kalerkantho

বুধবার । ১৩ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৮ জুলাই ২০২১। ১৭ জিলহজ ১৪৪২

‘এত ত্রাণ মুই আর পাও নাই বাহে’

নীলফামারীতে শুভসংঘের ত্রাণ বিতরণ

ভুবন রায় নিখিল ও নাজমুল হুদা, তোফাজ্জল হোসেন লুতু ও আসাদুজ্জামান স্টালিন নীলফামারী থেকে   

৫ জুলাই, ২০২১ ০৩:২৮ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



‘এত ত্রাণ মুই আর পাও নাই বাহে’

নীলফামারীতে দুস্থদের হাতে গতকাল কালের কণ্ঠ শুভসংঘের সদস্যরা খাদ্য সহায়তা তুলে দেন।

একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে শহীদ হন নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার কালীগঞ্জ গ্রামের হেমন্ত শীল। সেই থেকে তাঁর বিধবা স্ত্রী বদনেশ্বরী শীলের (৯৫) জীবন চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন গতর খাটিয়ে। কিন্তু শেষ বয়সে আর চলছে না শরীর। এখন তাঁকে চলতে হচ্ছে অন্যের সহায়তা নিয়ে। সেই বদনেশ্বরী শীলের হাতে গতকাল রবিবার বিকেলে পৌঁছেছে কালের কণ্ঠ শুভসংঘের ত্রাণ সহায়তা। ত্রাণ পেয়ে খুশিতে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পর একসাথে এত ত্রাণ মুই আর পাও নাই বাহে।’

বদনেশ্বরী শীল বলেন, ‘দুঃখের কাথা কী আর কইম (বলি), মুই ভিক্ষা করি খাও। করোনাত মানষি ভিক্ষাও দিবার চায় না। মুই বিধুবা মানষি, দুইজন বেটা আছে। তারা বউ-ছাওয়া নিয়া বেগল (আলাদা) খায়। সকালে একনা (একটু) মুড়ি মুখে দিছু। এলা বিকাল পর্যন্ত মুখে কোন উঠে নাই। যার উসিলায় মোর ভাগ্যে এতলা খাবার জুটিল, ভগবান তাকে যেন ভালো থোয়।’

শুধু বদনেশ্বরী শীলই নন, নীলফামারীর সৈয়দপুর, কিশোরগঞ্জ, জলঢাকা ও সদর উপজেলার ৯০০ মানুষের মধ্যে গতকাল দেশের শীর্ষ শিল্প গ্রুপ বসুন্ধরার সহযোগিতায় ত্রাণ বিতরণ করেছে কালের কণ্ঠ শুভসংঘ। সকালে সৈয়দপুর উপজেলার হাজারীহাট স্কুল ও কলেজ মাঠে ২০০, দুপুরে কিশোরগঞ্জ সরকারি কলেজ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড মাঠে ৩০০, বিকেলে জলঢাকা উপজেলার কালীগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ২০০ এবং সদর উপজেলার লক্ষ্মীচাপ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ২০০ মানুষের মধ্যে ওই ত্রাণ বিতরণ করা হয়।

সকালে সৈয়দপুরে ত্রাণ নিতে এসেছিলেন ৮৫ বছরের পাথরমণি। তিনিও ভিক্ষা করেই শেষ বয়সটা পার করছেন। থাকার জন্যও নেই কোনো ভালো ঘর। ছোট ছেলের রান্নাঘরের খুপরিতেই বাস করেন। ত্রাণ পেয়ে কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে পাথরমণি বলেন, ‘বুড়ি মানুষ বেঁচে না থাকিলেই ভালো বাবা। ছেলে-মেয়ে কাহো দেখিবার আইসে না। ইলিফ দিয়া কয় দিন খাবার পারিম? মুই বয়স্ক মানুষ, মোর দোয়া কবুল হইবে বাবা। বসুন্ধরার চেয়ারম্যানের জন্য দোয়া করিম, তোমরা সুখে থাকো বাবা।’

