kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১।৮ সফর ১৪৪৩

নিম্নমানের বিটুমিন ছাড়ে কড়াকড়ি

► ৮০০ টন বিটুমিন ৪০ দিন বন্দরে ফেলে রেখেছে ইলিয়াছ ব্রাদার্স
► মান সনদ জালিয়াতি করে চালান ছাড় করে নেওয়ার চেষ্টা নস্যাৎ

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

৭ জুলাই, ২০২১ ০২:৫৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নিম্নমানের বিটুমিন ছাড়ে কড়াকড়ি

জাহাজ থেকে নিম্নমানের বিটুমিন চট্টগ্রাম বন্দরে নামানোর পর ছাড় করাতে পারছে না আমদানিকারক মেসার্স ইলিয়াছ ব্রাদার্স (এমইবি)। প্রতিষ্ঠানটির পরিকল্পনা ছিল, মান সনদ জালিয়াতি করে ‘ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্সের মতো চালানটি ছাড় করিয়ে নেওয়ার। কিন্তু নিম্নমানের বিটুমিনের চালানটি চট্টগ্রাম কাস্টমসের হাতে ধরা পড়ার পর এমইবি সেই সুযোগ হারায়। এ অবস্থায় আমদানি করা নিম্নমানের বিটুমিন জাহাজ থেকে বন্দরে নামানোর পর ছাড় না করিয়ে ৪০ দিন ইয়ার্ডে ফেলে রেখেছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এমইবি। প্রতিষ্ঠানটি এখন নতুন কৌশলে এই বিটুমিন ছাড় করিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা আঁটছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ইস্টার্ণ রিফাইনারির মান সনদ জালিয়াতি করে ‘ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স’ নামের আমদানিকারক কাস্টমসের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিম্নমানের বিটুমিন বন্দর থেকে ছাড় করে নিয়েছিল। পরে কাস্টমস যাচাই করে দেখতে পায়, চালানটির জমা দেওয়া মান সনদ সম্পূর্ণ জাল। এর পরই চালানটি আটক করে কাস্টমস। একই সঙ্গে ছাড় করে নেওয়া বিটুমিনও বন্দরে ফেরত নিয়ে আসা হয়। কাস্টমসের বাড়তি সতর্কতা এবং কড়াকড়ি আরোপের পর জালিয়াতি করে নিম্নমানের বিটুমিন আমদানি বাধাগ্রস্ত হয়। বিপাকে পড়েন অসাধু বিটুমিন আমদানিকারকরা। এমইবির চালানটিরও মান উত্তীর্ণ সনদ না পাওয়ায় কাস্টমসে ডকুমেন্ট জমা দিচ্ছেন না আমদানিকারক। এ অবস্থায় চালানটি পড়ে আছে বন্দরে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমসের (বিটুমিন আমদানি গ্রুপ) সহকারী কমিশনার উত্তম চাকমা বলেন, মান সনদ জালিয়াতি করে বিটুমিন ছাড়ের সুযোগ নেই আর। বর্তমানে ইস্টার্ণ রিফাইনারির সঙ্গে চট্টগ্রাম কাস্টমসের সরাসরি ই-মেইলে মান সনদ পাঠানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। ফলে কেউ যদি ম্যানুয়াল ফাইলে ভুয়া মান সনদ জমাও দেন, যাচাই করার সময় সেটি ধরা পড়বে। এ কারণেই হয়তো অনেকে আমদানি করা নিম্নমানের বিটুমিনের চালান জাহাজ থেকে ইয়ার্ডে নামানোর পরও বন্দর থেকে ছাড় করিয়ে নিচ্ছেন না।

অনুসন্ধানে এ ধরনের একটি চালানের খোঁজ মিলেছে। ৮০০ টন বিটুমিনের চালানটি এনেছে চট্টগ্রামের আমদানিকারক মেসার্স ইলিয়াছ ব্রাদার্সের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ‘এমইবি স্টিল কমপ্লেক্স লিমিটেড’। মূলত ইলিয়াছ ব্রাদার্স ঋণখেলাপি হওয়ায় অন্য প্রতিষ্ঠানের নামে এই বিটুমিন আমদানি করেছে। সিঙ্গাপুরের পতাকাবাহী ‘এমটি অর্কস্টিলা’ জাহাজে চালানটি এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে। জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে পৌঁছায় গত ২০ মে। এরপর ২৫ মে চট্টগ্রাম কাস্টমসে চালানটি ছাড়ের জন্য বিল অব এন্ট্রি জমা দেয় আমদানিকারকের পক্ষে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট চট্টগ্রামের স্ট্র্যান্ড রোডের সি ল্যান্ড সার্ভিসেস। চালানটি থেকে নমুনা নিয়ে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় সরকারি প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ণ রিফাইনারির ল্যাবে। নমুনা পরীক্ষার ফলাফল আসার কথা অনেক আগেই। কিন্তু সেটি গত ১ জুলাই কাস্টমসে পাঠানো হয় ই-মেইলে। নমুনা সংগ্রহের পর রিপোর্ট পেতে দীর্ঘ সময় লাগার মূল কারণ হচ্ছে আমদানি করা বিটুমিন নিম্নমানের।

