kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

ডিজিটাল মারপ্যাঁচে ভাতার টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ

আলতাফ হোসেন মিন্টু, কেরানীগঞ্জ   

৩০ জুন, ২০২১ ০২:২০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ডিজিটাল মারপ্যাঁচে ভাতার টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ

সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক গরিব অসহায়দের বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের পরিবর্তে সারা দেশে মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট নগদের মাধ্যমে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। 

কেরানীগঞ্জেও এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে গত মে মাস থেকে। তবে নানা জটিলতার কারণে ভাতার টাকা সংগ্রহ করতে পারছেন না অধিকাংশ অসহায় জনসাধারণ। এর আগে সহজেই ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা উঠাতে পারলেও বর্তমানে ডিজিটাল মারপ্যাঁচে ভাতার টাকা উঠাতে নানা জটিলতা পোহাতে হচ্ছে।

অনেকে কয়েক মাস ধরে দ্বারে দ্বারে ঘুরেও সংগ্রহ করতে পারছে না ভাতার টাকা। এতে করে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে অসহায় দরিদ্র ও ভাতার টাকার ওপর নির্ভরশীল জনসাধারণদের।

কেরানীগঞ্জের আগানগর ইউনিয়নের নামাপাড়া এলাকার বাসিন্দা অসহায় হাওলাদার রওশন আলী। গত তিন বছর ধরে নিয়মিত ব্যাংকের মাধ্যমে বয়স্ক ভাতা পেয়ে আসছিলেন তিনি। কিন্তু গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে ভাতা পাচ্ছেন না তিনি। এ জন্য তিনি কেরানীগঞ্জ সমাজসেবা অফিসে যোগাযোগ করলে তারা বলছে আমার টাকা কোনো একটা নম্বরে ভুলের কারণে নাকি আমি এত দিন পাই নাই। এখন আর আমার টাকা দেওয়া হবে না। পরবর্তীতে আবার বাজেট হলে নতুন করে দেওয়া হবে। আমার গত ৬ মাসের টাকা আমি পেলাম না। অথচ এই টাকাটা দিয়ে আমি প্রতি মাসে ওষুধ কিনে খাই।

একই এলাকার আমবাগিচা খালপাড়ের বাসিন্দা মো. ইউনুস মিয়া বলেন, তার বয়স্ক ভাতার ৬ মাসের তিন হাজার টাকা চলে গেছে জামালপুরের এক ব্যক্তির কাছে। তার টাকা আরেকজনের নম্বরে কিভাবে গেল সেটা ইউনুস মিয়ার জানা নেই। যে নম্বরে টাকা গেছে ওই ব্যক্তিও অস্বীকার করছে। কয়েকবার নিকটস্থ ইউনিয়ন পরিষদে দৌড়াদৌড়ি করলে ও টাকার কোনো সুরাহা করতে পারেননি তিনি। সমাজসেবা অফিস থেকে বলা হয়েছে এই টাকার ব্যাপারে তাদের কিছুই করার নেই। তবে পুরাতন নম্বরটি কেটে নতুন নম্বর রেখে দিয়েছেন তারা, পরবর্তীতে আর সমস্যা হবে না এমনটা আশা দেওয়া হয়েছে ইউনুস মিয়াকে।

একই সমস্যা তেঘরিয়ার মনোয়ারা বেগমের। ভাতার টাকা না পেয়ে তিনি যোগাযোগ করেন কেরানীগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে। তিনি জানতে পারেন তার ভাতার ৬ মাসের ৩০০০ টাকা চলে গেছে অন্য কোন এক নম্বরে। ২ মাস আগে নগদ একাউন্ট করার সময় যে নম্বরটি মনোয়ারা দিয়েছিলেন, সে নম্বরে টাকা না এসে অন্য আরেকটি নম্বরে কিভাবে টাকা গেল সেটা মনোয়ারা জানেন না। সমাজসেবা অফিস, তেঘরিয়া ইউনিয়ন পরিষদ, নগদ অফিস ঘুরেও এই ভুল নম্বরের কোনো ব্যাখা পাননি তিনি। পরে এর সুরাহা করার জন্য দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় একটি জিডিও করেছেন এ বিষয়ে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করে ওই টাকার কোনো সুরাহা করতে পারেননি  মনোয়ারা বেগম।

