kalerkantho

শনিবার । ১০ আশ্বিন ১৪২৮। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৭ সফর ১৪৪৩

'ঈদ, ঈদ কী? আমি তো ঈদ ভুলে গেছি'

হিলি (দিনাজপুর) প্রতিনিধি   

২৩ জুলাই, ২০২১ ১২:১১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



'ঈদ, ঈদ কী? আমি তো ঈদ ভুলে গেছি'

ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানেই খুশি। সবাই সবার মাঝে ভাগাভাগি করবে ঈদের আনন্দ আর খুশি। কিন্তু এসব আনন্দ ও খুশির অর্থই বা কী, জানেন না দিনাজপুরের হিলির দক্ষিণ বাসুদেবপুর (মহিলা কলেজপাড়া) গ্রামের মৃত সোহরাফ হোসেনের স্ত্রী জাহানারা বেগম (৪৮)।

২৮ বছর হলো তার স্বামী মারা গেছেন, রেখে গেছেন দুই মেয়ে আর এক ছেলে। অল্প বয়সে স্বামী হারিয়ে দিশাহারা তিনি, বিপাকে পড়েছেন ছোট ছোট তিন সন্তান নিয়ে। বাচ্চাদের মুখে খাবার তুলে দেবেন এমন খাবার ছিল তার ঘরে। আত্মীয়-স্বজনদের অবহেলা আর অবজ্ঞার মাঝে বড় হতে থাকে ছেলে-মেয়েরা। কয়েক বছর পর বড় মেয়েকে মানুষের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে বিয়ে দেন তিনি। বাকি থাকে মেজো মেয়ে আর কোলের ছেলেসন্তান নুরনবী।

মানুষের বাড়ি আর ইটভাটায় রান্নার কাজ করে দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে চলছেন তিনি কোনো রকমে। শেষে যখন আর কোনো কাজ না পান তখন নিরুপায় হয়ে কোলের ছেলে আর মেয়েকে নিয়ে জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমান ঢাকা শহরে। নতুন আজব শহর ঢাকা, কোনো কিছু চেনেন না তিনি। পরে কাজ জোগাড় করে নেন পোশাক কারখানায়। শুরু হয় তার নতুন জীবন, গ্রামের মেয়ে, শহরে গিয়ে অনেকটা ভীতু অবস্থায় থাকেন। এভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, আর বছরের পর বছর পার হতে থাকে। মেজো মেয়ে বিয়ের উপযুক্ত হয়ে ওঠে। দেখে-শুনে বিয়ে দেন মেয়েকে।

বাকি থাকে জীবনের একমাত্র অবলম্বন ছোট ছেলে নুরনবী। বয়স এখন তার ১৭ বছর, দেখতে প্রিন্সের মতো। যত বড় হচ্ছে ততই যেন ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন জাগছে এই জনম দুখিনী জাহানারা বেগমের। তিনি কল্পনা করেন স্বামী হারিয়ে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত আর মানুষের লাথি-গুঁতা খেয়ে এত দূর এসেছি। আজ আমার ছেলে বড় হয়ে যাচ্ছে, আর হয়তো কয়েক বছর পর সে কাজ করতে পারবে। আমার আর কোনো দুঃখ-কষ্ট থাকবে না। নুরনবীর বয়স এখন ১৭ বছর, কাজ করার মতো সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করেছে সে। তাই ট্রাকের হেলপারি করার কাজ শুরু করে সে। কর্মচঞ্চলতার কারণে অল্প দিনে গাড়ির ড্রাইভার হয়ে যায় নুরনবী।

নুরনবী এখন বাস ড্রাইভার, টাকা উপার্জন শুরু করেছে। মায়ের মুখে হাসি আর সুখের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। মায়ের স্বপ্ন দেখার পরিমাণটা আরো বেড়ে যায়। ভাবে ছেলে আমার সুন্দর আর সুদর্শন। ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে দেব। আবার ফিরে যাব স্বামীকে যে মাটিতে ঘুমিয়ে রেখেছি। জানি কোনো দিনও স্বামীকে দেখতে পাবো না। কিন্তু ছেলে আর ছেলের সন্তান হলে তাদের মুখ দেখে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেব। কিন্তু পোড়া কপালে সে আশার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়, হঠাৎ মা জাহানারা বেগম সংবাদ পান ছেলে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। নিমেষেই থমকে যায় জীবনের সব আশা আর একমাত্র ভরসা। থেমে গেল বাকি জীবনের সব চাওয়া-পাওয়া। স্বামী আর সন্তানহারা এবং মেয়ে দুটি থেকেও নেই। দুনিয়াটা আজ তার কাছে অন্ধকার।

জীবন তো তার নিজেস্ব গতিতে চলবে। তাই একমাত্র ভরসা ছেলেকে হারিয়ে, ঢাকা শহর যে তার কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছে। তাই  আবার স্বামীর স্থানে ফিরে আসতে হয় তাকে। একসময় এই হিলিতে স্বামী-সন্তান সবই ছিল তার। আজ কেউ নেই তার, একেবারে নিঃস্ব, একাকিত্ব হয়ে গেছে মানুষটি।

দুঃখের কপালে সুখ সয় না। হিলিতে বর্তমানে তার মাথা গোঁজার কোনো স্থান নেই। আত্মীয়-স্বজনরাও তাকে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা করে না। প্রায় ৮ থেকে ১০ বছর যাবৎ মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করেন। আর যে যা দেয় তাই দিয়ে জীবন চালান তিনি। আবার কারো বাড়ির মেঝেতে বা বারান্দায় রাত কাটিয়ে দেন। স্বামীহারা ২৮ বছর হলেও এখন পর্যন্ত বিধবা ভাতার কার্ড পাননি জাহানারা বেগম এবং সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা থেকেও বঞ্চিত তিনি। 

আপনার ঈদ কেমন কাটল? জানতে চাইলে অশ্রুভেজা চোখে কান্নাবিজিড়ত কণ্ঠে জাহানারা বেগম বলেন, ঈদ, ঈদ কী? আমি তো ঈদ ভুলে গেছি। কাদের নিয়ে ঈদ করব? আমি তো একজন সর্বহারা জনম দুখিনী মা। স্বামী চলে গেছে, একটা স্বপ্ন দেখা ছেলে ছিল, সে-ও তো আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। কাদের নিয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করব? আজ আমার বাড়ি-ঘর নেই। চোখের পানিও শুকিয়ে গেছে, আমি এখন কাঁদতেও ভুলে গেছি। মানুষের বাড়িতে কাজ করি আর যে বাড়ির বারান্দা ফাঁকা থাকে সেই বারান্দায় রাত কাটিয়ে দিই।

হাকিমপুর হিলি পৌর মেয়র জামিল হোসেন চলন্ত  বলেন, জাহানারা বেগম একজন অসহায় মানুষ, তার বিধবা ভাতার কার্ড এবং একটি সরকারি ঘর পাওয়ার জন্য আমি সার্বিক সহযোগিতা করব।

তিনি আরো বলেন, জাহানারা বেগমকে আমি ঈদের আগের দিন প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে খাদ্যসামগ্রী দিয়েছি।

এ বিষয়ে হাকিমপুর (হিলি) উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ নুর-এ আলম বলেন, তিনি এত অসহায় মানুষ, আমার জানা ছিল না। এসব অসহায় মানুষই সব সরকারি সুবিধা পাওয়ার যোগ্য। জাহানারা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তার জন্য বিধবা ভাতার কার্ড এবং একটি সরকারি ঘর দেওয়ার ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।



সাতদিনের সেরা