kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১।৮ সফর ১৪৪৩

ভুয়া সনদে খালাস বিটুমিনের চালান

৫০ কনটেইনারের চালান আটকের নির্দেশ কাস্টমসের

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

২৯ জুন, ২০২১ ০২:৪৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ভুয়া সনদে খালাস বিটুমিনের চালান

মান পরীক্ষায় ফেল করার পর সনদ জালিয়াতির মাধ্যমে বিটুমিনের চালান ছাড় করে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম কাস্টমসে। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই) লিমিটেড ৫০টি কনটেইনারে প্রায় এক লাখ টন বিটুমিন নিয়ে আসে। ভুয়া সনদে গতকাল সোমবার ৯টি কনটেইনার ছাড় করে নেওয়ার পর আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের জালিয়াতি ধরা পড়ে। এরপর ছাড় হওয়া ৯টিসহ পুরো চালান আটকের নির্দেশ দিয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।

বিদেশ থেকে নিম্নমানের বিটুমিন আমদানি ঠেকাতে মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বিটুমিনের চালান দেশে ঢোকানো হতো। কিন্তু পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে দেওয়ায় নানা কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে আমদানিকারকরা।

গতকালের জালিয়াতি সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমসের সহকারী কমিশনার উত্তম চাকমা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অর্থবছর শেষ হতে সময় মাত্র তিন দিন। আমরা রাজস্ব লক্ষমাত্রা নিয়ে প্রচণ্ড ব্যস্ততার মধ্যে দিন পার করছি। ঠিক সেই সময়টাই বেছে নিয়েছে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ও সিঅ্যান্ডএফ সানশাইন এজেন্সি।’ তিনি বলেন, ইস্টার্ন রিফাইনারির মান সনদ এমন সূক্ষ্মভাবে জালিয়াতি করা হয়েছে, সাদা চোখে দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই। এ সুযোগে গতকাল সোমবারই বিটুমিনভর্তি ৯টি কনটেইনার ছাড় হয়েছে। তিনি সরেজমিনে গিয়ে যাচাই করে ছাড় হওয়া কনটেইনার পুনরায় ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন।

চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মান সনদ উত্তীর্ণ না হয়ে পণ্য ছাড় করা অপরাধ। সেই সঙ্গে সরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের সনদ জালিয়াতি করে জমা দেওয়া আরো কঠোর অপরাধ। আমরা প্রথমে ছাড় হওয়া পণ্য ফেরত নিয়ে আসছি। এরপর আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে শোকজ করব। এরপর আইনগত কঠিন শাস্তি নিশ্চিত করব। কোনো ছাড় হবে না।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এনডিইর একটি বাণিজ্যিক চালান চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে ১৪ জুন। এই চালানে ৫০টি কনটেইনারে প্রায় এক লাখ টন বিটুমিন রয়েছে। মূল্য চার লাখ ১৭ হাজার মার্কিন ডলার। ‘এমভি নেগার’ নামে ইরানি পতাকাবাহী জাহাজ থেকে নামিয়ে গত ২০ জুন বিটুমিনের চালানটির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। নমুনাটি পাঠানো হয় সরকারি ইস্টার্ন রিফাইনারিতে (ইআরএল)। ইআরএল গত ২৪ জুন পণ্যের মান সনদ দেয়।

রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আটটি শ্রেণিতে চালানটির মান পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে দুটি শ্রেণিতে চালানটি মানের দিক থেকে ফেল করেছে। এ অবস্থায় চালানটি বন্দর থেকে ছাড়ের সুযোগ নেই। এ কারণে ইস্টার্ন রিফাইনারির মূল সনদ কাস্টমসে জমা না দিয়ে জালিয়াতি করে ভুয়া সনদ দিয়ে কাস্টমস থেকে বিটুমিনের কনটেইনার বের করার কৌশল নেয় আমদানিকারক ও চট্টগ্রামের সিঅ্যান্ডএফ সানশাইন এজেন্সি। এর মধ্যে ৭২ লাখ টাকার শুল্ক পরিশোধ করে ৯টি কনটেইনার ছাড়ও করা হয়।

জানতে চাইলে মান সনদ দেওয়া প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারির উপমহাব্যবস্থাপক (মান নিয়ন্ত্রণ) জাহিদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিকেলে (সোমবার) কাস্টমস থেকে আমাকে ফোন করে জানানো হয়েছে জালিয়াতির বিষয়টি। আমি আসল সনদ কোনটি সেটি তাদের নিশ্চিত করেছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘নমুনা পরীক্ষায় এনডিইর চালানটি দুটি শ্রেণিতে মান উত্তীর্ণ হয়নি। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, পেনিট্রেশনে ৬০ থেকে ৭০-এর বদলে ৭২ পয়েন্ট পেয়েছে। ফলে আমদানিকারক কিভাবে জালিয়াতি করল আমরা জানার কথা নয়।’

জানা গেছে, চট্টগ্রাম কাস্টমসে গত বছর বেশকিছু এ ধরনের মান সনদ জালিয়াতি ধরা পড়ার পর ম্যানুয়ালি এবং মেইলে দুভাবে মান সনদ কাস্টমসে পাঠানোর নিয়ম আছে। এ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি কেন জানতে চাইলে জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের কাছে তো আমদানিকারকের পক্ষে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সিলগালা করা, নমুনা পাঠানো এবং মান সনদও সিলগালা করে নিয়ে যান কাস্টমসে। এ ক্ষেত্রে বাহক কিন্তু সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট। এখন কাস্টমস যদি ইমেইলে মান সনদ চায় তাহলে তো আমরা দিতে পারি। তাহলে জালিয়াতি বন্ধ করা যাবে।

জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট সানশাইন এজেন্সির মালিক মাহমুদ রেজা বলেন, ‘আমরা ওই আমদানিকারকের কাজ মাঝেমধ্যে করি। ভুয়া সনদ দিয়ে পণ্য ছাড়ের বিষয়টি আমার জানা নেই।’ পরে অসুস্থতার অজুহাতে তিনি আর কথা বলতে রাজি হননি। ৯টি কন্টেইনার ফেরতের বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে সামনাসামনি কথা বলতে চান। এরপর উল্লিখিত বিষয়ে ফোনে বক্তব্য চাইলে তিনি আর কথা বাড়াননি।

জানা গেছে, গত ২৫ মে বিটুমিনের মান নিশ্চিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তিনটি নির্ধারিত ল্যাবে মান পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করে। এরপর থেকেই মূলত নিম্নমানের বিটুমিন আমদানির চক্রটি বিপাকে পড়ে। এর আগে মান পরীক্ষায় বাধ্যবাধকতা না থাকার সুযোগে দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানের ভেজাল বিটুমিন আমদানি হয়ে আসছিল।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইরান থেকে মানহীন ৮০-১০০ গ্রেডের বিটুমিন কিনে উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সিল লাগানো হয়। এর আগে ইরানের আল আব্বাস বন্দর থেকে আমিরাতের বিভিন্ন বন্দরে আনার পর ওই বিটুমিনের সঙ্গে মেশানো হয় নানা ধরনের ভেজাল। এতে বিটুমিনের ওজন বৃদ্ধির পাশাপাশি মান হয় আরো খারাপ। এই মানহীন বিটুমিন চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খালাসের ক্ষেত্রে পরীক্ষা বাধ্যতামূলক হওয়ায় বিপাকে পড়েছে আমদানিকারকরা।



সাতদিনের সেরা