প্রতিবছর সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) নামে বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ বিটুমিন আমদানি করা হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে বিটুমিনের কোনো রিফাইনারি নেই। যেসব বিটুমিন সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা হয় তা মূলত ইরানের তৈরি। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ইরানের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা থাকায় তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম ব্যবহার করে বিটুমিন রপ্তানি করে থাকে।

মান সনদ রিপোর্টে দেখা যায়, চালানটি মান উত্তীর্ণ হয়নি। বিটুমিনের চালানের গ্রেড ৬০/৭০ মানের হওয়ার ঘোষণা ছিল, কিন্তু পাওয়া গেছে ৭২ গ্রেডের। ফলে সেটি স্বাভাবিকভাবেই নেগেটিভ রিপোর্ট এসেছে। আটক হওয়া ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্সের চালানের মতোই এমইবির চালানটিও নিম্নমানের বিটুমিন। ফলে সেটি ছাড়ের সুযোগ নেই।

ইস্টার্ণ রিফাইনারির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ পর্যন্ত বিটুমিনের দুটি চালান মান উত্তীর্ণ সনদ পায়নি। প্রথমটি জালিয়াতি করতে গিয়ে কাস্টমসের হাতে ধরা পড়েছে। আরেকটির রিপোর্ট তৈরি করে কাস্টমসে পাঠানো হয়েছে।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, ‘ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স’-এর মান সনদ জালিয়াতির বিষয়টি ধরা না পড়লে একইভাবে জালিয়াতি করে এমইবি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্সের চালানটিও ছাড় করিয়ে নেওয়া হতো। কাস্টমসের হাতে জালিয়াতির চালানটি ধরা পড়ার পর বিটুমিনের নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষার রিপোর্ট সংগ্রহ এবং পণ্য ছাড়ে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বেশ কড়াকড়ি আরোপ করেছে। একই সঙ্গে বাড়তি সতর্কতাও আরোপ করা হয়েছে। এ কারণেই এমইবি নিম্নমানের বিটুমিনের চালানটি বন্দর থেকে এখনো ছাড় করাতে পারেনি।

জানতে চাইলে কাস্টমসের এক কর্মকর্তা বলেন, জাহাজ থেকে নামানোর পর ৩০ দিন পার হলে আমরা যেকোনো পণ্যের চালানের ক্ষেত্রে আমদানিকারকের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে ডেকে পাঠাই। তাদের দ্রুত পণ্য ছাড় করিয়ে নিতে নির্দেশ দিই। এর পরও ছাড় করিয়ে না নিলে আমরা নিয়মানুযায়ী চালানটি নিলামের জন্য পাঠাই। এই চালানটির ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া চলমান। গত রবিবার সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে ডেকে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত আমদানিকারকের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের প্রতিনিধি কাস্টমসের ডাকে সাড়া দেননি।

আমদানিকারকের প্রতিনিধি হিসেবে পণ্যছাড়ের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। এই চালানের ক্ষেত্রে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট চেয়েছিল কাস্টমসকে বোকা বানিয়ে কৌশলে নিম্নমানের এই বিটুমিন ছাড় করার। কিন্তু জালিয়াতির একটি চালান ধরা পড়ার পর সব পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সি ল্যান্ড সার্ভিসেসের ব্যবস্থাপনা অংশীদার বদিউল আলম বলেন, ‘আমদানিকারক বলেননি বলেই আমরা ডকুমেন্ট জমা দিইনি।’

এত দিন পণ্য বন্দরে পড়ে থাকার পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি বাসায়। এর বেশি কিছু বলতে পারব না। বিস্তারিত আপনি কাস্টমসে জানতে পারবেন।’

কাস্টমসে মান সনদ জমা না দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ইনিয়ে-বিনিয়ে জবাব এড়ানোর চেষ্টা করেন। একবার জবাব দেন হ্যাঁ, আবার বলেন না। পরে আর কথা বাড়াতে চাননি।



সাতদিনের সেরা