kalerkantho

রবিবার । ১৭ শ্রাবণ ১৪২৮। ১ আগস্ট ২০২১। ২১ জিলহজ ১৪৪২

জব্বার আলীর মুখে হাসি

দিনাজপুরে আরো এক হাজার মানুষ পেল খাদ্য সহায়তা

এমদাদুল হক মিলন, রাসেল ইসলাম ও নাজমুল হুদা, দিনাজপুর   

১১ জুলাই, ২০২১ ০৩:৩৪ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



জব্বার আলীর মুখে হাসি

কালের কণ্ঠ শুভসংঘের উদ্যোগে দিনাজপুরে গতকাল দুস্থদের হাতে খাদ্য সহায়তা তুলে দেন জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি।

দেহঘড়িতে হরেক রোগের বসতি। দিন যত যাচ্ছে শরীর ভাঙছে জব্বার আলীর। স্ত্রীর ওপর ভর করে তাঁর হাঁটাচলা। ঘরে নুন থাকে তো পান্তা ফুরায়, তাই শহরে গিয়ে ভালো ডাক্তারের খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজনটাও তাঁর কাছে অর্থহীন। সংসারে নেমেছে আঁধার। দিগভ্রান্ত জব্বার ১৬ পেরোনো কিশোর ছেলে মাহাবুবকেই ভেবেছেন ‘অন্ধের যষ্টি’। লেখাপড়া শিকেয় তুলে ছেলেকেই নামিয়েছেন চাষবাসের মাঠে। করোনার এই অস্থির সময়ে কামলা খেটে যা আয়, তা দিয়ে কোনো রকম তিনজনের মুখে উঠছে অন্ন। এরই মধ্যে জব্বার আলীর কানে আটকে গেল জব্বর খবরটা! বসুন্ধরা গ্রুপের উদ্যোগে কালের কণ্ঠ শুভসংঘ খাদ্য সহায়তা দেবে দিনাজপুরের বোচাগঞ্জের সেতাবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। গতকাল শনিবার সাতসকালেই হাজির জব্বার। একসময় খাদ্য সহায়তার বস্তাটি পেলেন হাতে। দাঁড়ানোর জোর না থাকলেও নিমিষেই শরীর যেন পেল প্রাণশক্তি। বলে উঠলেন, ‘একটা ছেলের কামাই দিয়া কি আর সংসার চলে, তাই যা হয় তাই খেয়ে চলি। কেউ কোনো সাহায্য করে না। আপনারা আমাদের সহযোগিতা করলেন, আপনাদের জন্য দোয়া করি। আল্লায় আপনাদের ভালো করুক। বসুন্ধরা গ্রুপের এই ত্রাণে ১০ দিন চলব।’

ওই মাঠে খোঁজ মিলল আরেক দুঃখিনী রাবেয়া বেগমের। ত্রাণ পেয়ে তিনি বলেন, ‘বাবা আমি বয়স্ক মানুষ, সাহায্য তুলে খাই। এখনো বয়স্ক ভাতার কার্ডও হয় নাই। তোমরা চাল-ডাল দিলা, তা দিয়ে কয় দিন খাইতে পারমু। আল্লায় বসুন্ধরা গ্রুপকে আরো দেক। তোমরা ভালো থাকো বাবা।’

এদিকে দিনাজপুর সরকারি কলেজ মাঠে ত্রাণ নিতে এসেছিলেন বেলী বেগম। নাম বেলী হলেও জীবনযাত্রায় নেই ফুলের সুবাস! মোটরসাইকেল মেরামতের কাজ করতেন স্বামী, ছেলে করতেন জুতার দোকানে কাজ। করোনার ছোবলে দুজনই এখন কর্মহারা। দিন যাচ্ছে কষ্টে কষ্টে। ত্রাণ পেয়ে বেলী বেগম বললেন, ‘ত্রাণ দিয়ে আপনারা আমাদের সহযোগিতা করলেন। দোয়া করি বসুন্ধরা গ্রুপ বেঁচে থাকুক হাজার বছর।’

ত্রাণ নিতে এসে দিনাজপুরের একমাত্র নারী হকার বিধবা মরিয়ম বেগম বললেন, ‘আমি ফেরি করে পত্রিকা বিক্রি করি। করোনায় অফিস-আদালত, দোকান সব কিছু বন্ধ। তাই পত্রিকা বিক্রিও কমে গেছে। এই প্রথম বসুন্ধরা গ্রুপের কালের কণ্ঠ পত্রিকার শুভসংঘের ত্রাণ পেলাম। আমি দোয়া করি বসুন্ধরার মালিক অনেক দিন বেঁচে থাকেন, যাতে অসহায় মানুষকে সহযোগিতা করতে পারেন।’

জব্বার, রাবেয়া, বেলী, মরিয়ম শুধু নন, গতকাল বিকেলে দিনাজপুর সরকারি কলেজ মাঠে, সকাল সাড়ে ৯টায় বোচাগঞ্জের সেতাবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এবং সকাল ১১টায় বিরল উপজেলার ৬ নম্বর ভাণ্ডারা ইউনিয়নে এক হাজার হতদরিদ্র ও করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছেন কালের কণ্ঠ শুভসংঘের সদস্যরা।

