kalerkantho

রবিবার । ১৭ শ্রাবণ ১৪২৮। ১ আগস্ট ২০২১। ২১ জিলহজ ১৪৪২

চরম দুর্ভোগে আশ্রয়ণ পল্লীর বাসিন্দারা

মান্দা (নওগাঁ) প্রতিনিধি   

৫ জুলাই, ২০২১ ১০:০৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চরম দুর্ভোগে আশ্রয়ণ পল্লীর বাসিন্দারা

ছাউনির টিনে মরিচা ধরে বিভিন্ন স্থানে ছিদ্র হয়ে গেছে। বৃষ্টি এলে টিনের ফুটো দিয়ে ঝরঝর করে পানি পড়ে ঘরের ভেতর। ভিজে যায় চাল, ডালসহ অন্য খাদ্য ও আসবাবপত্র। বৃষ্টি হলে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়। ঘরের জিনিসপত্র রক্ষায় চালের ফুটো বরাবর হাঁড়ি-পাতিলসহ বিভিন্ন বাসন পেতে পানি আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা চলে। পানি আটকাতে অনেকে আবার ঘরের ভেতর টাঙিয়ে দিয়েছেন পলিথিন।

এ চিত্রটি নওগাঁর মান্দা উপজেলার ভারশোঁ ইউনিয়নের কালিসফা আশ্রয়ণ পল্লীর। পল্লীর ভেতরে রয়েছে ৮ বিঘা আয়তনের একটি পুকুর। এই পুকুরপাড়ের চারপাশে সরকারি অর্থায়নে অসহায় দরিদ্র মানুষদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দেওয়া হয়েছে।

রাস্তা না থাকায় বর্ষা মৌসুমে পল্লীর বাসিন্দাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বৃষ্টি হলেই ঘরের বাইরে কাদায় একাকার হয়ে যায়। এতে করে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে চলাফেরা করতে পারেন না। স্যানিটেশনেরও বেহাল অবস্থা। ভেঙেচুরে নষ্ট হয়ে গেছে। সেখানে থেকে অনবরত ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। এর মধ্যেই অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও ঘিঞ্জি পরিবেশে বসবাস করছে শতাধিক পরিবার।

জানা গেছে, আবাসন ও আত্মসংস্থানমূলক কর্মসূচি ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’-এর আওতায় ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে কালিসফা গ্রামে অসহায় হতদরিদ্র মানুষের জন্য সাতটি ব্যারাক নির্মাণ করা হয়। প্রতিটি ব্যারাকে ছিল ১০টি করে শয়নঘর। ব্যারাকে পাঁচ পরিবারের জন্য তৈরি করা হয় একটি করে টয়লেট এবং ১০ পরিবারের জন্য একটি নলকূপ। কাজটি সমাপ্ত হলে রান্নাঘর ছাড়াই এলাকার ৭০টি পরিবারকে তুলে দেওয়া হয় এই আশ্রয়ণ পল্লীতে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বগুড়া অঞ্চল কাজটি বাস্তবায়ন করে।

পল্লীর বাসিন্দা সাবিনা বিবি জানান, ব্যারাকগুলো নির্মাণের সময় কাঠের ফ্রেমের ওপর টিনের ছাউনি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে কালবৈশাখী ঝড়ে টিনের ছাউনি উড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে কাঠের ফ্রেম সরিয়ে লোহার অ্যাংগেলের ওপর স্থাপন করা হয় কাঠের ফ্রেমের ওপর থেকে খুলে নেওয়া পুরনো টিন। পুরনো টিনের ওপর স্ক্রু বসানোর কারণে অল্পদিনেই ফুটো হয়ে এসব স্থান দিয়ে ঘরের ভেতর পানি পড়তে থাকে।

