kalerkantho

বুধবার । ১৩ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৮ জুলাই ২০২১। ১৭ জিলহজ ১৪৪২

অবৈধ বালুখেকোদের বালু অসহায়ের পাতে, পেটে, বিছানায়...

ঈশ্বরদী (পাবনা) প্রতিনিধি   

১৭ জুন, ২০২১ ১৭:০৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অবৈধ বালুখেকোদের বালু অসহায়ের পাতে, পেটে, বিছানায়...

যেন মরুভূমির মাঝে তাদের বাস

খাবার থালায় বালু, ভাতের পাতিলে বালু, পানির গ্লাসে বালু, পেটে বালু, চোখে বালু, বিছানায় বালু, বাড়ির উঠানে বালু, বাড়ির চারিপাশে বালু, দোকানপাটে বালু। আরদিকে শুধু বালু আর বালু। বালুই জীবন। বালুতেই অসহায়দের জীবন বন্দি। আবার এই বালুতে ফুলে ফেঁপে উঠছেন ব্যবসায়ীরা। হয়েছেন চরম প্রভাবশালী। সঙ্গে জনপ্রতিনিধিও। বাদ পড়ছে না প্রশাসনও। মরুভূমি না হলেও সেখঅনে সুবিশাল বালুর পাহাড়।

বালুর পর্বত বেষ্টনিতে রয়েছে অসহায় কয়েকশত পরিবারের কয়েক হাজার মানুষ। কিছুই বলার নেই। কারণ সবাই বালুর সঙ্গে যুক্ত। পদ্মানদী থেকে অবৈধভাবে উত্তোলন হচ্ছে বালু। রাখা হচ্ছে সরকারি খাস জমি ও রেলওয়ের জমিতে। সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে বিক্রয় করা হচ্ছে বালু। সেখানে সরকার নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ও দুস্থ অসহায় মানুষের বসবাসের জন্য নির্মাণ করেছে গুচ্ছগ্রাম। সেখানে সুবিধাবঞ্চিত অসহায় কয়েক হাজার মানুষের বাস। বালুখাদকদের নিকট অসহায় এসব মানুষ। প্রতিবাদ তো দূরের কথা, কোনরকম টু শব্দ করার সুযোগও নেই। মুখ ফুটে কিছু বললেই দুর্বলের প্রতি প্রভাবশালী বালু খাদকদের চরম নির্যাতন শুরু হয়। এটা পদ্মানদীর তীরবর্তী ঈশ্বরদী উপজেলার সাঁড়া ইউনিয়নের সাঁড়া ঝাউদিয়া, মাঝদিয়া, ইসলামপাড়া ও চানমারী এলাকার যুগের পর যুগের চিত্র। 

এই চিত্র শেষ হবার নয়। এটা এই এলাকার মানুষের জীবনের চরম অভিশপ হয়ে রয়েছে। লঙ্ঘিত হচ্ছে মানুষের অধিকার। প্রভাবশালীদের কারো কাছে ভাগের টাকা পৌঁছায় রাতে, কারও কাছে দিনের আলোয় অফিসে। আবার কারও টাকা পৌঁছানোর পরিকল্পনা ঠিক হয় একান্ত আলাপনে। অবৈধভাবে পদ্মানদী থেকে বালু উত্তোলন ও অবৈধভাবে সরকারি জমি দখল করে বালু রেখে ব্যবসা করায় সরকার প্রতিবছর রাজস্ব হারাচ্ছে কয়েক কোটি টাকা। এটাই পদ্মানদীর তীরবর্তী বালু মহাল ঘিরে যুগ যুগের বাস্তব চিত্রটা এমনই। 
 
তাই মানবিক দিক বিবেচনা করে ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পিএম ইমরুল কায়েস বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ও সরকারি খাসজমি বালুখাদকদের নিকট থেকে উদ্ধারের জন্য সরেজমিনে ইউনিয়ন উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তাকে (তহশিলদার) নির্দেশ দিয়েছেন। আর বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন রেলওয়ে পাকশী বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা (ডিইও) মোহম্মাদ নুরুজ্জামান। 

বিগত কয়েকদিন পদ্মানদীর তীরবর্তি ঈশ্বরদী উপজেলার সাঁড়া ইউনিয়নের সাঁড়া ঝাউদিয়া, মাঝদিয়া, ইসলামপাড়া ও চানমারী এলাকায় ঘুরে এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বললে বেরিয়ে আসে নানা কষ্টের, অসহায়ত্বের ও নির্যাতনের বাস্তবগল্প। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা ও দুস্থ-অসহায় মানুষরা জানান, আমাদের ঘরে এসে দেখেন। আমরা কীভাবে বসবাস করি, কীভাবে খাবার খাই। পরীক্ষা করে দেখেন আমাদের পেটে কতো বালু। খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন কতো শিশুসহ মানুষের চোখ বালু কণায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাড়ির চারদিকে বালুর বিশাল বিশাল স্তুপ করে রাখা হয়েছে। একটু বাতাস হলেই এলাকায় মরুভূমির মতো বালু ঝড় হয়ে যায়। বালুতে সব ঢেকে যায়। বালুর কারণে এলাকায় সবজি ও ফলের ফলন কমে গেছে। দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টা বালুর গাড়ির চলাফেরা। সব মিলিয়ে বালুর মধ্যেই তাদের অমানবিক জীবনযাপন। 

