kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৯ জুলাই ২০২১। ১৮ জিলহজ ১৪৪২

খীরু নদীর পানি এতই কালো, দেখলে মনে হয় পোড়া মবিল!

ভালুকা (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি   

১১ জুন, ২০২১ ০৯:৫৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



খীরু নদীর পানি এতই কালো, দেখলে মনে হয় পোড়া মবিল!

শিল্পবর্জ্যে পোড়া মবিলের রূপ নিয়েছে খীরু নদীর পানি। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘খীরু নদীর পানি এতই কালো, দেখলে মনে হয় পোড়া মবিল। একসময় দুপুরের তপ্ত রোদে খীরু নদীর পাড়ে গাছের নিচে বসলে বাতাসে শরীর জুড়িয়ে ক্লান্তি দূর হয়ে যেত। আর এখন নদীর পাড়ে বসা তো দূরের কথা, নদীর পাড় দিয়ে হেঁটে গেলেও দুর্গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসে, বমি হওয়ার উপক্রম হয়। অথচ ছোটকালে এই নদীর পানিতে কত ডুব দিয়েছি, সাঁতার কেটেছি, মাছ ধরেছি তার হিসাব নেই। এখন এই নদীর পানি দেখলে ভয় লাগে।’ এভাবেই স্মৃতি হাতড়ে একবুক হতাশা নিয়ে ময়মনসিংহের ভালুকার খীরু নদীর অতীত ও বর্তমানের তুলনামূলক চিত্র বর্ণনা করছিলেন ওই নদীর পারে বাস করা ভালুকা উপজেলার রাজৈ ইউনিয়নের জামিরাপাড়া গ্রামের মো. আনিছুর রহমান বাদল নামের একজন শিক্ষক।

শিক্ষক মো. আনিছুর রহমান বাদলসহ রাজৈ ও পারুলদিয়া গ্রামের বেশ কয়েকজন জানান, বিভিন্ন ডায়িং মিলের দূষিত বর্জ্য নেমে আসায় খীরু নদীর পানি ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়েছে অনেক আগেই। অতীতে এই নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। মাছগুলোও ছিল বেশ সুস্বাদু। কিন্তু পানি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নদীতে এখন আর মাছের দেখা মেলে না। একই গ্রামের আনোয়র হোসেন জানান, অতীতে আশপাশের নারীরা ওই নদীর পানিতে কাপড়চোপড়, থালা-বাটি ধোয়াসহ গৃহস্থালির কাজে ব্যহার করত। ছাগল, গরু-বাছুরকেও ওই নদীর পানি পান করতে দেওয়া হতো। দিনের কাজের শেষে পাড়ের মানুষেরা প্রতিদিনের স্নান-গোসলের কাজটিও সেরে নিত ওই নদীর পানিতেই। আর এখন মানুষ তো দূরের কথা, মৃত্যুর আশঙ্কায় কোনো গেরস্ত তার গৃহপালিত পশুটিও নদীর ওই পানিতে গোসল দিতে নারাজ।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকায় আশির দশক থেকে ভালুকা এলাকায় গড়ে উঠছে অসংখ্য টেক্সটাইল, সোয়েটার, ডায়িং, স্পিনিং, ফিশফিড, ফার্মাসিউটিক্যালস্সহ বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং উপজেলার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দুই পাশ ও বিশেষ করে হবিরবাড়ি, জামিরদিয়া, পাড়াগাঁও, বাশিল, কাশর, ধমাশুর, মামারিশপুর, ভরাডোবা, নিশিন্দাসহ বিভিন্ন এলাকা বর্তমানে স্থানীয়ভাবে শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে অনেক আগেই। ভালুকায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিশেষ করে ডায়িং মিলের শিল্পবর্জ্য বিভিন্নভাবে ফেলা হচ্ছে স্থানীয় নদী-খাল ও বিলে। যা লাউতির খাল, বিলাইজুড়ি ও বেইত্যাহাগুন খাল হয়ে এসে গড়িয়ে পড়ছে ভালুকা উপজেলার বুক চিরে বয়ে চলা খীরু নদীতে।