কুঁজো হয়ে পথ চলেন কালাচাঁদ রায়। বয়স ১০০ ছুঁইয়েছে। দুই ছেলে থাকলেও তাঁদের দেখভাল করেন না কেউ। বৃদ্ধা স্ত্রীর সঙ্গে কাটছে জীবনের শেষবেলা। লাঠিতে ভর দিয়ে এসেছিলেন বিরল উপজেলা আয়োজনে। ত্রাণ হাতে পেয়ে তিনি বলেন, ‘বুড়া হইয়া গেছি বাবা, ১০ টাকাও বয়স্ক ভাতা পাই না। কেউ সাহায্যও দেয় না। বয়স্ক ভাতার জন্য চেয়ারম্যানের অফিসে যাইতে দেয় না। খালি কয় ভাইরাস আছে। তোমরা হামারে সাহায্য দিলা, এলা হলুদ-মরিচ দিয়া কয় দিন খাবার পারিম।’

সেখানেই বুদু রায় নামের এক বৃদ্ধা বলেন, ‘হামার স্বামী নাই, কোনো বেটাও নাই। আমি একলা মানুষ, তোমার এলা ত্রাণ দিয়া ১৫ দিন খাইবা পারিম। তোমারলার জন্য আশীর্বাদ করিমু।’

এদিকে দিনাজপুরের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোতে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও দিনাজপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ইকবালুর রহিম। গতকাল শনিবার দিনাজপুর সরকারি কলেজ মাঠে ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে এসে  তিনি বলেন, ‘দিনাজপুরের অসহায় মানুষের মধ্যে সরকারের পাশাপাশি বসুন্ধরা গ্রুপ খাদ্য সহায়তা দিয়েছে। আমি বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের মঙ্গল কামনা করি।’ তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সরকারের পাশাপাশি বিত্তশালীদের এগিয়ে আসার জন্য। তাঁরা যদি এগিয়ে আসেন তাহলে আমরা অনেক মানুষকে ক্ষুধার যন্ত্রণা থেকে রক্ষা করতে পারব।’ ইকবালুর রহিম বলেন, ‘এই মহতী উদ্যোগ নেওয়ায় আমি কালের কণ্ঠ সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলনকেও ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। আমি আশা করব, বসুন্ধরা গ্রুপের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য শিল্পগোষ্ঠীও সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াবে।’

দিনাজপুর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপ কালের কণ্ঠ শুভসংঘের মাধ্যমে গরিব, অসহায়, ক্ষুধার্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ হিসেবে খাদ্যসামগ্রী তুলে দিচ্ছে, আল্লাহ অবশ্যই এর উত্তম প্রতিদান দেবেন।’

দিনাজপুরে ত্রাণ বিতরণে আরো উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মর্তুজা আল মুঈদ, দিনাজপুর সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. আব্দুস সালাম আজাদ, শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক দাইমুল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন, কালের কণ্ঠ শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান, কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শামীম আল মামুন, সদস্য শরীফ মাহ্দী আশরাফ জীবন, শুভসংঘের দিনাজপুর জেলা শাখার সহসভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন, সুনিল শর্মা, শরিফুল ইসলাম, রাশেদুল ইসলাম, হুমায়ুন পারভেজ, সাহাদুর দেব শর্মা প্রমুখ।

এদিকে বোচাগঞ্জে কালের কণ্ঠ শুভসংঘের ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ছন্দা পাল বলেন, ‘করোনায় সাধারণ মানুষের রোজগার কমে গেছে। এ সময় ত্রাণ পাওয়া আপনাদের অধিকার। আজকে বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় কালের কণ্ঠ শুভসংঘ আপনাদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করেছে। তাই তাদের অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই এবং বসুন্ধরা গ্রুপের সাফল্য কামনা করি।’

বোচাগঞ্জে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন সেতাবগঞ্জ পৌর মেয়র মো. আসলাম, সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিকাশ চন্দ্র বর্মণ, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আফসার আলী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের মো. মামুন, উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বিপুল, সেতাবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আমিনুল ইসলাম, কালের কণ্ঠ শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান, কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শামীম আল মামুন, শরীফ মাহ্দী আশরাফ জীবন, শরিফুল ইসলাম, মো. মাহাবুব আলম, মো. শাহ নেওয়াজ সৌরভ, রাকিবুল ইসলাম রাজু, ইবাদিল্লাহ, আকিব, মাহাফুজ, হুমায়ুন পারভেজ, হরিদাশ রায় প্রমুখ।

এদিকে ত্রাণ বিতরণে অংশ নিয়ে বিরল উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান ফিরোজা বেগম সোনা বলেন, ‘আমার উপজেলায় কত দূর থেকে ত্রাণ সহায়তা নিয়ে এসেছে কালের কণ্ঠ শুভসংঘ। তারা এই অঞ্চলের অসহায় মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে। তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। তাদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।’

বিরল উপজেলায় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন ৬ নম্বর ভাণ্ডারা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মামুনুর রশীদ মামুন, উপজেলা যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক মাহেশ চন্দ্র রায়, কালের কণ্ঠ শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান, কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শামীম আল মামুন, সদস্য শরীফ মাহ্দী আশরাফ জীবন, শরিফুল ইসলাম, সুনিল শর্মা, হুমায়ুন পারভেজ, সাহাদুর দেব শর্মা, রাসেদ ইসলাম, মো. একরামুল হোসেন, রুবেল হোসেন, আশরাফুল, কারীমুল ইসলাম, আসাদুজ্জামান, আল-আমিন, রেজাউল, গোলাম রব্বানি, কাইয়ুম, সাদেকুল, সেলিম, মাজেদুল, রেজাউল প্রমুখ।



সাতদিনের সেরা