kalerkantho

শনিবার । ১০ আশ্বিন ১৪২৮। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৭ সফর ১৪৪৩

জাটকা বেশি, ইলিশ কম : জেলেদের কপালে ভাঁজ

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল ও এম সোহেল, রাঙ্গাবালী থেকে   

২৭ জুলাই, ২০২১ ১৭:২৩ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জাটকা বেশি, ইলিশ কম : জেলেদের কপালে ভাঁজ

ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি আছে, সঙ্গে আছে পূবালী বাতাস। কিন্তু দেখা নেই ইলিশের। সাগরে টানা ৬৫ দিনের অবরোধ শেষ হবার পর নদী তীরের মৎস্যজীবীরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন, ভেবেছিলেন নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশের দেখা মিলবে। কিন্তু ইলিশের অনুকূল পরিবেশ ও নদীতে পানি বাড়লেও ভরা মৌসুমেও জেলের জালে ধরা পড়ছে না ইলিশ।

জানা গেছে, জ্যৈষ্ঠ মাস থেকেই ইলিশের ভরা মৌসুম। কিন্তু জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় পেরিয়ে শ্রাবণেও নদীতে আশানুরূপ দেখা মিলছে না তার। গভীর সমুদ্রে সকল ধরনের মাছ ধরায় ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা থাকার পর গত শুক্রবার মধ্যরাত থেকে মাছ ধরা শুরু হয়েছে। কিন্তু সাগরেও দেখা মিলছে না ইলিশের। জেলেরা বলছে মাছ যা ধরা পড়ে তা আবার আকারে ছোট (জাটকা), বড় মাছ (ইলিশ) খুবই কম।
 
এদিকে, দিনের বাজারে ভোজন রসিকদের চোখ ইলিশের ডালির দিকে। অন্য বছর এই সময়ে নদীর ঝাঁকা রূপালি ইলিশে ভরা থাকলেও এ বার ঠিক উল্টো। ইলিশের মৌসুমেও ইলিশ ধরতে না পারায় দুর্দিনে পড়েছেন জেলেরা।

একই সঙ্গে হতাশ মাছের আড়তের মালিকরাও। সারা দিনে দুই এক ঝুড়ি মাছ ঘাটে আসলেও তেমন হইচই নেই রাঙ্গাবালীর কোড়ালিয়া মাছ ঘাটে। নেই সেই হাঁকডাক। ফলে উপজেলার ১৩ হাজার ৮৪৭ জন নিবন্ধিত জেলেসহ প্রায় ২০ হাজার জেলে হতাশায় রয়েছেন।
 
কোড়ালিয়া আর পানপট্টি মৎস্যজীবীদের মাছ শিকারের ঠিকানা বলতে আগুনমুখা। এক দিকে যেমন ভাঙনের কারণে আগুনমুখা পাড়ের মানুষ তাকে ‘রাক্ষসী’ বলেও ডাকে, আবার বড় একটা অংশের মানুষের দুই বেলা মুখে ভাত ওঠে এই নদীর বুকে মাছ ধরে। সারা বছরই কিছু না কিছু মাছ মেলে এই নদী থেকে। কিন্তু বর্ষাকালে ইলিশের দৌলতেই পুঁজির জোগানটা হয়।
 
কোড়ালিয়া গ্রামের বাসিন্দা মৎস্যজীবী দেলোয়ার প্যাদা বলেছেন, বছরের অন্য সময় মাছ ধরে কোনও ক্রমে সংসারটা চলে যায়। তখন কিছু টাকা ধার করতে হয়। আর ইলিশের মৌসুমে আয়ের সময়। কারণ ওই সময় ইলিশ ধরে মহাজন ঋণশোধ থেকে ঈদের সময় পরিবারের সদস্যদের মুখে হাসি ফোটাতে পারি। এ বছর সেখানেই ঘাটতি পড়েছে। কী করে সংসার চালাবো বুঝে উঠতে পারছি না। টানা ৬৫ দিনের অবরোশ শেষে সাগরে যামু প্রস্তুতি নিছি কিন্তু হঠাৎ আবহাওয়া খারাপ হওয়ায় সাগর উত্তাল হয়ে উঠেছে।

কিন্তু অনুকূল পরিবেশ থাকা সত্বেও ইলিশের দেখা নেই কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে পাথরঘাটার মৎস্যজীবী ইউসুফ বলেন, সত্যিই আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না। কেউ বলছেন, ছোট ইলিশ ধরার বাধা-নিষেধ না মানার ফলই ভুগতে হচ্ছে। কেউ বলছেন জলবায়ুর প্রভাব। অন্য বছর এই সময় মৎস্যজীবীদের জালে বেশ ভাল ইলিশ ওঠে, কিন্তু এ বছর ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি থাকলেও কেন জালে উঠছে না ইলিশ সেটাই আমরা বুঝে উঠতে পারছি না।

উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের কোড়ালিয়া এলাকার জেলেবাসী হাওলাদার বলেন, ‘এবারতো মাছ তেমন ভালো না, ঝাটকা গুরা (ছোট), আর জাইল্লারা আমাছা (বিভিন্ন প্রজাতি) পায় এইয়া দিয়া কোন রহম চলে। বড় কোন মাছ নাই। গেলো বার এমন টাইমে বড় মাছ আছেলে। সিজনের গড়ে আর দুই মাস সময় আছে এরহম চললে তো জাইল্লা বাঁচবে না।' 

আরেক জেলে জাফর ব্যাপারী বলেন, ‘এবছর তো কোন মাছই দেহি না। অবরোধের পরে এক টিরিপ দিয়া আইছিলাম মাছ পাইছি মাত্র ৩০ থেকে ৪০ কেজি। খরচা ওইছে ৫০ হাজার আর মাছ বেচ্ছি হুদা ২০ হাজার টাহা। এরহম চলতে থাকলে জাইল্লা লসে পইড়া যাবে। আবার টিরিপ দিমু কিন্তু এরমধ্যে আবার আবহাওয়া খারাপ হইয়া গেছে।'

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ, অ্যাকোয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারি অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইলিশ মাছের মৌসুম পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। সে কারণেই এই ভরা মৌসুমেও ইলিশ ধরা পড়ছে না। তার মতে, বিষয়টি চিন্তার হলেও এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। জেলেদের জালে যে একদমই মাছ ধরা পড়ছে না তা কিন্তু নয়। ইলিশ ধরা পড়ছে তবে পরিমাণে কম। একই সঙ্গে ছোট সাইজের।

রাঙ্গাবালী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আনোয়ারুল হক বাবুল বলেন, মূলত চলতি বছরে  খুব বিলম্বে বৃষ্টি হয়েছে যার ফলে ইলিশ মাছের তেমন দেখা মেলে না। বৃষ্টির পানি হইলেই মাছটা জাগে এখান বৃষ্টি হচ্ছে এখন দেখা মিলবে। বৃষ্টি যত বেশি হইবে মাছের তত দেখা মিলবে। তবে ভোলাসহ উপকূলীয় কিছু কিছু জায়গায় মোটামুটি দেখা যাচ্ছে। দেড়িতে হলেও মাছ হবে এমনটা আশা করা যায়।



সাতদিনের সেরা