kalerkantho

শুক্রবার । ৪ আষাঢ় ১৪২৮। ১৮ জুন ২০২১। ৬ জিলকদ ১৪৪২

বিরল লজ্জাবতী বানর

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

২৯ মে, ২০২১ ০৩:৪২ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বিরল লজ্জাবতী বানর

মারবেল পাথরের মতো চোখের মণি। তাকিয়ে আছে অপলক। পায়ের নখগুলো ফুটন্ত ফুলের মতো। লোহার খাঁচার ভেতরে থেকেও মানুষ দেখে লজ্জায় গুটিয়ে যায় শামুকের মতো। ক্ষুধায় কাতর, তাই নড়াচড়া নেই তেমন। প্রাণীটির দেখা মিলল তাহিরপুর উপজেলার লাউড়েরগড়ে। বিরল ও সংকটাপন্ন এই প্রাণীর নাম লজ্জাবতী বানর। এর ইংরেজি নাম Bengal slow loris ev Northern slow loris (বৈজ্ঞানিক নাম  Nycticebus bengalensis)|

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিপন্নপ্রায় লজ্জাবতী বানর বাস করে পাহাড়ি এলাকার উঁচু গাছে। এরা নিশাচর। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংস্থার (আইইউসিএন) তালিকায় সংকটাপন্ন বন্য প্রাণী হিসেবে স্বীকৃত বিরল ও বিপন্ন লজ্জাবতী বানর ধরা পড়েছে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর সীমান্তের লাউড়েরগড়ে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বানরটি ধরা পড়ার খবর পেয়ে শ্রীমঙ্গলের বন্য প্রাণী সংরক্ষক সোহেল শ্যাম বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের মাধ্যমে জাতীয় উদ্যান লাউয়াছড়ায় অবমুক্ত করার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে বন বিভাগ গতকাল শুক্রবার বিকেলে বানরটি উদ্ধার করে নিয়ে গেছে।

স্ট্যান্ড ফর আওয়ার এনডেনজারড ওয়াইল্ডলাইফ সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার বিকেলে তাহিরপুর উপজেলার বাদাঘাট ইউনিয়নের লাউড়েরগড় দশঘরপাড়ার বাসিন্দা শ্রমিক বাবুল মিয়া লাউড়েরগড় সীমান্তে কাঠ কুড়াতে যান। এক পর্যায়ে একটি গাছে দুর্লভ ও সুন্দর লজ্জাবতী বানরটিকে দেখে ধরে বাড়িতে নিয়ে আসেন। এ সময় লজ্জাবতী বানরটি বাবুলের হাতে কামড় দেয়। বাড়ি আসার পর তাঁর হাত ও মুখ ফুলে গেলে লাউড়েরগড় বাজারের পল্লী চিকিৎসক জামাল উদ্দিন তাঁকে চিকিৎসা দেন। বাবুল মিয়া ও প্রাণীটির ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেন পল্লী চিকিৎসক জামাল উদ্দিন। পোস্টটি চোখে পড়ে বন্য প্রাণী সংরক্ষক সোহেল শ্যামের। তিনি ও তাঁর সংগঠনের সদস্য খোকন থৌনাউজম শ্রমিক বাবুল মিয়া ও পল্লী চিকিৎসকের নাম, ঠিকানা ও মোবাইল ফোন নম্বর সংগ্রহ করে ওই প্রাণী যাতে হাতছাড়া করা না হয় সেই অনুরোধ জানান। বারবার তাঁরা যোগাযোগ করলে তাঁরাও আশ্বস্ত হয়ে কথা দেন প্রাণীটি তাঁরা হাতছাড়া করবেন না। পরে সোহেল শ্যাম সিলেট বিভাগীয় বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করে লজ্জাবতী বানরটি উদ্ধার ও অবমুক্ত করার অনুরোধ জানান। ওই কর্মকর্তা তাঁর কার্যালয়ের ফরেস্টার আনিসুজ্জামান, তাজুল ইসলাম ও টিপলু দেবকে লজ্জাবতী বানরটি উদ্ধারের নির্দেশ দেন। গতকাল সকালে শ্রীমঙ্গল থেকে তাঁরা তাহিরপুর সীমান্তের লাউড়েরগড়ে ছুটে আসেন। সঙ্গে নিয়ে আসেন বন্য প্রাণী সংরক্ষক সোহেল শ্যাম ও খোকন থৌনাউজমকে। তাঁরা বাবুল মিয়ার কাছ থেকে প্রাণীটি উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। গতকাল রাতেই এটি জাতীয় উদ্যান লাউয়াছড়ায় অবমুক্ত করা হয়।

স্ট্যান্ড ফর আওয়ার এনডেনজারড ওয়াইল্ডলাইফের সংগঠক সোহেল শ্যাম বলেন, ‘বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্য প্রাণী আইনের তফসিল-১-এ নিশাচর এই প্রাণী সংরক্ষিত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর আগে আইইউসিএনের বন্য প্রাণী তালিকায় বানরটি সংকটাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবিটি দেখার পর এটি যাতে হাতছাড়া না হয় সে জন্য দ্রুত উদ্যোগ নিই। একজন পল্লী চিকিৎসক এবং বানরটি যিনি ধরেছেন তাঁর সম্পূর্ণ তথ্য উদঘাটন করে এটি যাতে হাতছাড়া না হয়, সেই অনুরোধ জানাই। পরে বন বিভাগকে অবগত করার পর তাদের সঙ্গে এসে আমরা এটি উদ্ধার করেছি।’

জাতীয় উদ্যান লাউয়াছড়ার জানকীছড়া ক্যাম্পের ফরেস্টার মো. আনিসুজ্জামান গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লজ্জাবতী বানরটি আমাদের দেশে বিরল। এটি ঘন সবুজ জঙ্গলে যেখানে উঁচু গাছপালা আছে সেখানে থাকতে পারে। আমরা খবর পাওয়ার পরই সুনামগঞ্জের লাউড়েরগড় থেকে এটি উদ্ধার করেছি। রাতেই আমরা জানকীছড়া ক্যাম্পে অবমুক্ত করেছি।’  



সাতদিনের সেরা