kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

'আল্লায় অত্যাচারী মাস্টারের বিচার করতে পারে না?'

প্রধান শিক্ষকের মাছের ঘেরে দুর্বিষহ জীবন ১০ পরিবারের

কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি    

২২ জুন, ২০২১ ১৩:৫৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



'আল্লায় অত্যাচারী মাস্টারের বিচার করতে পারে না?'

একটি মাছের ঘেরের কারণে স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন পটুয়াখালীর কলাপাড়ার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের ফতেহপুর গ্রামের অর্ধশতাধিক মানুষ। এই ঘেরটি তৈরি করেছেন প্রধান শিক্ষক আবদুল লতিফ। ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের পানি এবং টানা বর্ষণের পানি নিষ্কাশনের অভাবে দরিদ্র পরিবারের ১০টি পুকুরের লক্ষাধিক টাকার মাছ মরে-পচে নষ্ট হয়ে গেছে। পার্শ্ববর্তী তালতলী উপজেলার দক্ষিণ ঝাড়াখালী মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল লতিফ সরকারি খাসজমিসহ নিজের জমিতে মাছের ঘের নির্মাণ করে স্থানীয় বাসিন্দাদের বসতবাড়ির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না করায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ পরিবারের মানুষগুলো। 

পানিবন্দি অবস্থায় বসবাসের ফলে উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের ফতেহপুর গ্রামের ১০টি প্রান্তিক জেলে পরিবারের বৃদ্ধ-শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের সদস্যরা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এর প্রতিকার চাইলে প্রধান শিক্ষক ভুক্তভোগীদের নানা হয়রানির পাশাপাশি সন্ত্রাসী বাহিনীর মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। 

সরেজমিনে দেখা গেছে, আন্ধারমানিক নদের তীরঘেঁষা ফতেহপুর গ্রাম রক্ষাকারী বেড়িবাঁধের বাইরের সরকারি খাসজমিতে ক্ষুদ্র কৃষকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের বসবাস। নদীর তীরে বসবাস করলেও এখানকার ১০টি পরিবারের মানুষ স্থায়ী জলাবদ্ধ হয়ে জীবনযাপন করছে। এসব বাসিন্দার বাড়ির পেছনের খাসজমিতে এবং প্রধান শিক্ষক রেকর্ডীয় প্রায় তিন একর জমিতে একটি মাছের ঘের নির্মাণ করেছেন। প্রতিবেশীদের বাড়ির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না করায় ভুক্তভোগী প্রান্তিক কৃষকদের বাড়ির উঠান পানিতে নিমজ্জিত হয়ে আছে। আবদ্ধ পানি দূষিত হয়ে পড়ায় পুকুরে অর্ধলাখ টাকার মাছ মরে গেছে। শৌচাগার ডুবে আছে। পুকুরের পানি দূষিত হওয়ায় নারী-পুরুষসহ সবাই বেড়িবাঁধের ভেতরের বাসিন্দাদের বাড়িতে গিয়ে রান্না-বান্না, গোসলসহ প্রয়োজনীয় কাজ করছেন। 

ভুক্তভোগী মো. দুলাল বয়াতী বলেন, আমরা এখানে সরকারি খাসজমি বন্দোবস্ত পেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করে আসছি। আশির দশকে সরকারি জমি বন্দোবস্ত পাওয়া এক ব্যক্তির কাছ থেকে জমি ক্রয় করেন প্রধান শিক্ষকের পিতা এনায়েত হোসেন। সেই জমি বিএস জরিপে মাত্র ৯০ শতাংশ জমি রেকর্ড হয় তাদের নামে। তবে প্রধান শিক্ষক আবদুল লতিফ তাদের রেকর্ডীয় জমির সঙ্গে সরকারি জমি দখল করে একটি বিশাল মাছের ঘের নির্মাণ করেন। তবে যখন তিনি মাছের ঘের নির্মাণ করেন, তখন আমাদের বসতবাড়ির পানি নিষ্কাশনের প্রতিশ্রুতি দেন। ঘূর্ণিঝড় ইয়াসে জোয়ারের পানি এবং টানা বর্ষার পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না করায় আমরা ১০টি পরিবারের অর্ধশতাধিক মানুষ স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছি। আমরা প্রশাসনের সহায়তায় জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষার দাবি করছি। 

মো. সজিব দাবি করেন, পানিতে ডুবিয়ে আমাদের শাস্তি দিয়েও প্রধানশিক্ষক ক্ষান্ত হননি। তিনি আমাদের দাবিয়ে রাখতে এবং আমাদের কণ্ঠ রোধ করার জন্য স্থানীয় একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ লালন-পালন করছেন। 

ডায়রিয়ায় আক্রান্ত মোসা. খাদিজা বেগম বলেন, বাড়িতে পানি স্থায়ী হওয়ায়  তিন দিন ধরে আমার ডায়রিয়া চলছে। এখন শ্বাসকষ্ট এবং শরীরও খুব দুর্বলহয়ে পড়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে বৃদ্ধ ও শিশুরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। মোসা. মালেকা বেগম বলেন, আমরা এখন আর আমাদের ঘরে রান্নাবান্নার কাজ করতে পারছি না। বেড়িবাঁধের ভেতরের বাসিন্দাদের বাড়িতে গিয়ে গোসল, বাথরুম এবং রান্নার কাজ করছি। আমাদের পানিতে ডুবিয়ে খুব কষ্ট দিচ্ছে লতিফ মাস্টার। আল্লায় ওর বিচার করতে পারে না? প্রশাসনের কাছে দাবি, অত্যাচারী মাস্টারের বিচার হোক।  

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক আবদুল লতিফের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি উল্টো স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানান। 

নীলগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন মাহমুদ বলেন, এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য আবদুর রব হাওলাদারসহ স্থানীয় অন্য গণ্যমান্যদের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছি, যাতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা পায়।



সাতদিনের সেরা