ভুক্তভোগীরা জানান, তারা খুবই গরীব, দুস্থ, অসহায়। তাদের কেউ পদ্মানদী ভাঙনে শিকার হয়ে এই গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা হয়েছেন। আবার কেউ রেলওয়ের নিকট থেকে জমি লিজ নিয়ে বসতি গড়ে তুলেছেন। তবে সরকারি জমিতে অবৈধভাবে দখল করে তাদের ঘর-বাড়ির চারপাশজুড়ে কোটি কোটি টাকার বালু পদ্মানদী থেকে উত্তোলন করে বিশাল বিশাল পাহাড়ের সমান স্তুপ করে ব্যবসা করে যাচ্ছেন এলাকার ২৫/৩০ জন বালুখাদক। এসব প্রভাবশালী বালুখেকোরা আজ কোটি কোটি টাকার মালিক। তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার বা প্রতিবাদ করার ক্ষমতা গুচ্ছগ্রামের মানুষের নেই। তাই তাদের বিচার সৃষ্টিকর্তার কাছে। কষ্টের কথা বলতে গিয়ে অনেকের কণ্ঠ কান্নায় জড়িয়ে আসে। চোখ ভিজে যায়। 

রেলওয়ে পাকশী বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা (ডিইও) কার্যালয় সূত্রমতে, ঈশ্বরদীর সাঁড়া ইউনিয়নের সাঁড়া ঝাউদিয়া, ইসলামপাড়া, মাঝদিয়া, চানমারিঘাট এলাকায় রেলওয়ের একশত ৫০ একর জমি রয়েছে। এর পুরোটায় অবৈধভাবে বালুখাদকরা দখল করে ব্যবসা করছেন। দীর্ঘ কয়েক দশক আগে কেউ কেউ রেলওয়ে থেকে কিছু জমি কৃষি হিসেবে এককালীন লিজ নিয়েছেন। এরপর আর তারা খাজনা দেননি। কারণ বালু খাদকরা তাদের জমি অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছেন। রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি কার্যালয়ের জনবল সংকটে ও কর্মকর্তাদের সঠিক ভূমিকার অভাবে সেখান থেকে প্রতি বছরে কয়েক কোটি টাকা সরকারি রাজস্ব আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। 

পদ্মানদীর তীরস্থ সাঁড়া ঝাউদিয়া ও চানমারী ঘাটের বালু ব্যবসায়ী জাকির হোসেন জানান, কিছু ব্যক্তিগত ও কিছু রেলওয়ে জমিতে বালু রেখে ব্যবসা করা হচ্ছে। বাতাস হলে বালু উড়বে এটা স্বাভাবিক ব্যপার। এতে কিছুটা সমস্যা হতেই পারে। এটা সবাই মেনে নিয়েছে বলে দাবি করেন এই বৃহৎ বালু ব্যবসায়ী।

বালু ব্যবসায়ী মারুপ জানান, গুচ্ছগ্রামের চারপাশে রাখা বালুতে একটু সমস্যা হতেই পারে। নদীর পাড়ে (নিচে) রাখা বালুতে তেমন একটা অসুবিধা হয় না। পরিবেশের কিছুটা ক্ষতি হচ্ছে স্বীকার করে তিনি আরো জানান, এই বালু মহালের কোনো ব্যবসায়ীর পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেই।

বালু ব্যবসায়ী সিরাজ আলী জানান, এই বালু মহালে ২০/২৫ জন পজিশন দখল করে ব্যবসা করছেন। প্রশাসন, রেলওয়ে ও নেতাদের সঙ্গে 'সিস্টেম' করেই এই ব্যবসা করা হচ্ছে বলে দাবি করেন এই ব্যবসায়ী। 

পাকশী রেলওয়ে বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা (ডিইও) মোহাম্মাদ নুরুজ্জামান জানান, রেলওয়ের জায়গা অবৈধভাবে দখল করে বালু রেখে ব্যবসা করা হচ্ছে বলে খবর পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।

ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পিএম ইমরুল কায়েস জানান, ব্যক্তিগত কিংবা রেলওয়ের জমিতে কেউ বালু রেখে ব্যবসা করলে প্রশাসনের কিছু করার নেই। তবে সেখানে বেশ কিছু সরকারি খাসজমি রয়েছে, যা বালু ব্যবসায়ীরা দখল করে বালু রেখে ব্যবসা করছেন। বালু ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সরকারি খাস জমি উদ্ধার করতে সরেজমিনে জরিপ করার জন্য সাঁড়া ভূমি অফিসকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে সেখানে বসবাসরত মানুষের অসুবিধার বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবেন বলেও আশ্বাস দেন ইউএনও। 



সাতদিনের সেরা