kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

ইউপি চেয়ারম্যানের ক্ষমতার দাপট!

কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি    

১৩ জুন, ২০২১ ১০:৪৯ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইউপি চেয়ারম্যানের ক্ষমতার দাপট!

ইউপি চেয়ারম্যান মাসুক আহমদ

মাসুক আহমদ মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার ফুলতলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকও তিনি। এবার দলীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি অর্থে ফুলতলা চা বাগানের সংরক্ষিত এলাকায় জোর করে রাস্তা নির্মাণের চেষ্টা করছেন এই আওয়ামী লীগ নেতা। এতে চা শ্রমিকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম উত্তেজনা।

বাগানের সহস্রাধিক শ্রমিক স্বাক্ষরিত একটি অভিযোগ ও স্মারকলিপি বন, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রী শাহাব উদ্দিনের কাছে দিয়েছেন শ্রমিকরা। ক্ষমতাসীন দলের এই প্রভাবশালী নেতার অপকর্মের প্রতিকার চেয়ে গতকাল  শনিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করেন বাগানের বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্যে দেন বাগানের ব্যবস্থাপক তৌহিদুল ইসলাম, ইউপি সদস্য কাজল বাউরী, বাগান পঞ্চায়েত সভাপতি রবি বুনার্জী, চা শ্রমিক সামারু ব্যানার্জী, লালা শেট, কাঞ্চন ভর, সজল ব্যানার্জী প্রমুখ।

বক্তারা বলেন, ইউপি চেয়ারম্যান মাসুক আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা হওয়ায় কেউ তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায় না। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাগানসংলগ্ন হাড়ারগঞ্জ পাহাড়ে সংরক্ষিত ভূমি জবরদখল করেছেন। এরপর আদাবাড়ি এলাকায় লেবু, আনারস, কমলাসহ বিভিন্ন ফসলের বাগান করেছেন। সেই বাগানে যাতায়াতের সুবিধার জন্য বাগানের ভেতর দিয়ে সরকারি অর্থে রাস্তাটি নির্মাণ করতে চান। অথচ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় এখনো অসংখ্য কাঁচা রাস্তা রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, লেবু বাগানের পাশে সংরক্ষিত বন বিভাগের ছয় শতাধিক মূল্যবান সেগুনগাছ রয়েছে। রাস্তাটি হলে সেখানকার গাছগুলো পাচারে পরিবহন সুবিধার কথা বিবেচনা করেই রাস্তাটি নিজের ক্ষমতা খাটিয়ে করতে চান বলে জানা গেছে। যদি এমন অসৎ উদ্দেশ্য না হতো, তাহলে খাসিয়া পানপুঞ্জি হয়ে লেবু বাগানে যাওয়ার রাস্তাটি করলে খাসিয়ারাও উপকৃত হতো। 

 
কুলাউড়া : চা শ্রমিকরা গতকাল শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে ইউপি চেয়ারম্যানের অপকর্মের চিত্র তুলে ধরেন। ছবি : কালের কণ্ঠ

চা শ্রমিকরা জানান, বাগানের ভেতর দিয়ে রাস্তা হলে বাগানের অনেক ক্ষতি হবে। ইউনিয়ন পরিষদের রাস্তাটি সাধারণ মানুষের কোনো উপকারে আসবে না। শুধু  হাড়ারগঞ্জ সংরক্ষিত বনভূমি থেকে অবৈধ উপায়ে বনের মূল্যেবান গাছ কেটে বনটি উজাড় করার জন্যই রাস্তাটি নির্মাণ করতে চান মাসুক আহমদ। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে শ্রমিকরা আন্দোলনে নেমেছেন। 

সরেজমিনে নির্মাণাধীন রাস্তা পরিদর্শনে ফুলতলা চা বাগানে গেলে শত শত শ্রমিক রাস্তা নিয়ে তাঁদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। শ্রমিকদের পক্ষে সর্দার বাসু দেব চাষা, ৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক পঞ্চায়েত সভাপতি লালা শেঠ, বর্তমান পঞ্চায়েত সভাপতি রবি বুনার্জি, সেক্রেটারি দিপচান গোয়ালা, সাবিত্রী চাষা জানান, বাগানের সংরক্ষিত এলাকা ২২ সেকশনে হঠাৎ করে গত ২৫ মে ইট ও বালু ফেলা শুরু করেন। বাগান শ্রমিকরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, ফুলতলা ইউনিয়ন পরিষদ  চেয়ারম্যান সেকশনের ভেতর দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করতে এগুলো ফেলেছেন। অথচ সেকশনের ভেতর দিয়ে শ্রমিকরা পাতা তুলতে হাঁটাচলার রাস্তা আছে। তিনি সেটিকে ৮ ফুট প্রশস্ত করে রাস্তা নির্মাণ করতে গেলে বাগান কর্তৃপক্ষ ও শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত বাগান কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে গত ৮ জুন রাস্তা প্রশস্তকরণ ও নির্মাণকাজ শুরু করলে শ্রমিকরা তাতে বাধা দেন। ফলে বাধ্য হয়ে চেয়ারম্যানের লোকজন কাজ বন্ধ করে দেন।