পাথরমণির মতো বৃদ্ধ বয়সেও কষ্ট করছেন মহসিনা (৭০) বেগম। তিনি বলেন, ‘এলা কাহো হামার এলার খবর নেয় না। মেম্বর-চেয়ারম্যানেরঘর চাউল-ডাইল দিবার চায়াও দেয় না। হামরা যে না খায়া কেমন করি আছি তা কাহো দেখিবারে চায় না। আইজ বসুন্ধরা গ্রুপ হামাক ত্রাণ দেইল। আল্লাহ ওমার ভালো করুক বাহে।’

এভাবে নিজেদের দুঃখ-কষ্টের কথা তুলে ধরে ত্রাণ নিতে আসা অসহায় মানুষেরা। তাদের মধ্যে রয়েছেন প্রতিবন্ধী বাসন্তী, জগমায়া, জয়নাল আবেদীন, আলতাফ হোসেন প্রমুখ।

কিশোরগঞ্জ উপজেলায় ৩০০ অসহায় ও দুস্থ পরিবারের মধ্যে রয়েছে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হোটেল শ্রমিক, নরসুন্দরসহ বৃদ্ধাশ্রম ও এতিমখানায় আশ্রিতরা। কিশোরগঞ্জ সরকারি কলেজের মাঠে ও কলেজসংলগ্ন নিরাপদ বৃদ্ধাশ্রমে বসুন্ধরার সহায়তায় এই ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন শুভসংঘের সদস্যরা। এরপর উপজেলা পরিষদসংলগ্ন পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাঠে সহায়-সম্বলহীনদের মধ্যে খাদ্যদ্রব্য বিতরণ করা হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কালাম বারী পাইলট শাহ্ ও নিরাপদ বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা মো. সাজেদুর রহমান।

লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্ত দেলোয়ার হোসেন নামের এক হোটেল শ্রমিক বলেন, ‘লকডাউনে আমাদের হোটেলগুলো বন্ধ। এখন আমাদের কোনো কাজ নেই। এই কয় দিন কিভাবে চলব চিন্তায় ছিলাম। বসুন্ধরা গ্রুপের এই সাহায্য দিয়ে আমরা লকডাউনের সময়ে ছেলে-মেয়ে নিয়ে খেতে পারব।’

ফণী শীল নামের এক নরসুন্দর বলেন, ‘আমরা ছোট সেলুন চালিয়ে সংসার চালাই। করোনার কারণে আমাদের সেলুন বন্ধ। সরকার ঘর থেকে বের হতে না করছে। কোনো রকমে বেঁচে আছি। বসুন্ধরা গ্রুপের ত্রাণ পেয়ে খুব উপকার হলো। লকডাউনের সময়টাতে চিন্তামুক্ত হলাম।’

নিরাপদ বৃদ্ধাশ্রমের জবেদা খাতুন বলেন, ‘আমাকে দেখার কেউ নেই। এই আশ্রয়েই দিন চলে যায়। মানুষের সাহায্য খেয়েই বেঁচে আছি। তোমরা দিলে আমরা খেতে পারি।’

জাহেতুন বেগম বলেন, ‘আমি বৃদ্ধ বয়সে পৃথক খাই। চাল-ডাল এনে দিলে বউ রান্না করে দেয়, না দিলে দেয় না। মানুষের থেকে ভিক্ষা করে খাই। তোমাদের খাবার দিয়ে ভালোভাবে খেতে পারব।’

কিশোরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবুল কালাম বারী পাইলট শাহ্ বলেন, ‘মহামারির সময়ে সরকার অসহায়দের নানাভাবে সাহায্য করছে। বেসরকারিভাবেও আপনারা সহায়তা পাচ্ছেন। বসুন্ধরা গ্রুপের এই খাদ্যদ্রব্য দিয়ে আপনারা সাত দিন খেতে পারবেন। তাই এই লকডাউনের সময় আপনারা কেউ ঘর থেকে বের হবেন না। আমি আমার উপজেলার পক্ষ হয়ে বসুন্ধরা গ্রুপকে ধন্যবাদ জানাই।’

