kalerkantho

বুধবার । ১৪ আশ্বিন ১৪২৮। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২১। ২১ সফর ১৪৪৩

‘দোয়া করিচ্চি বসুন্ধরা গ্রুপের যেন ভালো হয়’

বগুড়ার তিন উপজেলার ১৩০০ অসহায় পরিবার ত্রাণ পেল

লিমন বাসার ও নাজমুল হুদা, বগুড়া থেকে    

২৯ জুলাই, ২০২১ ০৩:২৭ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



‘দোয়া করিচ্চি বসুন্ধরা গ্রুপের যেন ভালো হয়’

বগুড়া জিলা স্কুল মাঠে গতকাল দুস্থদের হাতে বসুন্ধরা গ্রুপের খাদ্য সহায়তা তুলে দেন পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা।

পথে পথে কাগজ কুড়াচ্ছিলেন আছিয়া খাতুন। একবেলা খাবার জোগাতে প্রতিদিন পথে পথে তাঁকে খুঁজতে হয় পড়ে থাকা কাগজ। দিনভর কাগজ কুড়িয়ে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে বিকেলে বিক্রি করেন। কোনো দিন আয় ৪০, কোনো দিন ৫০ টাকা। এই দিয়ে একবেলা কোনো রকম খেতে পান আছিয়া। স্বামী হারিয়ে ৪০ বছর ধরে এভাবে কাটছে তাঁর জীবন। পথের ধারে প্লাস্টিকের বস্তা হাতে সম্প্রতি আছিয়াকে বসে থাকতে দেখেন কালের কণ্ঠ শুভসংঘের সদস্যরা। এগিয়ে গিয়ে তাঁর হাতে তুলে দেন বসুন্ধরা গ্রুপের টোকেন। আছিয়া বুঝতে পারেন না কাগজের এই ছোট টুকরাটি তাঁকে কেন দেওয়া হলো। জিজ্ঞেস করতেই শুভসংঘের সদস্যরা জানালেন, বুধবার সকালে তাঁকে ১০ কেজি চাল, তিন কেজি ডাল আর তিন কেজি আটা দেওয়া হবে। এ কথা জেনে ভীষণ খুশি আছিয়া। শুভসংঘের সদস্যদের কল্যাণ কামনা করে ফের শুরু করেন পথে পড়ে থাকা কাগজ কুড়ানো।

গতকাল বুধবার সকালে বগুড়া জেলা স্কুল মাঠে ঠিক সময়ে ত্রাণ নিতে এসেছিলেন আছিয়া। টোকেন দেখে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় বসুন্ধরা গ্রুপের খাদ্যসামগ্রী। একসঙ্গে এতগুলো খাদ্যসামগ্রী হাতে পেয়ে অশ্রুসিক্ত আছিয়া বললেন, ‘দোয়া করিচ্চি বসুন্ধরা গ্রুপের যেন ভালো হয়, ভালো থাকে। তারা হামাকোরোক আরো বেশি বেশি দিব্যার পারে।’

বসুন্ধরা গ্রুপের ত্রাণ পেয়েছেন মানবেতর জীবন যাপন করা আজাজ আলী প্রামাণিক। তিনি বলেন, ‘হামি একন কাজকাম করবার পারিচ্চি না। ছোট ছোল সোনার দোকানত কাম করিচ্চিলো, তাও একন করবার পারিচ্চে না। হামার বউ স্কুলত আয়ার কাম করে মাসে দুই হাজার ট্যাকা পায়, তা দিয়ে কষ্টে সংসার চলিচ্চে। আপনাকেরে ত্রাণ প্যাইয়া হামাগেরে সাত-আট দিনের কষ্ট ফুরাল বাবা। এই অসময়ে আপনাকেরে ত্রাণ দেওয়াতে হামি লামাজ পইড়া দোয়া করমু।’

আছিয়া-আজাজের মতো বগুড়া জেলার তিনটি উপজেলার ১,৩০০ অসহায় ও দুস্থ পরিবারের সদস্যদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণের মধ্য দিয়ে গতকাল শুরু হয়েছে রাজশাহী বিভাগে কালের কণ্ঠ শুভসংঘের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম। বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় পর্যায়ক্রমে বগুড়া জেলায় চার হাজার ও রাজশাহী বিভাগে ২৪ হাজার পরিবারকে এই খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে।

গতকাল সকালে উপজেলার বগুড়া জিলা স্কুল মাঠে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেন শুভসংঘের সদস্যরা। এ সময় সবার মাঝে মাস্ক বিতরণ এবং করোনা প্রতিরোধে সচেতনতামূলক পরামর্শও দেওয়া হয়।

