kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

মোহনগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরিতে অনিয়মের অভিযোগ

হাওরাঞ্চল প্রতিনিধি    

১৩ জুন, ২০২১ ১১:২৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মোহনগঞ্জে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরিতে অনিয়মের অভিযোগ

নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে চলতি বোরো মৌসুমে আকস্মিক গরম, ঝোড়ো হাওয়া ও শিলাবৃষ্টিতে অধিক ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারিভাবে দেওয়া আর্থিক সহায়তার তালিকা প্রণয়নে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে তৈরি তালিকাটিতে এলাকার প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের নাম অন্তর্ভুক্ত না করে কৃষিকাজে জড়িত নয় বা হাওরে কোনো জমিই নেই- এমন লোকজনের নামই তাতে অন্তর্ভুক্ত করায় এলাকার প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নামসহ তাঁদের স্বজনদের নামেই ওই তালিকায় বেশি রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার গাগলাজুর ইউনিয়নের ৪-৫ ও ৬ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী সদস্য ডলি খানমের হাওরে কোনো জমি নেই। তা সত্ত্বেও তিনি তাঁর নাম ও তাঁর পরিবারের চারজনের নাম ওই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তাঁরা কেউই কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত  নন।

উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে গত ৪ এপ্রিল তাপপ্রবাহ, ঝড়ো হাওয়া ও শিলাবৃষ্টিতে এলাকার কৃষকদের কাঁচা ও আধা পাকা ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ জন্য সরকারিভাবে এ উপজেলায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত ১১০০ কৃষকের বিপরীতে সাড়ে ২৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। আর তালিকাভুক্ত প্রত্যেক ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনের বিকাশ অথবা নগদ নম্বরে সরাসরি ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়ার কথা রয়েছে। 

এরই মধ্যে উপজেলার গাগলাজুর ইউনিয়নে ১৯০ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের নাম ওই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু ওই ইউনিয়নের ৪-৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য ডলি খানম ও তাঁর আপন দুই ছোট ভাই জুয়েল খান, রাসেল খান ও ছোট বোনের স্বামী মফুজ মিয়ার নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে টাকা উত্তোলন করেন। তাঁর ছোট দুই ভাই প্রায় ১০ বছর ধরে ঢাকায় পোশাক কারখানায়  কাজ করছেন। আর ছোট বোনের স্বামী মফুজ মিয়া গাগলাজুর বাজারে পোলট্রি মোরগের ব্যবসা করে আসছেন। শুধু তিনি একাই নন ওই ইউনিয়নের প্রায় সব ইউপি সদস্যই ওই তালিকায় নিজেদের নামসহ আত্মীয়-স্বজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন বলেও জানা গেছে।

উপজেলার গাগলাজুর ইউনিয়নের মান্দারবাড়ি গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক রানা মিয়া, চাঁনপুর গ্রামের কৃষক জহিরুল ইসলাম, হুমায়ুন মিয়া ও শাখাওয়াত হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'আমরা এলাকার প্রকৃত কৃষক। কৃষির ওপর নির্ভর করেই আমাদের সংসার চলে। কিন্তু চলতি বোরো মৌসুমে পরপর দুই দফায় গরম হাওয়া ও শিলাবৃষ্টিতে আমাদের বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এ ক্ষতি আমরা কোনোভাবে পুষিয়ে উঠতে পারবনা। তাঁরা আরো বলেন, আমাদের জমির ধান গরম হাওয়ায় ও শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতি হওয়ার পরদিনই আমরা জমি থেকে ক্ষতিগ্রস্ত ধান কেটে আঁটি বেঁধে তা উপজেলা কৃষি অফিসে নিয়ে যাই এবং তাঁরা আমাদের নামও লিখে রাখেন। এখন শুনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকায় আমাদের কোনো নাম নেই। যারা কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত না তাদের নাম ও মেম্বারসহ তাদের আত্মীয়-স্বজনের নাম তালিকায় দিয়েই আমাদের মতো ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ টাকা তারা উত্তোলন করে নিয়ে যাচ্ছে। তাই এ বিষয়টি এলাকায় এসে সঠিকভাবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।

এ বিষয়ে গাগলাজুর ইউপির ৪-৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্য মোসা.ডলি খানম নিজের দুই ভাই ও ভগ্নিপতির নাম ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের প্রণোদনার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা অনিয়ম হয়েছে বলে স্বীকার করে বলেন, তাঁরা যে একেবারে কৃষক নন তা নয়। আর অন্য একজন কৃষকের বিকাশ নম্বরে সমস্যা হওয়ায় আমার নিজের নামটি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আমার নামটি অনলাইন হয়নি এখনো।

ডলি খানম আরো বলেন, শুধু আমি একা নই, অন্য ইউপি সদস্যরাও এমনটি করেছেন বলে দাবি করেন তিনি।

গাগলাজুর ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা উপজেলা সহকারী  কৃষি কর্মকর্তা অলিউল্লাহ বলেন, 'গরম হাওয়া ও শিলাবৃষ্টিতে কৃষকের কাঁচা বোরো ধানের ক্ষতি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করি এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকাও সংগ্রহ করি। তবে ক্ষতিগ্রস্ত  কৃষকদেরকে সরকারিভাবে আর্থিক সহায়তার তালিকায় আমাদের প্রণীত তালিকার কোনো ধরনের মূল্যায়ন করা হয়নি। 

উপজেলার গাগলাজুর ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, 'ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনো নাম দেইনি। আমার ইউনিয়নে মাত্র ১৯০ জন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের নাম দেওয়া হয়েছে। সেগুলোর তালিকা দেওয়ার জন্য আমি মেম্বারদের মাঝে বণ্টন করে দিয়েছি। তবে কোনো মেম্বার যদি তালিকায় অনিয়ম করে থাকেন সেটি খুবই দুঃখজনক। বিষয়টি আমি খোঁজ নিয়ে দেখব।  

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, 'আমি এ কর্মস্থলে সদ্য যোগ দিয়েছি। ওই তালিকা সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই। তবে অনিয়মের বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখব।'  

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান বলেন, 'ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকায় অনিয়মের বিষয়টি নিয়ে আমি বারবারই স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক করেছি। এর পরও যদি তালিকায় অনিয়ম হয়ে থাকে তবে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'



সাতদিনের সেরা