kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩০ জুলাই ২০২১। ১৯ জিলহজ ১৪৪২

বগুড়ার শেরপুরে দুস্থদের ভাতার টাকা গায়েব

বয়স্ক ভাতাভোগী দবির উদ্দিন, টাকা তুললেন জুরান আলী

শেরপুর (বগুড়া) প্রতিনিধি   

১৮ জুন, ২০২১ ২১:০৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বয়স্ক ভাতাভোগী দবির উদ্দিন, টাকা তুললেন জুরান আলী

সত্তর বছর বয়সের বৃদ্ধ দবির উদ্দীন। তিন বছর আগে বয়স্ক ভাতা ভোগীর তালিকায় নাম ওঠে তাঁর। এরপর থেকে অন্তত ৩০ মাস ভাতার টাকাও উত্তোলন করেছেন। কিন্তু বিগত ছয়-সাত মাস ধরে বয়স্ক ভাতার কোনো টাকা পাচ্ছেন না। অথচ নিয়মিত ভাতাভোগীর তালিকায় নাম রয়েছে তার। এমনকি চলতি জুন মাসের শুরুতেই তিন হাজার টাকা ভাতা প্রাপ্তির ঘরে নাম থাকলেও কানাকড়িও পাননি ওই বৃদ্ধ। পরে খোঁজ নিয়ে জানা গেল ভাতাভোগী হলেন বৃদ্ধ দবির উদ্দিন, কিন্তু ভাতার টাকা তুলেছেন যুবক জুরান আলী।

শুধু এই বৃদ্ধই নয়, তাঁর মতো অনেকেই ভাতার টাকা পাননি। ডিজিটাল মারম্যাচে দরিদ্রদের জন্য সরকারের দেওয়া বিভিন্ন ভাতার টাকা এভাবেই গায়েব হয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে বগুড়ার শেরপুর উপজেলায়। বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার টাকা নয়ছয় ও নৈরাজ্য হলেও সংশ্লিষ্ট সমাজসেবা অফিসের কর্তাদের তেমন কোনো ভূমিকা নেই। এক্ষেত্রে তাদের করার কিছুই নেই বলে দাবি তাদের। কারণ মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে সরকারি এসব ভাতার টাকা সরাসরি সুবিধাভোগীর মোবাইল নম্বরে দেওয়া হচ্ছে। তাই ভুল মোবাইল নম্বরে টাকা গেলে আমরা কি করব। তবে ভুল মোবাইল নম্বরে টাকা যাওয়ার পেছনে স্থানীয় সমাজসেবা অফিসের কর্তারাই দায়ী। কেননা যেসব নম্বরে টাকা যাচ্ছে, সেসব নম্বরগুলো তারাই পাঠিয়েছেন।

উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, শেরপুর উপজেলায় মোট ভাতাভোগীর সংখ্যা সতের হাজার আট শ ৩৩ জন। এর মধ্যে বয়স্ক ভাতা পাচ্ছেন ১০ হাজার ৫৪ জন, বিধবা ভাতাভোগী রয়েছেন চার হাজার ১২১ জন ও প্রতিবন্ধি ভাতাভোগী তিন হাজার ৬৫৮ জন। বিগত সময়ে ব্যাংকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এসব টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এতে করে সীমাহীন ভোগান্তির শিকার হন ভাতাভোগীরা। তাই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সরকারি সব ভাতার টাকা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে সরাসরি সুবিধাভোগীর মোবাইল নম্বরে পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতিমাস পাঁচ শ টাকা হিসেবে ছয় মাসের বয়স্কভাতার মোট তিন হাজার টাকা সুবিধাভোগীর মোবাইল নম্বরে একযোগে পাঠানো হয়। একইভাবে বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার টাকাও বিতরণ করা হয়েছে বলে সূত্রটি জানায়। কিন্তু পাঠানো এসব টাকার সিংহভাগ গায়েব হয়ে যাওয়ায় কোনো টাকাই পাননি ভাতাভোগীরা।

উপজেলার শাহবন্দেগী ইউনিয়নের সাধুবাড়ী গ্রামের ভুক্তভোগী বৃদ্ধ দবির উদ্দিন অভিযোগ করে বলেন, বিগত ছয়মাসের বয়স্কভাতার কোনো টাকা পাইনি। মোবাইল নাম্বারে টাকা আসবে, তাই আমার মোবাইল নাম্বার সঠিকভাবেই দিয়েছিলাম। কিন্তু কোনো টাকা আসেনি। তাই উপজেলা সমাজসেবা অফিসে বার বার ধর্ণা দিয়েও কোনো ফল পাইনি।

তবে অফিসের স্যাররা জানান, আপনার টাকা জুরান আলী নামে এক ব্যক্তির মোবাইল নাম্বারে চলে গেছে। অতএব তার সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এরপর জুরান আলীর সঙ্গে কথা বললে সে টাকা উত্তোলন করার কথা স্বীকার করলেও খরচ হয়ে যাওয়ায় টাকা দিতে অপরাগতা জানিয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই বৃদ্ধ।

একই অভিযোগ করেন উপজেলার উচ্চরং গ্রামের বয়স্কভাতাভোগী মো. মকবুল হোসেন, ছিয়াতুন বিবি ও জামেনা বিবি।

এসব ভুক্তভোগীর অভিযোগ, এবারের কোনো ভাতার টাকা পাননি তারা। অথচ টাকা বিতরণের ঘরে তাদের রয়েছে। তাই স্থানীয় সমাজসেবা অফিসে যোগাযোগ করা হলে ভুল মোবাইল নম্বরে তাদের ভাতার টাকা চলে গেছে। তাই এসব টাকার কোনো হদিস পাচ্ছেন বলেও অফিসের কর্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়।

মনোয়ারা বেগম নামের এক বিধবা ভাতাভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শুনেছি আমাদের ভাতার টাকা বলে গায়েব হয়ে গেছে। তাদের ভাতার টাকা জিন-ভূত নিয়ে গেছে, তাই টাকা পাইনি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কুসুম্বী ইউনিয়নের একজন জনপ্রতিনিধি বলেন, তার জানামতে অন্তত দশজন ভাতাভোগী এবারে দেওয়া সরকারি ভাতার কোনো টাকা পাননি। বিভিন্ন দপ্তরে বার বার ধরনা দিয়েও টাকা না পেয়ে অনেকেই মানবেতর জীবন-যাপন করছেন বলেও জানান তিনি।

জানতে চাইলে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. ওবায়দুল হক ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এটি শুধু এখানকার সমস্যা নয়। সারা দেশেই এটি হয়েছে। আমরা ভাতাভোগীদের যেসব নাম্বারে টাকা পাঠানোর জন্য দিয়েছিলাম। সেইসব নাম্বারে টাকা না দিয়ে ভুল নাম্বারে টাকা পাঠানো হয়েছে। তাই বিগত ছয়মাসের ভাতার টাকা অনেকেই পাননি বলে অভিযোগ পেয়েছেন। এক্ষেত্রে আমাদের কোনো অবহেলা বা দায়িত্বহীনতা নেই। এ ছাড়া ভুলবশত মোবাইলে টাকা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে দু-একজন ফেরত দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ময়নুল ইসলাম বলেন, এমনটি হওয়ার কথা নয়। ভুল হলে দু-একজনের ক্ষেত্রে হতে পারে কিন্তু বেশিরভাগ মোবাইল নম্বর ভুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে দাবি করেন তিনি।



সাতদিনের সেরা