ত্রাণ বিতরণের সময় উপস্থিত ছিলেন বগুড়া জেলার পুলিশ সুপার মো. আলী আশরাফ ভূঞা। কালের কণ্ঠ শুভসংঘকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শুভসংঘের ‘শুভ কাজে সবার পাশে’ এই স্লোগানটি খুবই চমৎকার। শুভসংঘের ত্রাণ বিতরণের এই আয়োজনকে আমার কাছে মনে হয়েছে, বাংলাদেশে যত ভালো কাজ হচ্ছে তার মধ্যে এটি অন্যতম। আমাদের বগুড়া জেলা সদরে আজ ৭০০ অসহায় পরিবারকে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। পুরো জেলায় মোট চার হাজার পরিবারকে এই সহায়তা দেওয়া হবে। করোনা মহামারির এই ভয়াবহ সময়ে বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় শুভসংঘ এত চমৎকার করে খাদ্য সহায়তা দিল, আমাদের ভাই-বোনরা অন্তত কিছুদিন ঘরে থেকে খেতে পারবেন। আমি এর জন্য তাদের প্রাণ খুলে সাধুবাদ জানাই, ধন্যবাদ জানাই, কৃতজ্ঞতা জানাই। আপনারা সবাই করোনা মহামারির এই সময়ে অযথা ঘর থেকে বের হবেন না। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন। মাস্ক পরবেন। সবাই ভালো থাকবেন।’

ত্রাণ বিতরণ এই কার্যক্রমে আরো উপস্থিত ছিলেন দৈনিক করোতোয়ার সম্পাদক মোজাম্মেল হক লালু, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সেলিম রেজা, শুভসংঘের বগুড়া জেলার উপদেষ্টা আব্দুল মান্নান আকন্দ, আলহাজ মোস্তাফা মাহমুদ শাওন, জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক (ভারপ্রাপ্ত) শ্যামপদ মুস্তফী, শুভসংঘের বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি ডা. সিরাজুল হক ফাইন, সহসভাপতি ডা. শফিক আমিন কাজল। অন্যান্যের মধ্যে নিউজ টোয়েন্টিফোরের জেলা প্রতিনিধি আবদুস সালাম বাবু, মশিউর রহমান জুয়েল, আশফাকুর রহমান চন্দন, আমজাদ হোসেন, শরিফুর রশিদ, আল আদোল আপন, রাকিব আহমেদ, রুমানা ইয়াসমিন, মিনা ইসলাম, নাহিদ সৌরভ, আব্দুর রহিম, জান্নাত আক্তার বর্ষা, রাফসান সাকিন, মিনা ইসলাম, বগুড়া মহিলা কলেজের সাধারণ সম্পাদক ইরা মনি প্রমুখ।

গতকাল দুপুরে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলায় ৩০০ অসহায় ও অতিদরিদ্র পরিবারের মাঝে বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করে শুভসংঘ। এ সময় সবাইকে মাস্কও দেওয়া হয়। পাশাপাশি করোনা প্রতিরোধে দেওয়া হয় সচেতনতামূলক পরামর্শ। উপজেলার দুপচাঁচিয়া দারুস সুন্নাহ ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসা মাঠে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এই ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়।

এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মুহা. আবু তাহির। তিনি বলেন, ‘কালের কণ্ঠ শুভসংঘ সব সময় ভালো কাজ করে। মানুষের কল্যাণে কাজ করে। বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় আজও আমাদের এই উপজেলার ৩০০ অসহায় পরিবারের সদস্যদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছে। করোনার এই ক্রান্তিকালেও তারা দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করছে। তাদের আমি ধন্যবাদ জানাই। আর বসুন্ধরা গ্রুপকে ধন্যবাদ জানাই আমাদের উপজেলার অসহায় মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার জন্য। দেশে বর্তমানে প্রতিদিনই করোনা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এই সময় আপনারা কেউ অযথা ঘর থেকে বের হবেন না। সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন। করোনা মোকাবেলা করতে আমাদের সহযোগিতা করুন।’

এই ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে আরো উপস্থিত ছিলেন দুপচাঁচিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হাসান আলী, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আমিনুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক এমদাদুল হক, মাদরাসার প্রিন্সিপাল মাওলানা ইউসুফ আলী, কালের কণ্ঠ দুপচাঁচিয়া উপজেলা প্রতিনিধি তরিকুল ইসলাম জেন্টু, শুভসংঘের আদমদীঘি উপজেলা শাখার উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম ও লায়ন ফরিদ আহমেদ, সভাপতি জিল্লুর রহমান কমলসহ আহসান হাবীব তুহিন, সাগর, দুপচাঁচিয়া উপজেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি গোলাম ফারুক ও স্বেচ্ছাসেবী ডা. মোহাম্মদ আব্দুল মতিন, মোস্তাফিজুর রহমান, সজিব, রনি, সত্য ও রহিমা প্রমুখ।

