্ষেতে ক্ষতি কম হবে। আর পানি জমে গেলে ক্ষতি হবে। তবে আমরা স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও মেম্বরদের সাথে যোগাযোগ করেছি যাতে স্লুইজগেটগুলোর মাধ্যমে যথাযত পানি নিষ্কাশন করা হয়। কোনোভাবেই যেন কৃষকরা ক্ষতির মুখে না পড়ে।

রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাশফাকুর রহমান বলেন, কৃষি কর্মকর্তাকে বলা আছে এবং আমি বলে দিয়েছি কোথায় যদি কোনো বীজতলা বা পানি নিষ্কাশনে সমস্যা হচ্ছে তাৎক্ষণিক আমাকে জানাবেন। আশা করি কৃষকের কোনো ধরনের অসুবিধা হবে না। 



সাতদিনের সেরা