kalerkantho

শনিবার । ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩১ জুলাই ২০২১। ২০ জিলহজ ১৪৪২

ভাঙা ঘরে দৈনিক হাজিরা

রফিকুল ইসলাম, শ্রীপুর (মেহেন্দিগঞ্জ) থেকে ফিরে   

১০ জুলাই, ২০২১ ০১:১৫ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ভাঙা ঘরে দৈনিক হাজিরা

মে‌ঠোপ‌থের পা‌শে ইট সি‌মে‌ন্টের‌ তৈরি সা‌রি সা‌রি আধা পাকা টিনশেড ঘর। গাঢ় আকাশি র‌ঙের টিন ঘরগুলো‌র সৌন্দর্য বহুগু‌ণে বা‌ড়ি‌য়ে তু‌লে‌ছে। মুজিববর্ষ উপলক্ষে গৃহহীন‌দের জন্য এই ঘরগুলো প্রধানমন্ত্রীর উপহার। কিন্তু হস্তান্ত‌রের পরপরই দু‌টি ঘরের একটা বড় অংশ ধসে পড়েছে। টিন আর দেয়া‌লের স‌ঙ্গে ঝু‌লে থাকা লোহার দরজা এখ‌নো জানান দি‌চ্ছে ঘরের উপস্থিতি। সারিতে অপর ঘরগুলোর নিচের বালু ক্ষয়ে গিয়ে দেওয়াল আর বারান্দার পিলার ধসে পড়েছে। এমন ভাঙা ঘরগুলোতে প্রতিদিন হাজিরা দিতে হচ্ছে দুঃস্থদেরকে।

ব‌রিশা‌লের মেঘনা তী‌রের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা শ্রীপুর ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ঘরের এমন অবস্থায় দুঃস্থদেরকে বিপা‌কে ফে‌লে‌ছে। শুধু বাহেরচর গ্রামে আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীনে ৪০টি পাকা টিনসেড ঘর নির্মাণ করা হয়। কয়েকটি গৃহহীন পরিবারের মাঝে ঘরগুলো হস্তান্তরও করা হয়েছে। কিন্তু সেখানে এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎ কিংবা পানির কোনো ব্যবস্থা করা হয়‌নি। নেই ঘ‌রে যাতায়াতের কোনো রাস্তা। হাটু পা‌নি মা‌রি‌য়ে যে‌তে হয় সেই ঘ‌রে। বরাদ্দ বু‌ঝে পে‌লেও অধিকাংশ পরিবারই ‌সেখা‌নে বসবাস শুরু ক‌রেননি।

প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারির পর বরাদ্দ পাওয়া ঘরের মালিকদের জোর করে সেই ঘরে আসতে বাধ্য করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার থেকে দুঃস্থরা দিনে ঘরে আসছেন। ঘরের সংস্কারের হাত লাগাচ্ছেন। দুপুরে তাদের ছাপড়া ঘরে গিয়ে রান্না করছেন। আবার বিকেলে নতুন ঘরে ফিরছেন। কারণ সেই ঘরে নেই কোনো রান্নার ব্যবস্থা। আরো নেই আলো। নেই এর তালিকায় আছে খাবারের বিশুদ্ধ পানি। তবে দেয়াল ধসের ভয়ে তারা থাকছেন না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নারী কালের কণ্ঠের কাছে স্বীকার করেছেন, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান তাদেরকে ঘরে প্রতিদিন আসতে বাধ্য করছেন। যাতে প্রশাসন কিংবা সংবাদকর্মীরা সরেজমিনে গিয়ে তাদেরকে দেখতে পান। 

যে কারণে ধসে পড়ল ঘর
জনসাধারণের চলাচলের পথ। শহরে যার পরিচিতি সড়ক। আর কেতাবি ভাষায় বলে হালট। দুই পাশের মাটি তুলে তৈরি করা হয় মেঠো পথ। সেই পথের ঢাল বালু দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। সেখানেই মুজিব বর্ষের ঘর উঠেছে। ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে অতিরিক্ত পানির চাপে বালু ক্ষয় শুরু হয়েছিল। পরবর্তিতে একাধিক উঁচু জোয়ারে বালু ক্ষয়ে ঘরের ভেতরটা নালায় পরিণত হয়েছিল। এভাবেই দুটি ঘর প্রায় ধসে পড়েছিল নালার পানিতে। একই সঙ্গে আরো ১১টি ঘরের দেয়ালের অংশ বিশেষ, বারান্দার পিলার ধসে পড়েছিল। ফলে সেখানে থাকা তিনটি পরিবার বৃষ্টির পানিতে ভিজছিল।

বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নালায় ধসে পড়া ঘরের ইট তুলছেন শ্রমিকরা। হাতে হাতে করে ইট তুলে রাখছেন অর্ধেকের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের ভেতরে। শ্রমিকদের কেউ কেউ দেয়াল ধসে নালায় পড়ে থাকা লোহার দরজা তোলার চেষ্টা করছেন। একদল নির্মাণ শ্রমিক ধসে পড়া দেয়াল ও পিলার নতুন করে সংস্কারে ব্যস্ত রয়েছেন। কাঠ মিস্ত্রিরা ঘরের গাঢ় আকাশি রঙের টিন খুলে মেঠো পথে সারি সারি ভাবে সাজিয়ে রাখছেন। যাদের ঘর ভেঙেছে, তারা শ্রমিকদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছেন। কখনো ইট তুলতে, আবার কখনো রাজমিস্ত্রিদের হাতে ইট তুলে দিয়ে।

শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করছিলেন আসমা বেগম। তিনি বলেন, নদীর তীরে ঝুপড়ি ঘর ছিল। নতুন এই ঘরে মাস খানেক হলো উঠেছেন। তখন নদীর তীরের সেই ঘরটি ভেঙে নিয়ে এসেছেন। কয়েকদিন আগে নিচের বালু সরে গিয়ে ঘরের একাংশ ধসে প‌ড়েছে। তাই ঘরে থাকা যাচ্ছে না। প্রতিবেশীদের ঘরে মালামাল রেখেছি। দিন শেষে সেখানেই থাকতে হচ্ছে।

পাশেই বাহেরচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের কাজ চলছে। তার পাশেই আরো ১৪টি ঘর রয়েছে। তার অধিকাংশটাই দেওয়াল এবং বারান্দার পিলার ধসে পড়েছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা কোমড় সমান পানিতে তলিয়ে থাকায় সেখানে যাওয়ার সম্ভব হয়নি। তার একটি পরেই খালের ওপারে মুজিব বর্ষের আরো সাতটি ঘর। কিন্তু খালের ওপর সেতু থাকলেও তার সংযোগ সড়ক নেই। গলা সমান পানি ভেঙে সেখানে যাতায়েত সম্ভব হয়নি। এদিকে সেতুর পাশেই মামুনের চৌচালা ঘর। ঘরে সামনে ব্যক্তিগত জমিতে মুজিববর্ষের একটা ঘর উঠেছে।  
   
যে কারণে বরাদ্দের পরেও ঘর ফাঁকা
রাকিব খান। বরিশাল পলিটেকনিক ইন্সস্টিটিউট থেকে সদ্য পাশ করেছেন। বেকার তাই খুঁজছেন চাকরি। থাকছেন বরিশাল নগরীতে তার বোনের বাসায়। তার বাবা আব্দুস ছালাম খান। তিনি শ্রীপুরের মহিষা ওহেদীয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে কর্মরত। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান হারুন আর রশীদের দূরসম্পর্কের নাতি রাকিব। এই আত্মীয়তার সুবাধে তিনি অবিবাহিত হয়েও সরকারি ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন। তিনি বারদ্দকৃত ঘর বুঝে নিলেও সেই ঘরে উঠেননি। তার বাবা-মা থাকেন ভাড়া বাড়িতে। ওই বরাদ্দকৃত ঘরটি তালাবন্ধ আছে। নিচের বালু ক্ষয়ে পিলার এবং দেওয়াল ধসে পড়েছে।

নুরুজ্জামান হাওলাদার। মেঘনা তীরের শ্রীপুর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি তিনি। আছে চরখেনুয়া গ্রামে টিনের চৌচালা ঘর। তবুও তিনি দুঃস্থদের জন্য বরাদ্দ করা সরকারি ঘর পেয়েছেন। কিন্তু কিভাবে এটা সম্ভব হলো। তা খুঁজতে গিয়ে বেড়িয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য। তার ভাই মিজানুর রহমান হাওলাদার। শ্রীপুর ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদে আছেন। তারও বাড়ি আছে। আছে অনেক জমি। কিন্তু ‘জমি আছে ঘর নাই’ সরকারি প্রকল্পের আওতায় তিনিও ঘর পেয়েছেন। রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হলেও শুধু ভাইয়ের প্রভাবে নুরুজ্জামান ঘর পেয়েছেন। তিনিও ঘরে উঠেননি।

শুধু রাকিব কিংবা নুরুজ্জামান নন, তাদের মতো বিত্তশালীরা দুঃস্থদের জন্য বরাদ্দ করা ঘর পেয়েছেন। স্থানীয়রা বলছেন, প্রায় মাস ছয়েক আগে অন্তত চার লাখ টাকা খরচ করে মাসুদ আর ওহীদ দুই ভাই জমি কিনে দোতলা টিনের ঘর করেছেন। সেই ঘরের পেছনে ব্যক্তিগত জমিতে মাসুদের নামে দুঃস্থদের জন্য বরাদ্দ করা ঘর তুলে দেওয়া হয়েছে। সরকারি ঘরটি রান্না ঘর হিসেবে তারা ব্যবহার করার উদ্যোগ নিয়েছেন। ইসমাইল হোসেন ওরফে ইসমাইল ফিটার ঘর পেয়েছেন। যদিও তার বরিশাল সদর উপজেলার সাহেবের হাটে ভবন রয়েছে।