পল্লীর আরেক বাসিন্দা বেগম বিবি বলেন, কোনো কারণে বৃষ্টির সময় বাড়িতে না থাকলে চাল, ডাল, বিছানাসহ ঘরের অন্যান্য আসবাবপত্র ভিজে যায়। বর্ষায় তাদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে। বর্তমানে পল্লীর প্রতিটি ঘরের ভেতর পলিথিন টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। বৃষ্টি চলে গেলে পলিথিনে আটকে থাকা পানি সরিয়ে নেওয়া হয়।

বিধবা রেজিয়া বিবি জানান, স্বামী আলম সরদারের মৃত্যুর পর দুই ছেলে বিয়ে করে পৃথক সংসার করছে। বিধবা ভাতা তার জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন। এ অবস্থায় ঘর মেরামত করার মতো অর্থ তাঁর হাতে নেই। তিনি আরো বলেন, পল্লীর লোকজন কৃষিকাজ, ভ্যান ও আটো চালিয়ে সংসার পরিচালনা করেন। তার মতো অন্য সবার অবস্থাও একই রকম।

এ পল্লীতেই বেড়ে উঠছেন সাগর হোসেন (১৭) ও শফিকুল ইসলাম (১৭) নামে দুই তরুণ। তারা দুজনই উপজেলার চকগোপাল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০২০ সালে বিজ্ঞান বিভাগে জিপিএ ৫ পেয়ে সাফল্যের সঙ্গে এসএসসি পাস করেন। এর মধ্যে সাগর হোসেন ভর্তি হয়েছেন রাজশাহী সরকারি মডেল স্কুল ও কলেজে। আর শফিকুল ভর্তি হয়েছেন উপজেলার উত্তরা ডিগ্রি কলেজে।
শিক্ষার্থী সাগর হোসেন বলেন, উচ্চশিক্ষার আশা ছিল। কিন্তু প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থ। কৃষক বাবা বাবুল হোসেনের পক্ষে তার লেখাপড়ার খরচ জোগানো সম্ভব নয়। তাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে দেশসেবায় আত্মনিয়োগ করতে চান। এই শিক্ষার্থী আরো বলেন, শুধু অর্থসংকটের কারণে এ পল্লীর ছেলে-মেয়েরা উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

মুক্তিযোদ্ধা উজির উদ্দিন প্রামাণিক বলেন, তিনিও এ পল্লীর একজন বাসিন্দা। বর্তমানে এখানকার লোকজন অত্যন্ত ঘিঞ্জি পরিবেশে বসবাস করছেন। বর্ষা মৌসুমের অধিকাংশ সময়ই কাদা ভেঙে চলাফেরা করতে হয়। পুরনো ল্যাট্রিনগুলো থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে বসবাসের পরিবেশ নষ্ট করছে। পল্লীর বাসিন্দাদের স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাসের জন্য পুকুরের চারপাশ দিয়ে রাস্তা নির্মাণসহ জরুরি ভিত্তিতে ঘর ও ল্যাট্রিনগুলোর সংস্কারের দাবি জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে ভারশোঁ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান সুমন বলেন, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় পল্লীর বসতঘরগুলোর বেহাল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ল্যাট্রিনগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। একবার সংস্কার করে দেওয়া হলেও আবারও সেগুলো নষ্ট হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, যাতায়াতের সুবিধার্থে কালিসফা বটতলী মোড় থেকে আশ্রয়ণ পল্লী পর্যন্ত ৪৬৫ ফুট রাস্তায় ইট সোলিংয়ের কাজ শুরু করা হয়েছে। আগামীতে পল্লীর পুকুরপারের চারদিক দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করারও পরিকল্পনা রয়েছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে কালিসফা আশ্রয়ণ প্রকল্পের বসতঘর নির্মাণ করা হয়েছিল। বর্তমানে ছাউনির টিনগুলো ছিদ্র হয়ে গেছে। টিনসহ অর্থ বরাদ্দ চেয়ে ওপর মহলে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পেলেই সংস্কার কাজটি বাস্তবায়ন করা হবে।



সাতদিনের সেরা