kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৯ জুলাই ২০২১। ১৮ জিলহজ ১৪৪২

শার্শায় জমজমাট জুয়ার আসর

বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি   

৬ জুলাই, ২০২১ ১৭:৩৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শার্শায় জমজমাট জুয়ার আসর

যশোরের শার্শা উপজেলার নিজামপুর ইউনিয়নের গোড়পাড়া বনমান্দার মোড় ও আমতলা গাতিপাড়ার কয়েকটি স্পট চলছে অবাধে জমজমাট তিন কার্ড জুয়ার আসর। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা একটি মহল ও এক জনপ্রতিনিধির নেতৃত্বে অনৈতিকতার তিন কার্ডের জুয়া বোর্ড পরিচালনা করছে এলাকার দুটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এখানে শার্শা উপজেলা ছাড়াও বিভিন্ন উপজেলার জুয়াড়িরা খেলায় দিন-রাত বুদ হওয়ায় প্রতিদিন হাত বদল হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। জুয়ার আসরে খেলার পাশাপাশি আশেপাশের বিভিন্ন স্পটে চলছে নেশার রমরমা কারবার।

গোড়পাড়া পুলিশ ক্যাম্প থেকে এক কিলোমিটারের মধ্যে দীর্ঘ দিন থেকে দিন-রাত রমরমা জুয়া ও মাদকের আসর চললেও এটা বন্ধে কোনো ভূমিকা লক্ষ করা যায় না। তবে অভিযোগ রয়েছে, উপর মহলকে ম্যানেজ করেই চালাচ্ছে এ অনৈতিক কর্মকাণ্ড।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বিগত কয়েকবছর থেকে গোড়পাড়ার উত্তরপাড়া বনমান্দার মোড়ের মাদরাসাশিক্ষক কাদের হুজুরের পরিত্যক্ত বাড়ি, মোস্তফার বাঁশবাগান, বেতনা নদীর পূর্বপাড়-পশ্চিমপাড়, শুড়ার মাঠ, মৃত সিরাজুলের ছেলে জামালের বাড়ির ছাদ, পোতাপাড়ার মুক্তারের বাড়ি, ঢিবির মাঠ, বনমান্দার গ্রামের পশ্চিমপাড়া, আরমানের জামাইয়ের পরিত্যক্ত বাড়ি, বনমান্দার মোড়ে জুলুর চায়ের দোকানের পেছনে ও নেদার মেহগনি বাগানে তিন তাস নামে চলে আসছে অবাধ জুয়া আসর। এলাকার উঠতি যুবক, আলোচিত জুয়াড়িরা এখানে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। দুর-দূরান্ত থেকে আসা জুয়াড়িরা এখানে লাখ লাখ টাকার হাত বদল করছে এবং প্রতিদিন এ চক্রের ফাঁদে পড়ে অনেকেই টাকা খুইয়ে হচ্ছেন নিঃস্ব। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা একটি সংঘবদ্ধ চক্র ও হলুদ সাংবাদিক মিলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চালাচ্ছে নিষিদ্ধ জুয়ার আসর। এ জুয়াকে কেন্দ্র করে স্পটে নেশা গ্রহণ সমান তালে চলায় জুয়া ও মাদকের মোহে পড়ে অনেকে বসছেন পথে। চলমান জুয়া ও মাদকের আসর নিয়ে এ অঞ্চলের অভিভাবক ও তাদের পরিবার উদ্ধিগ্ন হয়ে পড়েছেন।

গোড়পাড়া উত্তরপাড়া বনমান্দার মোড়ের মৃত সিরাজুলের ছেলে ও জুয়া বোর্ড পরিচালনাকারী প্রধান জুয়া সম্রাট খ্যাত শরিফুল, সহযোগী মৃত ওয়াজেদের ছেলে মিজানুর ও হবির ছেলে আলমগীর এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

সূত্রটি আরো জানায়, জুয়ার আসরে ও এলাকার উঠতি যুবকদের মাঝে মদ, গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিল বিক্রি করছে জুয়া সিন্ডিকেটের প্রধান শরিফুলের নিযুক্ত দু’জন স্থানীয় বাবুর স্ত্রী ফুলসিরাত ও শরিফুলের ভাগ্নে চা দোকানি জুলুর ছেলে জহিরুল, তে-বাড়িয়ার চাঁনখার ছেলে হাসান, ফকির তলার বজলের স্ত্রী মাইমা। এদের মধ্যে ফুলসিরাত বাদে বাকি তিন জন পুলিশের হাতে মাদকসহ ধরা পড়ে কোর্ট থেকে জামিনে এসে পুনরায় মাদক কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। গত ২ জুলাই ফকির তলার বজলের স্ত্রী মাইমার নিকট থেকে এক যুবক ইয়াবা কিনে ফেরার পথে ফাঁড়ি পুলিশের হাতে আটক হন।