দুপচাঁচিয়ায় ত্রাণ বিতরণ শেষে জেলার আদমদীঘি উপজেলায় ৩০০ অতিদরিদ্র পরিবারের সদস্যদের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। উপজেলার সান্তাহার বি.পি. উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এই খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন শুভসংঘের সদস্যরা।

সেখানে ত্রাণ সহায়তা নিতে আসা সুফিয়া বেগম বলেন, ‘হামার স্বামী-ছোল নাই। বয়স্ক ভাতার ট্যাকা দিয়া খাই। কেউ সাহায্য করলে খাবার পারি, না করলে পারি না। তোমাকেরে ত্রাণ প্যাইয়া হামার অনেক উপকার হলো। এই সাহায্য দিয়া কয়েক দিন খাবার পারমু। তোমাকেরে বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকের জন্য দোয়া করিচ্চি। তাই যেন হামাগোরোক আরো বেশি বেশি দিবার পারে। আর যেন ভালো থাকে।’

৮০ বছর বয়সী এজিয়া বেওয়া ভিক্ষাবৃত্তি করেন। শুভসংঘের ত্রাণ পেয়ে তিনি বলেন, ‘আল্লাহ বসুন্ধরাক ভালো করুক। এই খাবারে হামার এক মাস চলবি। তোমাকেরে খাবারেইতো হামরা ব্যাঁচা আছি বাবা। হামরা আর কুটি পামু।’

ত্রাণ বিতরণের এই তিনটি কার্যক্রমেই উপস্থিত ছিলেন কালের কণ্ঠ শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান। উপকারভোগীদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপের মাননীয় চেয়ারম্যান মহোদয়ের নির্দেশনায় আমরা কালের কণ্ঠ শুভসংঘ দেশজুড়ে অসহায় মানুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করছি। আপনাদের যে খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হয়েছে তা দিয়ে একটি পরিবারের সাত থেকে ১০ দিন চলবে। এই সময় আপনারা কেউ ঘর থেকে বের হবেন না। সরকারের দেওয়া করোনা বিধি-নিষেধ মেনে চলবেন। আর আপনারা সবাই বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান মহোদয়ের জন্য দোয়া করবেন। তিনি যেন সব সময় আপনাদের পাশে দাঁড়াতে পারেন।’ 

আদমদীঘি উপজেলায় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে আরো উপস্থিত ছিলেন ছাতিয়ানগ্রাম ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম, পৌরসভার কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, সান্তাহার শহর প্রেস ক্লাবের সভাপতি জিল্লুর রহমান, কালের কণ্ঠ আদমদীঘি উপজেলা প্রতিনিধি তরিকুল ইসলাম জেন্টু, শুভসংঘ আদমদীঘি উপজেলা শাখার উপদেষ্টা ইঞ্জিনিয়ার নজরুল ইসলাম, নাহিদা সুলতানা তৃপ্তি, লায়ন ফরিদ আহমেদ, সভাপতি জিল্লুর রহমান, সহসভাপতি আহসান হাবীব তুহীন ও জাহাঙ্গীর আলম। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন  শাহিনা জোয়াদ্দার, রুবেল, ছোটন, সুমন, মিনি, শাকিল, মুক্তার, তনু, মিশু, শামিম, সোহাগ, জিকু সাগর, হাবীব প্রমুখ।

গতকাল ত্রাণ বিতরণের এই তিন কার্যক্রমে আরো উপস্থিত ছিলেন শুভসংঘ বগুড়া জেলার উপদেষ্টা মোস্তফা মাহমুদ শাওন, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শরীফ মাহ্দী আশরাফ জীবন, শুভসংঘের বগুড়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শিশির মুস্তাফিজ, সদস্য মশিউর রহমান জুয়েল, উত্তরা ইউনিভার্সিটির সাবেক সভাপতি আলমগীর হোসেন রনি ও গণবিশ্ববিদ্যালয় শাখার অর্থ সম্পাদক মিম খান।

আজ বৃহস্পতিবার থেকে আগামী শনিবার পর্যন্ত বগুড়ার আরো ৯টি উপজেলায় এই ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত থাকবে।



সাতদিনের সেরা