kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

করোনায় জনস্বার্থে কাজ করছে নোবিপ্রবি, সেবা পাচ্ছে নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরবাসী

নোবিপ্রবি প্রতিনিধি    

১৪ জুলাই, ২০২১ ১৮:৩৬ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



করোনায় জনস্বার্থে কাজ করছে নোবিপ্রবি, সেবা পাচ্ছে নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরবাসী

বাংলাদেশে মহামারি করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরুর দিকে যে কয়টি বিশ্ববিদ্যালয় জনস্বার্থ বিবেচনায় নিজেদের সীমিত সম্পদকে কাজে লাগিয়ে দেশের মানুষের সেবাদানের জন্য করোনা পরীক্ষার ল্যাব চালু করেছিল তার মধ্যে অন্যতম নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি)। উপাচার্য অধ্যাপক ড. দিদারুল আলমের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়টির করোনা শনাক্তকরণ ল্যাবে দায়িত্ব পালন করে চলছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। আর এই ল্যাব হতে নিয়মিত সেবা পাচ্ছেন নোয়াখালী ও পার্শ্ববর্তী লক্ষ্মীপুর জেলার দশটি উপজেলার মানুষ।


যেভাবে যাত্রা শুরু ল্যাবের

বাংলাদেশে প্রথম করোনা মহামারি শুরু হয় গত বছরের মার্চ মাসে। সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়া নিয়ে তখন চরম অস্বস্তিতে পড়েছিল। এরপর সারা দেশে লকডাউন দেওয়া হয়। ঠিক সেই সময়টাতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশে জেলা সিভিল সার্জনের তত্ত্বাবধানে বৃহত্তর নোয়াখালী জেলার করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি মোকাবেলায় টেস্টিং সুবিধা চালু করার প্রস্তুতি হিসেবে নোয়াখালীস্থ আব্দুল মালেক উকিল মেডিক্যাল কলেজের পক্ষ থেকে সিভিল সার্জন এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি ও মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের আরটিপিসিআর মেশিন ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি দেয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়। বলছিলেন ল্যাবের ফোকাল পয়েন্ট ড. ফিরোজ আহমেদ।

যাত্রা শুরুর প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, মাননীয় উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ মহোদয় এবং প্রক্টর আমাকে করোনা টেস্ট করার সক্ষমতা আছে কি-না তা জানতে চান। এরমধ্যেই আমাদের বিভাগের শিক্ষার্থী মো. আমিনুল ইসলাম কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজে আরটিপিসিআর টেস্টিং সহায়তা করতে চলে গেছেন। আমি আমার বিভাগের শিক্ষক, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট মো. শরিফুল ইসলাম ও আমিনুলের সাথে কথা বলে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে করোনা পরীক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব বলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেই। পরবর্তীতে মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. দিদারুল আলম ও অধ্যাপক ড. নেওয়াজ মো. বাহাদুরের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয় থেকে অনুমতিপত্র বের করা হয়।নোয়াখালীতে একটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ থাকায় নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে করোনা টেস্টিং করার অনুমতি প্রদান ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জাতীয় ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অনীহা সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। যে কারণে আমাদের ল্যাবরেটরিতে একটু দেরিতে অর্থাৎ ২০২০ সালের মাঝামাঝি থেকে করোনা পরীক্ষা শুরু হয়।

৪০ হাজারের অধিক নমুনা পরীক্ষা

বিশ্ববিদ্যালয়টির অণুজীববিজ্ঞান বিভাগে স্থাপিত করোনা টেস্টিং ল্যাবে গত বছর করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে এ পর্যন্ত মোট ৪০ হাজারেরও অধিক নমুনা পরীক্ষার করা হয়েছে। গেল বছর ল্যাবে তৈরিকৃত ২০০০ বোতল হ্যান্ড স্যানিটাইজার বিতরণ করা হয় নোয়াখালীর জনসাধারণের মধ্যে। এ ছাড়াও উপকূলে করোনাভাইরাস সচেতনতায় অনবদ্য ভূমিকা পালন করছে ল্যাবটি।

নমুনা পরীক্ষার পাশাপাশি চলছে গবেষণা কার্যক্রম

বাংলাদেশের বর্জ্য পানিতে করোনার উপস্থিতি সর্বপ্রথম আবিষ্কার করে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। যা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে এর আগে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল একত্রে দেশের সাতটি বিভাগের ষোলটি জেলায় এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে করোনার বিস্তৃতি, ধরণ ও বর্জ্য পানিতে করোনার পরিমান নির্ণয় করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় করোনা আক্রান্তের সংখ্যা নির্ধারণ বিষয়ক গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সাম্প্রতি করোনাভাইরাস সংক্রমনের ফলে মানব শরীরে নানাবিধ প্রভাব নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি ও ফার্মেসি বিভাগ এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সমন্বয়ে একটি গবেষণা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ল্যাব হতে প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণাপত্র। অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকরা করোনা রোগীদের থেকে প্রাপ্ত নমুনা বিশ্লেষণপূর্বক রোগতত্ত্ব ও রোগ প্রতিরোধ সম্পর্কিত বেশকিছু গবেষণা কার্যক্রম শুরু করেছে।

নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ল্যাবটি

ল্যাব প্রতিষ্ঠায় ছিল নানামুখী চ্যালেঞ্জ। ল্যাবের ফোকাল পয়েন্ট ড. ফিরোজ আহমেদ বলেন, করোনা টেস্টিং ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠায় আমাদের অনেকগুলো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে। সরকারের অনুমতি পেতে বড় ধরনের বাঁধা সামলাতে হয়েছে। তারপর মাত্র সাতদিনের মধ্যে সকল প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও মেশিনের ব্যবস্থা করা ও টেস্টিং উপযোগী নেগেটিভ ও পজিটিভ প্রেসার সুবিধাদিসহ ল্যাবরেটরি প্রস্তুত করা বিশাল চ্যালেঞ্জ ছিল। মাননীয় উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ মহোদয় ও প্রক্টরের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে এবং স্থানীয় মাননীয় সংসদ সদস্যদের আর্থিক সহায়তায় করোনা টেস্টিং চালু করা সম্ভব হয়। এতকিছুর পর আমি ঢাকাস্থ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে টেস্টিং কিট ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জামাদি আনার জন্য নিজে গিয়েছিলাম। সেখানে অতিরিক্ত মহাপরিচালক অফিসে আমাকে জানানো হল যে, মেডিক্যাল কলেজ ছাড়া অন্যদের টেস্টিং করার ব্যাপারে নানা ধরনের পক্ষ থেকে আপত্তি আছে। আমি তাদেরকে জনস্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থায়নে ল্যাবরেটরি প্রস্তুতকরণ, যন্ত্রাংশের ব্যবস্থা করাসহ সামগ্রিক বিষয়টি বুঝিয়ে বলার পর কেবলমাত্র টেস্টিং কিট পেয়েছিলাম। আনুষঙ্গিক অন্যান্য সামগ্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থায়নে কেনা হলো। পরবর্তীতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে করোনা টেস্টিং কিট ও আনুষাঙ্গিক সরঞ্জামাদির ব্যবস্থা করা হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ল্যাবরেটরি পরিচালনার সকল ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে তিনবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন করোনা টেস্টিং ল্যাবরেটরির বাজেট চেয়ে পত্র প্রদান করেছে এবং আমরা যথাযথ ভাবে তা প্রেরণ করেছি। যতদূর জানি, এখনও পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের পক্ষ থেকে আর্থিক বরাদ্দ আসেনি। কথাটা এই কারণে বলছি যে, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের করোনা টেস্টিং ল্যাবরেটরি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও দেশমাতৃকাকে রক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিনা পারিশ্রমিকে নিজের জীবনকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রেখে স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করার অনন্য নজির স্থাপন করেছে।

ল্যাব পরিচালনায় অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ

বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ পরিবারের শতভাগ সমর্থন ছাড়া করোনা টেস্টিং ল্যাবরেটরি প্রস্তুত করা সম্ভব হতো না বলে জানান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. ফিরোজ আহমেদ। তিনি বলেন, আমাদের বিভাগের শিক্ষার্থীদের সেমিনার লাইব্রেরীতে করোনা টেস্টিং ল্যাবরেটরি করা হয়েছে। করোনাভাইরাসটি অতি সংক্রমণশীল হওয়ার বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংক্রমণের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বিভাগীয় অ্যাকাডেমিক কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে ল্যাবরেটরি প্রস্তুত করার কার্যক্রমে সমর্থন দেয়াসহ সার্বক্ষণিক তদারকিতে নিয়োজিত রয়েছে।

ল্যাবটির প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লায়েড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নেওয়াজ মোহাম্মদ বাহাদুর। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, গত বছর করোনার চরম সঙ্কটময় মুহূর্তে মাননীয় উপাচার্য মহোদয়ের নির্দেশক্রমে স্থানীয় সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী এমপি, মামুনুর রশিদ কিরণ এমপিসহ আরো অন্যান্যদের সহযোগিতায় আমরা ল্যাবটি প্রতিষ্ঠা করি। বৃহত্তর নোয়াখালীবাসী আমাদের থেকে অনেককিছু প্রত্যাশা করে। আমরা তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছি। ক্রাইসিস মোমেন্টে আমাদের ল্যাব চালু হয়। সবাই তখন আতঙ্কে ছিল। মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. ফিরোজ আহমেদ এবং তার সাথে কিছু ছাত্র যোগ দিয়ে এসবকে বাঁধা হিসেবে না নিয়ে ল্যাবকে এগিয়ে নিয়ে যায়। সর্বোপরি উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ স্যারসহ সবার প্রচেষ্টায় আমরা ল্যাবটি চালু রাখতে পেরেছি। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় অর্জন বলে আমি মনে করি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. দিদার-উল-আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয় এবং সবচেয়ে বড় সাফল্য যে করোনা মহামারীতে আমরা দেশের জন্য কাজ করতে পারছি৷ আমরা ভাবতেও পারিনি করোনা ল্যাব কন্টিনিউ করতে পারব। সরকারি কোনো ফান্ড পাইনি। তবুও আমরা চলমান রেখেছি, কোনোদিন বন্ধ রাখিনি৷ এমনকি ঈদের দিনেও চালু ছিল। ড. বাহাদুর, ড. ফিরোজ যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছে। আর সবচেয়ে বড় ক্রেডিট আমাদের ছাত্রদের যারা ল্যাবে রাতদিন কাজ করেছে, ঈদের মধ্যেও তারা কাজ করেছে। অনেককিছু স্যাক্রিফাইস করেছে৷ এগুলো আমরা ভুলতে পারব না। এদেরকে আমরা কিছু দিতে পারিনি। কোনোরকমে খেয়ে না খেয়ে হলে থেকে কাজ করেছে৷ এভাবেই আমরা কন্টিনিউ করেছি। এখন তো নোয়াখালীর অবস্থা খুবই খারাপ, আমাদের ল্যাবে শনাক্তের হার বাড়ছে। দেশের অবস্থাও ভালো না। যত সমস্যাই আসুক আমরা আমাদের ল্যাব চালিয়ে যাবো। আর ছাত্রদের বলব পরিবার নিয়ে তোমরা নিরাপদে থাকো।



সাতদিনের সেরা