kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩ আগস্ট ২০২১। ২৩ জিলহজ ১৪৪২

তাড়াশের নওগাঁ হাট

অতিরিক্ত টাকা আদায় করছেন ইজারাদার, ভাগ পাচ্ছেন অনেকে

সনাতন দাশ, তাড়াশ-রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ)   

১৪ জুন, ২০২১ ১৬:৩৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অতিরিক্ত টাকা আদায় করছেন ইজারাদার, ভাগ পাচ্ছেন অনেকে

সিরাজগঞ্জের বৃহত্তম হাটগুলোর মধ্যে তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ হাট অন্যতম। প্রসিদ্ধ এ হাট থেকে সরকার প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে। সে অনুযায়ী চলতি বছরে ভ্যাটসহ তিন কোটি ৫০ লাখ টাকায় আকবর আলী নামের জনৈক ব্যক্তি এক বছরের জন্য টোল আদায়ের ইজারা নেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ইজারা নিয়েই শুরু করেছেন অতিরিক্ত টোল আদায়। এমনকি হাট পেরিফেরির বাইরে নিজস্ব ঘরে যারা ব্যবসা করেন, তাদের কাছেও টোল দাবি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে করে সংক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা প্রতিকার চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর আবেদন করেছেন।

উপজেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৪ মে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওই ইজাদারকে কোন আইন বলে হাট পেরিফেরির বাইরে টোল দাবি করছেন এ বিষয়ে কারণ দর্শানো নোটিশ দিয়েছেন।

সূত্র জানায়, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, উল্লাপাড়া, পাবনার ভাংগুড়া, চাটমোহর ও নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী করতোয়া নদীর তীরে নওগাঁ হাট অবস্থিত। সড়ক ও নৌপথে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির কারণে এখানে পাঁচ উপজেলার হাজার হাজার মানুষ বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক নওগাঁ হাটে কেনাবেচা ও ব্যবসার জন্য আসেন।

সরেজমিনে গত ১০ জুন (বৃহস্পতিবার) নওগাঁ হাট ঘুরে দেখা যায়, হাট পেরিফেরির বাইরে নওগাঁ জিন্দানী কলেজ মাঠেও বসেছে গরু-ছাগল, কাঠের আসবাবপত্র ও মাছ ধরার চাঁইয়ের হাট। এই কলেজ চত্বরে রয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম গেরিলা বাহিনী পলাশডাঙ্গা যুবশিবিরের দর্শনীয় স্মৃতিস্তম্ভ ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। সেসব স্মৃতিচিহ্ণ অপবিত্র করে হরদম চলছে গরু-ছাগল কেনাবেচা। অথচ সরকারি প্রবিধানমতে স্কুল-কলেজ মাঠে হাট লাগানো সম্পূর্ণ বেআইনি। হাটের কোথাও টোল চার্ট (মূল্যতালিকা) টাঙানো হয়নি।

এ প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহম্মদ বলেন, ১২৫ ধরনের দ্রব্য কেনাবেচার জন্য টোল নির্ধারণ করা হয়েছে। তা পুরনো হওয়ায় নতুন করে মূল্যতালিকা প্রণয়নের কাজ চলছে। বর্তমান মূল্যতালিকায় প্রতিটি গরু ও মহিষ সর্বোচ্চ ২৫০ টাকা, প্রতিটি ছাগল ও ভেড়া ৫০ টাকা টোল নির্ধারণ করা হয়েছে। গবাদি পশুর ক্ষেত্রে ক্রেতা শুধু টোল দেবেন। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তিনি সার্বক্ষণিক তদারকি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ব্যবস্থা নেবেন।

কিন্তু এ হাটে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্নচিত্র। একটি গরু কিনতে ক্রেতার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আর বিক্রেতার কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ১০০ টাকা। ছাগল ও ভেড়ার ক্ষেত্রে ক্রেতার কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ২৫০-৩০০ টাকা, বিক্রেতার কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ৫০ টাকা। ক্রেতাকে যে রশিদ দেওয়া হচ্ছে তাতে টাকার অঙ্ক না লিখে লেখা হচ্ছে পরিশোধ। যা সম্পূর্ণ বেআইনি। এ ছাড়া অন্যান্য পণ্য কেনাবেচার ক্ষেত্রেও কোনো প্রকার নিয়ম মানা হচ্ছে না। ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের কাছেই টোল আদায় করা হচ্ছে মর্মে ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন খন্দকার বলেন, নওগাঁ হাটে অনেক কাস্টমার আসে না অতিরিক্ত খাজনার ভয়ে। এভাবেই একসময়ের প্রসিদ্ধ মির্জাপুর ও প্রতাপহাট ধ্বংস হয়ে গেছে।

তাড়াশ বাজারের আব্দুল আউয়াল বলেন, আমি তিনটা হাঁস বিক্রি করেছি। খাজনা নিয়েছে ৩০ টাকা। আরেক ক্রেতা লাবু সরকার বলেন, ৩০ টাকা দিয়ে একটি তরলা বাঁশ কিনেছি, খাজনা নিয়েছে ১০ টাকা।

হাটে ডিজিটাল মাপের পরিবর্তে  অনেক জায়গায় শলার দাঁড়ি-পাল্লায় মালামাল পরিমাপ করতে দেখা গেছে। নিম্নমানের খোলা ভোজ্য তেল, পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য বিধ্বংসী পলিথিন ও কারেন্ট জাল ওপেন বিক্রি করতে দেখা গেছে।

হাট পেরিফেরির বাইরে স্থায়ী ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম, জসমত আরী, সিরাজুল হক, ইনছাব আলী, আসাদুল হকসহ অনেকের অভিযোগ, চলতি বছর হাটের ইজারাদার তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের বার্ষিক টোল দাবি করে তাদের বারবার তাগাদা দিচ্ছেন। অথচ হাটের ইজারাদারের হাট পেরিফেরির বাইরে টোল আদায় করার কোনো এখতিয়ার নেই।

তবে ইজারাদার আকবর আলী দাবি করেন, বহু বছর ধরেই হাটের ইজারাদাররা ওই সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে তাদের সাথে আলোচনা করেই বার্ষিক একটা অঙ্কের টোল ধার্য করে তা আদায় করে আসছেন। সে অনুযায়ী তিনি টোল চেয়েছেন। অতিরিক্ত টোল আদায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের লোকজনকে ম্যানেজ করেই টোল আদায় করছি। তাদেরকে শেয়ারও দিয়েছি। এ কারণে কেউ কিছু করতে পারবে না। ক্ষমতাসীন দলের কে কে রয়েছেন জানতে চাইলে আকবর আলী বলেন, এমপির ভাই উকিল (অ্যাড. মো. নূরুল ইসলাম) এ হাটের সভাপতি।

নওগাঁ জিন্দানী ডিগ্রি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. আবুল কাশেম বলেন, কলেজ মাঠে হাট লাগানোর জন্য কেউ অনুমতি নেয়নি। আগেও টুকটাক হাট বসেছে। তা ছাড়া স্থানীয় প্রভাবে অনেক কিছুই বলা যায় না।

তাড়াশের নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মেজবাউল করিম বলেন, একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। করোনার জন্য কলেজ বন্ধ থাকায় সাময়িকভাবে সেখানে হাট লাগানো হয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে অনিয়মগুলো খতিয়ে দেখা হবে।



সাতদিনের সেরা