kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

তাফালবাড়ী যেন পাখির অভয়াশ্রম

সেই বকবাড়িতে এসেছে নতুন অতিথি

মহিদুল ইসলাম, শরণখোলা (বাগেরহাট)   

২৩ জুন, ২০২১ ১৬:৫৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সেই বকবাড়িতে এসেছে নতুন অতিথি

এবছর নতুর অতিথি এসেছে বাগেরহাটের শরণখোলার দক্ষিণ তাফালবাড়ী গ্রামের আব্দুল মান্নান হাওলাদারের সেই বকবাড়িতে। ধবধবে সাদা এই বকের পা দুটি টুকটুকে লাল। ঠোঁট দুটি হালকা ও গাড় নীলের মিশেল। চোখের মণির চার পাশ গাড় হলুদ বর্ণ। এই বকের আরো একটি আকর্ষণীয় দিক হলো, ডানা ঝাপটা দিতেই ময়ূরের পেখমের মতো পালক ছড়িয়ে পড়ে পিঠের ওপর থেকে। যা দেখামাত্র পাখিপ্রেমিদের মন কাড়বে অনায়াসেই।

সুন্দরবন থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরত্বে শরণখোলা উপজেলার সাউথখালী ইউনিয়নের দক্ষিণ তাফালবাড়ী গ্রামের এই বকবাড়ি নিয়ে গত বছরের (২০২০ সালের) ১১ সেপ্টেম্বর কালের কণ্ঠের প্রথম পাতায় 'সুন্দরবন ছেড়ে তাফালবাড়ীতে' শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। সে বছর ওই বাড়িটির ৪০-৫০টি মেহগনি গাছে হলুদ ঠোঁট আর কালো পায়ের অসংখ্য বক দেখা যায়। কিন্তু এ বছর মেহগনি গাছ ছাড়াও চাম্বল, শিমুলসহ বিভিন্ন গাছে এই দুই প্রজাতির বকের দেখা মিলছে।

গত শুক্রবার (১৯ জুন) সরেজমিন ওই বকবাড়িতে গিয়ে নয়নাভিরাম দৃশ্য চোখে পড়ে। বিকেল তখন সাড়ে ৫টা। সারাদিন সুন্দরবনের চর এবং গ্রামের মাঠে-ঘাটে ঘুরে নিজেরা পেট পুরে খাবার খেয়ে বাচ্চাদের (ছানা) জন্যও খাবার সংগ্রহ করে ঝাঁকে ঝাঁকে বক উড়ে এসে বাসায় বসছে। আবার অনেক স্ত্রী বকদের বাসায় বসে ডিমে তা দিতে দেখা গেছে। অনেক বাসায় ছানা ফুটেছে। উড়তে শেখেনি এখনও, তবে শরীরে পালক গজিয়েছে বাচ্চাদের। স্ত্রী বক সেই বাচ্চাদের পাহারা দিচ্ছে বসে। নতুন বাসা তৈরি করতেও দেখা গেছে বকেদের। গাছে গাছে এই বকেরা ছড়াচ্ছে সাদা, শুভ্রতা।

তবে, এবার বকবাড়িতে শুধু বকই নয়, পানকৌড়ি ও বালিহাঁসও দেখতে পেয়েছেন বাড়ির লোকেরা। মান্নান হাওলাদারের বাড়ি ছাড়াও সফেজ খানের বাড়ি ও আশপাশের আরো বেশ কয়েকটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে সাদা বক, কানি বক ও বাদুড়। এ ছাড়া, সাউথখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে এবছর দেখা মিলছে নানা প্রজাতির পাখির। সুন্দরবনলাগোয়া এই এলাকাটি যেন পাখির অভয়াশ্রমে পরিণত হয়েছে। পাখিদের দেখতে প্রতিদিন লোকজনও যাচ্ছে এসব বাড়িতে।

বকবাড়ির মালিক আব্দুল মান্নান হাওলাদার জানান, ২০০৮ সালে তার বাড়ির একটি মেহগনি গাছে দুই জোড়া সাদা বক এসে বাসা বাঁধে। সেই বকের বাচ্চা থেকে এবং প্রতিবছর নতুন করে আরো বক আসতে আসতে এখন তার ও আশপাশের বাড়ি মিলিয়ে কয়েক শ বক থাকে। প্রতিবছর বৈশাখ মাস থেকে আসা শুরু করে। নতুন বাসা তৈরি, বাচ্চা ফুটিয়ে বড় করা এ নিয়ে আশ্বিন-কার্তিক মাস পর্যন্ত থাকে বকেরা। এর পর কোথায় যেন চলে যায়। চার-পাঁচ মাস পর আবার ফিরে আসে পুরনো স্থানে।

আব্দুল মান্নান এবং প্রতিবেশী সফেজ খান জানান, এ বছর নতুন আরেক প্রজাতির বক এসেছে। যা আগে কখনও দেখেননি তারা। ওই বক দেখতে খুবই সুন্দর। ডানা মেললে ময়ূরের মতো দেখায়। এ ছাড়া এবার একটি বালিহাঁস ও একটি পানকৌড়ি আসে এই বকের সাথে। তবে, তারা কদিন পর চলে যায়।

তারা জানান, পাখির কারণে তাদের বাড়ি-ঘর, পুকুরের পানি নোঙরা হয়। তারপরও তারা চান পাখিরা তাদের বাড়িতেই থাকুক। পাখিদের থাকার নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে পারলে আরো নতুন নতুন জাতের পাখি আসবে বলে তাদের ধারণা। এ ব্যাপারে সরকারি সহযোগিতা দাবি করেছেন তারা।

বক দেখতে আসা কলেজছাত্র শেখ নাজমুল, মেহেদী হাসান, রিয়াজ হোসেন জানান, মানসিক প্রশান্তির জন্য বকবাড়িতে তারা প্রায়ই আসেন। ঝাঁকে ঝাঁকে সাদা বকের দল যখন উড়ে এসে গাছের ডালে বসে তখন খুবই ভালো লাগে তাদের। বয়স্ক-শিশু সবাই আসে বক দেখতে। বকসহ সব ধরণের পাখি সংরক্ষণ ও নিরাপদ আবাস গড়ে তোলার দাবি এই শিক্ষার্থীদের।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জেলা কমিটির সদস্য ও শরণখোলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি ইসমাইল হোসেন লিটন বলেন, গ্রামগুলো সুন্দরবনের কাছে হওয়ায় এমনিতেই সারাবছর বিভিন্ন প্রজাতির পাখির আনাগোনা একটু বেশিই থাকে। বকসহ অন্য পাখিরা নিরাপদ মনে করেই এসব এলাকায় কলোনি গড়ে তুলেছে। তাই বছর ঘুরে আবার ফিরে আসে সেই এলাকায়।

বাপার এই প্রতিনিধি বলেন, পাখি বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এজন্য বনের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে যাতে কোনো প্রকার শিল্প, কল-কারখানা স্থাপন না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারকেও আন্তরিক হতে হবে। তাহলে শুধু বক কেন সবধরনের পাখির নিবাস গড়ে উঠবে বনসংলগ্ন এলাকায়।



সাতদিনের সেরা