শুভাঢ্যা ইউনিয়নেরর সাফিয়া বেগম গত কয়েকদিন ধরে যাওয়া আশা করছেন নিকটস্থ ইউনিয়ন পরিষদে ও উপজেলা সমাজসেবা অফিসে। তিনিও গত ৬ মাস যাবৎ টাকা পাচ্ছেন না।  তার টাকা তার মুঠো ফোনের নগদ একাউন্টে চলে এসেছে। কিন্তু এই টাকা দেখবেন কিভাবে টাকাটা তুলবেন কিভাবে সেটা তার জানা নাই। তিনি তার নগদ একাউন্টের পিন নম্বরটি জানেন না। তিনি দাবি করছেন সমাজসেবা অফিসের যারা তাকে নগদ একাউন্ট খুলে দিয়েছিল তারা তাকে পিন নম্বরটি বলেনি। এখন তাকে গুলিস্তান নগদের কাস্টমার কেয়ারে যেতে বলেছে। অসুস্থ সাফিয়া বেগম গুলিস্তানে কোথায় গিয়ে অফিস খুঁজবেন, কার কাছে জাবেন, কি করবেন কিছুই তার বুঝে আসছে না।

কালিন্দী ইউনিয়নের নুরু মিয়ার টাকাও চলে গরছে ভুল নগদ নম্বরে। সমাজসেবা অফিস আর নগদ অফিসের লোকজন যখন নগদ নম্বর সংগ্রহ করতে এসেছিল তখন তিনি যে নম্বর দিয়েছিলেন সেটার সঙ্গে যে নম্বরে টাকা গেছে তার শেষের দুই ডিজিট ভুল আছে। নুরু মিয়া বলেন, আমি কয়েকবার আমার নম্বরটি তাদের বলেছি। পুনরায় চেক করতে বলেছি। তারা আমাকে আসস্ত করেছিল নম্বর ঠিকঠাক দিয়েছে তারা। কিন্তু এখন টাকা আনতে গিয়ে দেখি নম্বর ভুল বসিয়েছে তারা। আর এর দায় তারা নিতেও চাচ্ছে না। আমি কি আমার নিজের নম্বর ভুল বলবো বলেন? যে নম্বরে টাকা গেছে ওই লোকও কল ধরছে না। আমার মতে আবার আমাদেরকে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা দেওয়া হউক। সেটাতেই আমরা খুশি। আমি ব কলম মানুষ আমি কি মোবাইলের মারপ্যাঁচ বুঝি।

সরেজমিন কেরানীগঞ্জের প্রতিটি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, এমন অহরহ সমস্যা। প্রতিটি ইউনিয়নেই এ সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে। প্রতিদিনই ইউনিয়ন পরিষদে ভিড় করছে ভাতা না পাওয়া লোকজন। এদের মধ্যে কেউ কেউ নিজের নগদ পিন নম্বরটি জানেন না। কারো কারো মোবাইল নম্বর ভুল উঠানো হয়েছে। কারো কারো ২/১টা ডিজিট ভুল উঠেছে। কারো কারো অন্য অপরিচিত নম্বরে টাকা চলে গেছে। বেশির ভাগের টাকা অন্য নম্বরে ভুলে চলে যাওয়ার কারণে গত ৬ মাসের ভাতা বঞ্চিত হয়েছে ভাতা ভোগকারীদের বড় একটা অংশ। আর এই ভুলের দায় সমাজসেবা অফিস বা স্থানীয় নগদ কর্তৃপক্ষ কেউ নিতে চাইছে না। তারা একে অপরকে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ করছে।