অপরদিকে গোড়পাড়া আমতলা গাতিপাড়ায় গত কয়েকমাস আগে থেকে পূর্বপাড়া ঘোজের মাঠ, মেহগনি বাগান, গাতিপাড়া গ্রামের খালেকের ছেলে রুহিন এর বাড়িতে প্রতিনিয়ত চলছে রমরমা জুয়া ও মাদকের আসর। দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভিআইপি জুয়াড়িরা তিন তাস জুয়ার বোর্ডে মোটা অংকের টাকা হাত বদল করছে। সেই সাথে মাদক সেবন করে নেশায় বুদ হচ্ছে। এখানেও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ও অন্য ধারার একটি সংঘবদ্ধ চক্র দিন-রাত সমান তালে নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। জুয়ার বোর্ড পরিচালনা করছে গাতিপাড়া হক বিশ্বাসের ছেলে জুয়া সম্রাট খ্যাত তরিকুল, সহযোগী মৃত মোসলেমের ছেলে মগরব, মনছেরের ছেলে পিন্টু ও মিজান ডাকাতের ছেলে নজরুল। জুয়া আসরে ভিআইপি জুয়াড়িদের জন্য মাদক সরবরাহ করছে জুয়া সম্রাট তরিকুল নিজেই। তরিকুল, নজরুল ও নাজিম গত (৩০ জুন) রাত ৯টার দিকে জুয়াড়িদের মাদক সরবরাহকালে গোড়পাড়া পুলিশের হাতে ভারতীয় বাংলা মদসহ আটক হয়। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মদ পরীক্ষণ সাপেক্ষে জিডির মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া হয়।

ওই দুটি জুয়াড়ি চক্র স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতা ও এক জনপ্রতিনিধি পুলিশ প্রশাসনের সাথে সক্ষতা রেখে চলেছেন বলে অভিযোগ আছে। যার কারণে ওই চক্রটি অনেকটা বেপরোয়া হয়েই এ অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। করোনাভাইরাসের মহামারির মধ্যেও কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে স্পট গুলোকে ঘিরে বসছে ছোট-খাটো বাজার, বিতর্কিত পরিচিত মুখ আর অপরিচিত অনেক লোকজনের আনাগোনা দেখা যায় সেখানে। মোটরসাইকেল, ইজিবাইকসহ বিভিন্ন বাহনে চেপে আসে তারা। নেশায় বুদ হয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে এই আসরে। কয়েকটি মহলকে ম্যানেজ করে অসাধু চক্রটি দীর্ঘদিন জুয়ার কারবার চালিয়ে যাওয়ায় এলাকার সাধারণ ব্যবসায়ী ও উঠতি বয়সের যুবকদের মধ্যে নানা প্রতিকুল প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। কেউ খোয়াচ্ছে, কেউ সামান্য লাভবান হচ্ছে। নেশায় বুদ থাকায় খোয়ানো পার্টি আঁচ করতে পারছে না। তবে বেশির ভাগ জুয়া খেলতে এসে নিঃস্ব হয়ে বাড়ি ফিরছে। বিভিন্ন সময়ে জুয়া আসর চালানোর কারণে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে এমন তথ্যও মিলছে।

এলাকা থেকে অভিযোগ উঠেছে জুয়া আসরকে ঘিরে বিভিন্ন মাদকের সহজ প্রাপ্যতা হওয়ায় দিন দিন এলাকার উঠতি যুবক ও ছাত্র সমাজ মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। কোনো অবস্থাতেই তাদের সন্তানদের এই মরন নেশার থেকে দূরে রাখতে পারছে না। অনেক সময় অধিকাংশ পরিবারে বিরাজ করছে অশান্তি। পরিবার থেকে অর্থ না পাওয়ায় জুয়া বোর্ডের দিকে ঝুঁকছে আর জুয়াড়িদের নির্বিঘ্নে খেলায় সহযোগিতা করতে বোর্ড পরিচালনাকারী চক্র এদেরকে ব্যবহার করছে। বিভিন্ন খাবার, মাদক সরবরাহ, জুয়াড়িদের নির্দিষ্ট আসরে পৌঁচ্ছে দেওয়া, মোটরসাইকেল হেফাজতে রাখাসহ মোড়ের চায়ের দোকনগুলোতে পাহারাদার হিসাবে দিন-রাত বসিয়ে রাখা হচ্ছে। যুবকদের দিন শেষে হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিচ্ছে। আর এই টাকা দিয়েই অনেকে নেশা করছে। মাঝে মাঝে এলাকায় কিছু ছোট-বড় চুরির ঘটনাও ঘটছে বর্তমানে জুয়া আসরের সাথে মাদকের ভয়াবহতাও বৃদ্ধি পাওয়ায়। জুয়া ও মাদকের আসরকে ঘিরে এলাকার অভিভাবক তাদের সন্তান ও পরিবেশ নিয়ে বেশ চিন্তিত। সব কিছু জানা সত্ত্বেও অহেতুক বিপদে পড়ার ঝামেলা এড়াতে নীরবতা পালন করে চলেছে তারা।

গোড়পড়া উত্তরপাড়া বনমান্দার মোড়ের জুয়া বোর্ড পরিচালনাকারী প্রধান জুয়া সম্রাট খ্যাত শরিফুল ইসলাম বলেন, আপনারা যা শুনেছেন তা মিথ্যা। আমি কোনো জুয়ার বোর্ড চালাই না। আপনাকে এই নাম্বার কে দিয়েছে এবং আর কোনো দিন এই নাম্বারে ফোন দেবেন না বলে লাইনটি কেটে দেন।

তরিকুল ইসলাম বলেন, আপনারা স্পটে এসে যাচাই করে দেখে যান। 

নাভারণ সার্কেল সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার জুয়েল ইমরান বলেন, পুলিশ প্রশাসনের কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ বেশি সোচ্চার এবং জানা সাপেক্ষে আমরা জুয়াড়িদের ধরে মামলা দিয়ে থাকি।



সাতদিনের সেরা