শ্রীপুর ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আব্বাস জোমাদ্দার। তার ভাই মাইদুল জোমাদ্দার। তারা থাকে বাবার চৌচালা টিনের ঘরে। তার পরেও মাইদুল ভাইয়ের প্রভাবে ঘর পেয়েছেন। সরকারি আবাসনের ঠিক বিপরীতেই আশিক শিকদারের চৌচালা টিনের ঘর। পৌত্রিক সূত্রে তার আছে কাড়ি কাড়ি কৃষি জমি। সেই আশিক সরকারি ঘর পেয়েছেন। বাহেরচরের নাসির কাজীর রয়েছে চৌচালা টিনের ঘর। তিনিও পেয়েছেন প্রধনমন্ত্রীর উপহার। তারা কেউই থাকছেন না প্রধানমন্ত্রীর ঘরে।
 
বিত্তশালীরা যা বলছেন
সরকারি বিধি অনুযায়ী দুঃস্থ দম্পতিরাই ঘর পাবেন। তবে বিধবা কিংবা প্রতিবন্ধীরাও এককভাবে ঘর পেতে পারেন। কিন্তু রাকিব সদ্য বেকার। কিভাবে সরকারি ঘর পেলেন। এমন প্রশ্নের জবাবে রাকিব খান কালের কণ্ঠকে মুঠোফোনে বলেন, মেঘনা তাদের আশ্রয়টুকু কেড়ে নিয়েছে। তাদের মাথা গোঁজার ঠাই নেই। বাবার চাকরির সুবাধে মাকে নিয়ে ভাড়াবাসায় থাকেন। মা লাইজু বেগম এবং রাকিব এর যৌথ নামে সরকারি জমি হস্তান্তর হয়েছে। কিন্তু কিভাবে এটা হলো, তার কোনো জবাব রাকিব দিতে পারেননি।

ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান হাওলাদার কালের কণ্ঠকে বলেন, তার ভাই নুরুজ্জামান ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি ছিলেন। এখন রাজনীতির সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত নন। কাজে সুবাধে ঢাকায় থাকছেন। তার স্ত্রীর নামে সরকারি ঘর বরাদ্দ হয়েছে। সেখানে এখনো তিনি উঠেননি। আমাদের সঙ্গেই তার স্ত্রী থাকছেন। প্রভাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নুরুজ্জামান আর্থিকভাবে ততটা স্বচ্ছল নন, তাই তার স্ত্রীর নামে ঘরের বরাদ্দ এনে দিয়েছি।

ঠিকাদারের প্রতিনিধি মিজানুর রহমান বলেন, ইয়াসের প্রভাবে বালু সরে গিয়ে দুটি ঘরের বিশাল ধসে পড়েছে। আরো কয়েকটি ঘরের দেওয়াল ও পিলারের অংশ বিশেষ ধসে পড়েছে। সেগুলো বুধবার থেকে সংস্কার করা হচ্ছে। ঘর হস্তান্তরের এতেদিন পরে কেন সংস্কার? এমন প্রশ্নে জবাবে বলেন, করোনার কারণে করা সম্ভব হয়নি। বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর আমরা ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংস্কার করে দিচ্ছি।

ইউপি চেয়ারম্যান হারুন আর রশীদ বলেন, মুজিববর্ষর ঘর বরাদ্দে অনিয়ম হয়নি। তবে এতটি ঘরের দুটি একটিতে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটতে পারেই। তিনি বলেন, ইয়াসের কারণে বালু ক্ষয়ে গিয়ে কয়েকটি ঘরের ক্ষতি হয়েছে। সেগুলো ঠিকাদার সংস্কার করে দিচ্ছে। ঘরে প্রতিদিন দুঃস্থদের আসতে বাধ্য করা হচ্ছে, এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, যারা ঘর পেয়েছেন, তারা কেন অন্যত্র থাকবেন। সংস্কারের সময় কেন? তাদের থাকা বাধ্যতামূলক করছেন, এ প্রসঙ্গে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কঠোর হুঁশিয়ারির পর আমরা কাজটি করতে বাধ্য হচ্ছি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহাদত হোসেন বলেন, দুই মাস হল দায়িত্ব নিয়েছি। তাই স্থান নির্বাচন, ঘর নির্মাণ কিংবা বরাদ্দের প্রসঙ্গে তেমন কিছু বলতে পারব না। তবে ফাইল ঘেটে যেটা দেখেছি, তাতে বোঝা যাচ্ছে ইয়াসের প্রভাবে ঘরগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন পাঠায়েছিল, বরাদ্দ পেতে দেরি হওয়ায় বুধবার থেকে সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে।



সাতদিনের সেরা