কিশোরগঞ্জ উপজেলায় শুভসংঘের ত্রাণ সহায়তা পেয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের জন্য বিশেষ দোয়া করেছে মাদরাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থীরা। উপজেলার আকবারিয়া জান্নাতবাগ হাফিজিয়া নুরানি এতিমখানা মাদরাসায় এই ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হয়। এ সময় শুভসংঘের সদস্যরাও বিশেষ দোয়ায় অংশ নেন। এতে উপস্থিত ছিলেন এতিমখানার সভাপতি শামসুল হক সরকার, সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, প্রভাষক জাহাঙ্গীর আলম প্রমুখ।

নীলফামারী সদর উপজেলায়ও ২০০ অসহায় ও বয়স্কদের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছে শুভসংঘ। এদিন বিকেলে লক্ষ্মীচাপ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বসুন্ধরা গ্রুপের সহায়তায় এই ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়। বিদ্যালয় মাঠে মেয়ের সঙ্গে ত্রাণ নিতে আসেন বিধবা মিনা রানী। তাঁদের সহায়-সম্বল কিছুই নেই। থাকেন অন্যের ভিটায়। মানুষের কাজ করে দু মুঠো খেতে পারেন। তিনি বলেন, ‘এইটা নিয়া কয়টা দিন খাওয়া চলিবে। তোমাদের জন্য আশীর্বাদ করিম। তোমারলাক ভগবান আরো দেউক।’

মিনা রানীর মতো আরেক বিধবা সৌরবালা। বয়স্ক ভাতা দিয়েই কোনোভাবে খেয়ে বেঁচে আছেন। তিনি বলেন, ‘তোমরা যদি না দেন, তাইলে আমরা কেমন করি পাই। তোমারলার জন্য আশীর্বাদ করিমো।’

অতুল রায় নামের এক উপকারভোগী বলেন, ‘লকডাউন দিয়া হামরা যে কী কষ্টত আছি। মুই বুড়া মানুষি। চার্জার ভ্যান চলে খাও। কিন্তু আইজ কয় দিন থাকি কাম নাই। মুই বাড়িত বসি আছো। বউ-ছাওয়া নিয়া মেলা কষ্টত আছো। বসুন্ধরা গ্রুপ আইজ মুক চাউল-ডাইল দেইল। যাক এখন হামরা কয় দিন পেট ভরে খাবার পামো।’

সৈয়দপুর উপজেলার হাজারীহাট স্কুল ও কলেজ মাঠে ওই ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. রমিজ আলম। এ সময় তিনি বলেন, ‘করোনার কারণে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভেঙে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে খেটে খাওয়া অসহয় ও দুস্থ মানুষগুলো। আমরা সরকারি-বেসরকারিভাবে এসব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। এরই ধারাবাহিকতায় বসুন্ধরা গ্রুপ আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা এই নীলফামারীতে তিন হাজার মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে। আমি বসুন্ধরা গ্রুপের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।’

নীলফামারীর লক্ষ্মীচাপ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ত্রাণ বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শাহিদ মাহমুদ।

এসব অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান, সাধারণ সম্পাদক শামীম আল-মামুন, সদস্য শরীফ মাহ্দী আশরাফ জীবন, শুভসংঘের নীলফামারী জেলা শাখার সভাপতি অধ্যক্ষ মো. আনোয়ার হোসেন, সৈয়দপুর শুভসংঘ উপদেষ্টা ও হাজারীহাট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ লুত্ফর রহমান চৌধুরী, শুভসংঘের সভাপতি নাছিম রেজা শাহ, সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মুন্না দাস, কার্যকরী সদস্য আমির হোসেন, অশোক রায়, সৈয়দপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) নজির হোসেন নজু, সৈয়দপুর উপজেলার খাতামধুপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. জুয়েল চৌধুরী, কাশিরাম বেলপুকুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) মো. নুরন্নবী সরকার, জলঢাকা শুভসংঘের সভাপতি অধ্যক্ষ বিবেকানন্দ মোহন্ত, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার, কালীগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় সভাপতি নজরুল ইসলাম প্রমুখ।



সাতদিনের সেরা