জানা যায়, চেয়ারম্যান মাসুক আহমদ ব্যক্তিগত স্বার্থে বন বিভাগের দখল করা লেবু বাগানে যাতায়াতের সুবিধার্থে ক্ষমতার অপব্যবহার করে মৌলভীবাজারের জেলা পরিষদের একটি প্রকল্পের আওতায় ইতিপূর্বে রাস্তা  নির্মাণের নামে কিছু স্থানে ইট বিছানোর কাজ হয়। সম্প্রতি ইউপি কার্যালয় স্থানীয় সরকার সহায়তা প্রকল্পের (এলজিএসপি) আওতায় রাস্তা করার উদ্যোগ নেন তিনি। এ দুটি প্রকল্প ছাড়াও সেখানে প্রায় দুই কিলোমিটার পল্লী  বিদ্যুতের লাইন টেনে সংযোগ দিয়েছেন। পাহারাদারের ঘরে সরকারি বরাদ্দের একাধিক সোলার প্যানেল লাগিয়েছেন। গভীর নলকূপ স্থাপন ও সরকারি অর্থে একাধিক ব্রিজ নির্মাণ করেছেন। এ ছাড়া বাগানের বিরুদ্ধে তিনি জনমত গঠনের লক্ষ্যে গত ১০ জুন ফুলতলা বাজারে একটি প্রতিবাদ সমাবেশ করেন।

এদিকে, গত ১১ জুন (শুক্রবার) বন, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রী শাহাব উদ্দিন এমপি নিজ নির্বাচনী এলাকা বড়লেখায় সরকারি সফরে এলে বাগানের শ্রমিকরা তাঁর কাছে ফুলতলা ও এলবিন টিলা বাগানের সহস্রাধিক শ্রমিক স্বাক্ষরিত একটি অভিযোগ ও স্মারকলিপি সরাসরি মন্ত্রীর হাতে তুলে দেন। এ সময় মন্ত্রী উপস্থিত শ্রমিকদের বক্তব্য শোনেন ও বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে সমাধানের আশ্বাস দেন। তার পরও উদ্বিগ্ন শ্রমিকরা সংবাদ সম্মেলন করে সাংবাদিকদের বিষয়টি অবগত করেন।

ফুলতলা চা বাগানের ব্যবস্থাপক তৌহিদুল ইসলাম শনিবার বিকেল সাড়ে ৫টায় মুঠোফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, বাগানের সংরক্ষিত এলাকা দিয়ে রাস্তা করতে হলে অবশ্যই বাগানের সম্মতি নিতে হয়। কিন্তু চেয়ারম্যান বাগানকে অবগত না করে, চা গাছ বিনষ্ট করে জোরপূর্বক রাস্তা নির্মাণ করতে চাইলে বাগানের শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে কাজে বাধা দেন। ২০১০ সালে চেয়ারম্যান বাগান ও  বন বিভাগের জায়গা জবরদখল করে এই লেবু বাগান করেন। পরে জেলা, উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ও দলীয় নেতারা বসে বিষয়টি নিষ্পত্তি করেন। সে সময় চেয়ারম্যান বাগানের জায়গা ছেড়ে দেন এবং পরবর্তী সময়ে কোনো দাবি না করার শর্তে লিখিত দেন।

ফুলতলা ইউপি চেয়ারম্যান ও জুড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাসুক আহমদ মুঠোফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, 'বাগানের ভেতর জেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রায় ১৫০০ ফুট রাস্তা করা হয়েছে। রাস্তাটির কাজ হলে শুধু তাঁর ফলবাগানের নয়, চা-বাগানের শ্রমিকদেরও চলাচলের সুবিধা হতো। এ ছাড়া স্থানীয় কয়েকটি পুঞ্জির প্রায় আড়াই শ উপজাতি পরিবার এই রাস্তা দিয়ে চলাচল করছে। নিজের ব্যক্তিস্বার্থে এবং সংরক্ষিত বন থেকে সেগুনগাছ পরিবহনের সুবিধার্থে রাস্তাটি নির্মাণ করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ওই এলাকায় নূরপুর মৌজায় আমার মালিকানাধীন ৭৩ একর জায়গায় বিভিন্ন ফসলের বাগান করেছি। আমি সরকারকে নিয়মিত রাজস্ব দিয়ে আসছি। কিন্তু নির্বাচন সামনে রেখে আমার প্রতিপক্ষ বিষয়টি নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। 

জুড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সঞ্জয় চক্রবর্তী জানান, তিনি ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। এটা ছাড়া রাস্তা করার অনেক বিকল্প সুযোগ রয়েছে। বাগানের সংরক্ষিত এলাকা দিয়ে রাস্তা করা তাদের (বাগানের) নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তার পরও উভয় পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল ইমরান রুহুল ইসলাম মুঠোফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, 'বাগানের ভেতর রাস্তাটি এলজিইডির আওতাভুক্ত। এ ব্যাপারে উভয় পক্ষকে নিয়ে রবিবার আমার কার্যালয়ে একটি বৈঠক ডাকা হয়েছে। আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি স্থায়ী সমাধান করা হবে।'



সাতদিনের সেরা