kalerkantho

শনিবার । ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩১ জুলাই ২০২১। ২০ জিলহজ ১৪৪২

নবীগঞ্জে চাঞ্চল্যকর ফাতেহা হত্যা : হবিগঞ্জ কারাগারে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি রাজুর মৃত্যু

নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি   

৬ জুলাই, ২০২১ ১৫:৪৪ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নবীগঞ্জে চাঞ্চল্যকর ফাতেহা হত্যা : হবিগঞ্জ কারাগারে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি রাজুর মৃত্যু

সাজার রায় ঘোষণার পর আদালত থেকে কারাগারে আসামি রাজু আহমদ (শাদা শার্ট পরিহিত)

হবিগঞ্জ কারাগারের সাজাপ্রাপ্ত কয়েদি নবীগঞ্জের রাজু আহমদ মঙ্গলবার সকালে সিলেট ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। রাজু আহমদ পৌর এলাকার আনমানু গ্রামের মৃত আব্দুল খালিকের ছেলে। নবীগঞ্জে চাঞ্চল্যকর অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ ফাতেহা বেগমকে (২৪) ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় উক্ত রাজু আহমদসহ চারজনের যাবজ্জীবন সাজা প্রদান করেন আদালত। এরপর থেকেই রাজু আহমদসহ অপর আসামিদের হবিগঞ্জ জেলা কারাগারে বন্দিজীবন শুরু হয়। ৫ দিন আগে জেলা কারাগার কর্তৃপক্ষ অসুস্থ অবস্থায় রাজুকে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করে।

সূত্রে জানায়, ২০০২ সালে ২০ আগস্ট রাত অনুমান ৯টার দিকে স্বামী-স্ত্রীর পূর্ব বিরোধ মীমাংসার কথা বলে নবীগঞ্জ পৌর এলাকার হরিপুর গ্রামের আরব আলীর মেয়ে ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ ফাতেহা বেগমকে তার স্বামী সাইদুল মিয়াসহ উল্লেখিত আসামিরা ফুসলিয়ে বাবুল মিয়ার বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে ডেকে নিয়ে যান। তারা তাকে বাবুল মিয়ার বাড়িতে না নিয়ে নৌকায় উঠিয়ে শাখাবরাক নদীতে নিয়ে যান। নৌকার মধ্যেই জোরপুর্বক পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয় তাকে। তাদের পাশবিক নির্যাতনের প্রতিবাদ করায় এবং এই ঘটনার উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়ার হুমকি দেওয়ায় আসামিরা শ্বাসরুদ্ধ করে ফাতেহাকে হত্যা করে। পরে তার মৃতদেহ নদীর পাড়ে ধানক্ষেতে লুকিয়ে রাখে। ঘটনার একদিন পর অর্থাৎ ২১ আগস্ট সকাল ১১টার দিকে নবীগঞ্জ থানা পুলিশ শাখাবরাক নদীর পাড় থেকে মৃতদেহ উদ্ধার করে থানায় নেয়। 

এ ব্যাপারে নবীগঞ্জ থানায় নিহত ফাতেহার বোন রওশনারা বেগম বাদী হয়ে নিহত ফাতেহা বেগমের স্বামী সাইদুল হক, রাজু আহমদ, আব্দুল মন্নাফ, বাবুল মিয়া, আলাল মিয়া ও আব্দুল খালিকের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা (নম্বর-২৭ তারিখ-২১/০৮/২০০২) দায়ের করেন। মামলা দায়েরের একদিনের মধ্যে মৃত ফাতেহার স্বামী সাইদুল হককে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরে তার স্বীকারোক্তিতে পুলিশ ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত নৌকাসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করে। পুলিশ তদন্ত শেষে তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই কামাল উদ্দিন ২০০২ সালের ১ ডিসেম্বর পাঁচজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট এবং অপর আসামি রাজু আহমদকে অব্যাহতি দিয়ে আদালতে অভিযোগপত্র প্রেরণ করেন। পরবর্তীতে মামলার বাদী নারাজি দরখাস্ত দিলে বিজ্ঞ আদালত তা আমলে নিয়ে হবিগঞ্জ সিআইডিকে তদন্তভার প্রদান করেন। সিআইডি পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা রাজুসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে।

এদিকে এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ফাতেহা ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন এবং তাকে হত্যার পূর্বে ধর্ষণ করা হয়। পরবর্তীতে মামলার বিচারকার্য নিষ্পত্তির জন্য হবিগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে মামলাটি স্থানান্তরিত হয় (নম্বর না. শি. ১৩২৫/১৮)। ঘটনার দীর্ঘ ১৭ বছর পর হবিগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালত ৩-এর বিচারক মামলার কাগজপত্র, স্বাক্ষীদের জবানবন্দি, উভয় পক্ষের কৌঁসুলিদের বক্তব্য পর্যালোচনা করে ২০১৯ সালের ৮ জুলাই সোমবার উক্ত রায় প্রদান করেন। রায়ে নিহতের স্বামী উপজেলার গহরপুর গ্রামের মকলিছ মিয়া ছেলে সাইদুল হক, পৌর এলাকার হরিপুর গ্রামের মৃত আব্দুল নুরের ছেলে আব্দুল মন্নাফ, মৃত বজলা মিয়ার ছেলে বাবুল মিয়া এবং আনমনু গ্রামের আব্দুল খালিকের ছেলে রাজু আহমদকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, সাইদুল হক ও আব্দুল মন্নাফকে ১ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরো ১ বছর কারাদণ্ড এবং অপর আসামি হরিপুর গ্রামের মৃত রয়মান আলীর ছেলে আলাল মিয়া ও মৃত আব্দুল লতিফের ছেলে আব্দুল খালিককে বেকসুর খালাস প্রদান করেন। যাবজ্জীবন সাজা প্রাপ্ত আসামিপক্ষর আত্মীয়-স্বজনরা উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেন। 

দীর্ঘ ২৩ মাস ২৮ দিন কারাভোগের পর চিকিৎসারত অবস্থায় রাজু আহমদের সিলেট ওসমানী হাসপাতালে তার মৃত্যু ঘটে। এর আগে তিনি কারাগারে অসুস্থবোধ করলে জেলা কারা কর্তৃপক্ষ তাকে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে তার অবস্থার অবনতি ঘটলে গত ১ জুলাই তাকে সিলেট ওসামনী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। আজ মঙ্গলবার সকালে তিনি চিকিৎসারত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। এদিকে, রাজু আহমদ এর মৃত্যুর খবর এলাকায় পৌঁছলে স্বজনদের মাঝে আহাজারি দেখা দেয়। এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। তার মৃতদেহ সিলেট ময়নাতদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে বাড়িতে আনা হবে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।



সাতদিনের সেরা