স্থানীয় কয়েকজন জনসাধারণের সঙ্গে কথা হলে তারা বলেন, আগে ভাতার টাকা ব্যাংকে দেওয়া হতো, সেটাই ভালো ছিল। এখন ডিজিটাল করাতে সুবিধার চেয়ে অসুবিধা বেশি হয়েছে। বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা যারা নেয়, তাদের অনেকের মোবাইল ফোন নেই, নেই নগদ একাউন্ট, টাকা সংগ্রহের জন্য তাদের তৃতীয় পক্ষের আশ্রয় নিতে হয় এটা একটা অসুবিধা। অনেকেই নগদেও পিন নম্বর কি সেটা জানেন না এটা একটা সমস্যা। এছাড়া যারা এই ভাতা সুবিধা ভোগকারীদের একাউন্টগুলো খুলে দিয়েছেন তারা কাজের সময় খামখেয়ালী করেছে। ঠিকমতো কাজ করেনি বিধায়ই নম্বরগুলো উল্টা-পাল্টা হয়েছে।

দুই একটা ভুল হয়তো মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু অধিকাংশ নম্বরেই ভুল এটা মেনে নেওয়া কষ্টকর। এখানে অন্য কোনো বিষয় আছে কিনা সেটা ভাবার বিষয়। 

নগদ কর্তৃপক্ষ কি বলছেন
কেরানীগঞ্জের নগদের পার্টনার রিলেশনসীপ অফিসার (পিআরও) সৈয়দ গোলাম মোর্শেদ বলেন, সম্পূর্ণ নম্বর ভুল অথবা ডিজিট ভুল যাই হোক না কেন, এর দায় স্থানীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের লোকজনের এখানে নগদের বা নগদের কর্মকর্তাদের বিন্দুমাত্র ভুল নেই। তারা আমাদের যে নম্বরগুলো দিয়েছে আমরা ওই নম্বরের নগদ একাউন্ট আপডেট করেছি। আমাদের ২০ জন স্টাফ দুই মাস পরিশ্রম করে কেরানীগঞ্জে ২৭ হাজার ভাতা সুবিধাভোগীর মধ্যে ২০ হাজার সুবিধা ভোগীর নগদ সিস্টেম চালু করে দিয়েছে। সমাজসেবার লোকজন যেভাবে চেয়েছে আমরা ওইভাবেই কাজ করেছি। তবে বাকি ৭ হাজার লোকের ইনফরমেশন সমাজ সেবার লোকজন সংগ্রহ করেছে। আমাদের ২০ হাজার লোকের কাজটা করতে সময় লেগেছে ২ মাস। আর তারা কয়েকজন মিলে বাকি ৭ হাজার লোকের তথ্য ৪/৫ দিনে কিভাবে আপডেট করল তা আমাদের জানা নেই।

সমাজ সেবা কর্তৃপক্ষ যা বলছেন
কেরানীগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মো. ফখরুল আশরাফ বলেন, নম্বর ভুলের দায় সম্পূর্ণ নগদ কর্তৃপক্ষের। মাঠ পর্যায়ে তাদের যে দায়িত্বটি দেওয়া হয়েছিল তা তারা ঠিক মতো পালন করেনি। তারা ঠিক মতো কাজ করেনি বিধায়ই আজকে এতো সমস্যা। তাছাড়া তারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে অদক্ষ লোক দিয়েছিল। তাদের অদক্ষতার কারণেই এতো ভুল হয়েছে। আর তারা ২২ হাজার লোকের তথ্য ২ মাসে আপডেট করেছে। বাকিগুলো সমাজসেবা অফিসের লোকজন ২৫ দিন সময় নিয়ে করেছে। ভুলের বিষয়ে সম্পূর্ণ দায় দায়িত্ব নগদ কর্তৃপক্ষের।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেরানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অমিত দেব নাথ বলেন, এমন কয়েকটা অভিযোগ আমিও পেয়েছি। ভুলটা কোথায় হচ্ছে তা খুঁজে বের করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর যে উদ্যোগ তা নস্যাৎ করতে যদি কোনো চক্র কাজ করে থাকে তাহলে তাদের প্রতিহত করতে আইনি পদক্ষেপসহ সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তার আগে আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। টেকনিক্যাল কোনো ভুল হয়ে থাকলে তা ঠিক করার চেষ্টা করা হবে। আর কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করলে তার বিরুদ্ধে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ বিষয়ে আপনাদের সবার সহযোগিতা দরকার।



সাতদিনের সেরা