kalerkantho

রবিবার । ১৭ শ্রাবণ ১৪২৮। ১ আগস্ট ২০২১। ২১ জিলহজ ১৪৪২

ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ মোকাবেলায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ

বাগেরহাটে প্রস্তুত ৩৪৪ স্থায়ী ও ৬২৯ অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র

বহু আশ্রয় কেন্দ্রে নেই পানি-বিদ্যুৎ-টয়লেট

মহিদুল ইসলাম, শরণখোলা (বাগেরহাট)   

২৪ মে, ২০২১ ২০:৫৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাগেরহাটে প্রস্তুত ৩৪৪ স্থায়ী ও ৬২৯ অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র

ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ মোকাবেলায় ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বাগেরহাট জেলা প্রশাসন। উপকূলীয় এই জেলাটিতে ৩৪৪টি স্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র ও ৬২৯টি প্রাতিষ্ঠানিক ভবন অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে তিন লক্ষাধিক লোকসহ গবাদি পশু আশ্রয় নিতে পারবে। জেলা সদরসহ জেলার ৯টি উপজেলায় পুলিশ, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, রেডক্রিসেন্ট, ফায়ার সার্ভিস, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ জরুরি সেবা দিতে কন্ট্রোল রুম খুলেছে।

এ ছাড়া দুর্যোগকালীন জরুরি ত্রাণকার্য পরিচালনার জন্য ৯টি উপজেলায় এক কোটি ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও ২৮ মেট্রিকটন শুকনা খাদ্য পাঠানো হয়েছে। শিশু খাদ্য ও গোখাদ্য কেনার জন্য প্রত্যেক উপজেলায় দুই লাখ টাকা করে পাঠানো হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনার জন্য নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, নৌপুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, রেডক্রিসেন্ট, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনসহ পুলিশের পর্যাপ্ত যানবাহন প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া জেলার ৯টি উপজেলা ও তিনটি পৌরসভার প্রত্যেকটিতে কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। তিন শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক দল প্রস্তুত রয়েছে। প্রত্যেকটি উপজেলা একটি করে মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন ও জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন দপ্তর সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

এদিকে, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের খবরে উপকূলের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সিডরের সেই ভয়াবহতার কথা তাদের স্মৃতিতে ভেসে উঠছে বার বার। আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার সব ধরণের আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন অনেকেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা পর্যায়ের বহু আশ্রয় কেন্দ্রের অবস্থা খুবই নাজুক। বেশিরভাগেই পানি ও বিদ্যুৎ নেই। এ ছাড়া স্যানিটেশন ব্যবস্থাও সচল নেই। অনেক আশ্রয় কেন্দ্রের টয়লেটগুলো একেবারেই ব্যবহার অনুপযোগী। তবে, সোমবারের মধ্যেই সংশ্লিষ্টদের এসব মেরামত করে প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রশাসন।

আজ সোমবার দুপুরে সরেজমিন জেলার সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলা শরণখোলার বিভিন্ন এলাকার আশ্রয় কেন্দ্র পরিদর্শন করে দেখা গেছে, আশ্রয় কেন্দ্র পরিচালনা কমিটির সদস্যরা আশ্রয় কেন্দ্রগুলো ঝাড় দিতে শুরু করেছে। বেশ কয়েকটির ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তরা খসে পড়েছে।

উত্তর কদমতলা আশ্রয় কেন্দ্র পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক টি এম মিজানুর রহমান জানান, দুর্যোগে তাদের এই কেন্দ্রটিতে দুই শতাধিক লোক আশ্রয় নিতে পারবে। তিন হাজার লিটার ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি ট্যাংক বসানো রয়েছে কিন্তু তাতে পানি নেই। দুটি টয়লেট দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারের অনুপযোগী অবস্থায় পড়ে আছে। দুর্যোগে লোকজন আশ্রয় নিলেও খাবার পানি ও পায়খানা-প্রস্রাবে ব্যবস্তা না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়তে হবে।

রাজেশ্বর আশ্রয় কেন্দ্র গিয়ে দেখা যায়, নারী-পুরুষের চারটি আলাদা টয়লেট ব্যবহার উপযোগী। কিন্তু পানি নেই একফোটাও। পরিচালনা কমিটির সদস্য ইউপি মেম্বর মো. কাওসার আক জানান, তাদের এই কেন্দ্রে দুর্যোগে প্রায় এক হাজার মানুষ আশ্রয় নিতে পারবে।

ঘূর্ণিঝড় ইয়াস ধেয়ে আসার খবরে উপকূলের মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ছিন্নমূল, শ্রম ও মৎস্যজীবী পরিবারগুলো বেশি উৎকণ্ঠায় রয়েছে। বলেশ্বর নদের পারের জিলবুনিয়া গ্রামের জেলে আ. হামিদ হাওলাদার (৫৫), তোফাজ্জেল খান (৫০) হারুন খান (৬০) বলেন, সিডরে আমরা জাল-নৌকা হারিয়ে আমার নিঃশ্ব হয়েছি। এর পর থেকে ঝড়ের নাম শুনলেই সিডরে কথা মনে পড়ে। এবার আমরা আগেভাগেই আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।

শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সরদার মোস্তফা শাহিন জানান, উপজেলায় মোট ৯১টি সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুর রয়েছে। সেচ্ছাসেবক দল, মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। যেসব সাইক্লোন শেল্টারে পানি, বিদ্যুৎ এবং স্যানিটেশন ব্যবস্থা খারাপ সেগুলো সচল করার চেষ্টা চলছে।

জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা শেষে ভারপ্রাপ্ত জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা খাদিজা আক্তার জানান, বাগেরহাট উপকূলীয় জেলা হওয়ায় ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে এ জেলার মানুষ একটু বেশি ঝুঁকিতে থাকে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সতর্কবানী অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড়টি ২৬ মে নাগাদ ভারতের উড়িষ্যার উপকূল ও বাংলাদেশের সুন্দরবন উপকূল অতিক্রম করতে পারে। তাই আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছি।

তিনি জানান, জেলার উপকূলীয় উপজেলা শরণখোলা, মোংলা, রামপাল ও মোরেলগঞ্জসহ ৯টি উপজেলার সকল  ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র প্রস্তুত করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রয়োজনে আরো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি ভবনগুলোও আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে পর্যাপ্ত পানি ও আলোর ব্যবস্থা রাখা হবে। আসন্ন ঝড় মোকাবিলা করতে ওয়ার্ড পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে সবাইকে সচেতন থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরণের প্রস্তুতি রয়েছে। জেলার ৯টি উপজেলায় ৩৪৪টি স্থায়ী সাইক্লোন শেল্টার এবং ৬২৯টি বিভিন্ন শিক্ষা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভবন অস্থায়ী শেল্টার হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলার সকল উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যানদের সঙ্গে জুম মিটিংয়ের মাধ্যমে তাদেরকে এব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।



সাতদিনের সেরা