স্থানীয়রা জানান, একসময় খীরু নদীর তীরবর্তী বাসিন্দারা কাপড়চোপড়, বাসনপত্র ধোয়াসহ গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার করত এই নদীর পানি। বোরো ধানসহ নানা ধরনের ফসলের আবাদও হয় ওই নদীর পানিতে সেচ দিয়ে। কিন্তু ভালুকা এলাকার বেশ কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শিল্পবর্জ্য মিশে এলাকার নদী, খাল ও জলাশয়ের পানি বর্তমানে বিবর্ণ ও কালচে রং ধারণ করে মারাত্মক দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। ফসলের জমিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে ওই পানি। দুর্গন্ধযুক্ত ওই পানি গায়ে লেগে মানুষের শরীর চুলকায়, নানা  চর্মরোগ ও ঘা হয়। দূষিত ওই পানির কারণে বিলুপ্তি ঘটছে একসময়ের খীরু নদীর সুস্বাদু মাছ। তা ছাড়া ভরাট হয়ে নদীটি ইতিমধ্যে তার নাব্যতা হারিয়েছে। তারা খননের মাধ্যমে নদীটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনার দাবি করেন।

সরেজমিনে পরিদর্শনে গেলে উপজেলার রাজৈ গ্রামের সফিকুল ইসলাম জানান, ফাল্গুন-চৈত্র মাসে খীরু নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। নদীর পানি বিষাক্ত হয়ে যাওয়ায় এখন আর তা পাওয়া যায় না। বর্ষার পানি কমতে শুরু করলেই খীরু নদীর মাছ মরতে থাকে এবং ওই নদীর পানি প্রবেশ করলে খামারের মাছও মরে যায়।

এক পশু চিকিৎসক জানান, এলাকার কৃষকরা একসময় খীরু নদীর পানি গবাদি পশুকে পান করাতেন। এখন তারা ভয়ে গবাদি পশুকে পান করানো তো দূরের কথা ওই নদীর পানিতে পশুর শরীর ধোয়ানো পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছেন।

নদীর তীরের একাধিক কৃষক জানান, বিকল্প উৎস না থাকায় তারা খীরু নদীর পানিতেই চাষাবাদ করছেন এবং ওই পানিতে উৎপাদিত ফসল খেয়ে তাদের স্বাস্থ্যের দীর্ঘমেয়াদি কোনো ক্ষতি হচ্ছে কি না তা তাদের জানা নেই। তাদের দাবি, নদীর পানিতে সেচ দেওয়া জমির ফসলে পোকার আক্রমণ কম হয়।

উপজেলার মলিকবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আকরাম হোসেন জানান, খীরু নদীর বেশ কিছু অংশ উপজেলার মল্লিকবাড়ি ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত। মিলকারখানার দূষিত বর্জ্য মেশানো পানির দুর্গন্ধে খীরু নদীর পাড়ের মানুষ বসবাস করতে পারছে না। তারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ওই নদীর পানি খেয়ে ইতিমধ্যে তার এলাকায় কয়েকটি গবাদি পশু মারা গেছে। তা ছাড়া খীরু নদীর পানিতে সেচ দিয়ে আবাদ করা হলে ধানের জমি ভাইরাসে আক্রান্ত হয়। এর পরও স্থানীয়রা বাধ্য হয়ে ওই পানি দিয়েই ধান চাষ করেন।

রাজৈ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাদশাহ মিয়া জানান, তার ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে চলা খীরু নদী ইতিমধ্যে ভরাট হয়ে নাব্যতা হারিয়েছে। জনস্বার্থে নদীটি খনন করে এর নাব্যতা ফিরিয়ে আনাসহ বর্জ্যদূষণ বন্ধ করে খীরুর পানিকে আগর মতো ব্যবহার উপযোগী করা জরুরি।

স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ কাজিম উদ্দিন আহাম্মেদ ধনু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভালুকার খীরু নদীসহ এলাকায় অন্যান্য নদী-খাল নিয়ে পানিসম্পদ উপমন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে একাধিকবার কথা হয়েছে। তিনি ভালুকার নদী-খাল খননের বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন এবং ভালুকার নদী-খাল পরিদর্শনের জন্য আগামীকাল শনিবার (১২ জুন) ভালুকায় আসছেন।



সাতদিনের সেরা