kalerkantho

মঙ্গলবার । ৮ আষাঢ় ১৪২৮। ২২ জুন ২০২১। ১০ জিলকদ ১৪৪২

লাশের গাড়ি আর অ্যাম্বুল্যান্সে ঢাকায় ফিরছে মানুষ!

রোগীর স্ট্রেচার সরিয়ে টুলে ১৫ জন

নিজস্ব প্রতিবেদক, বগুড়া   

১৯ মে, ২০২১ ০৭:৪১ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



লাশের গাড়ি আর অ্যাম্বুল্যান্সে ঢাকায় ফিরছে মানুষ!

একজনকে রোগী সাজিয়ে ১০-১৫ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছে অ্যাম্বুলেন্স। ছবি: কালের কণ্ঠ

রাস্তায় কড়াকড়ি আর সারা দেশে যানবাহন বন্ধ থাকার পরও বগুড়া থেকে লাশের গাড়ি আর অ্যাম্বুল্যান্সে করে ঢাকা ফিরেছে মানুষ। শহরতলিতে মহাসড়ক সংলগ্ন বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে মোড়ে প্রাইভেট অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবসা এখন রমরমা। যাত্রী প্রতি হাজার থেকে ১৫০০ টাকা আদায় করছে তারা। অনেক সময় আবার পুলিশি ঝামেলা এড়াতে একজনকে রোগী সাজিয়ে বাকিদের আত্মীয়-স্বজন পরিচয় দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে জোগাড় করে দেওয়া হচ্ছে রোগী বানানোর ভুয়া সার্টিফিকেটও।

বগুড়ার শেরপুর হাইওয়ে পুলিশের ইন্সপেক্টর বানিউল আনাম জানান, 'আগের চেয়ে এখন রাস্তায় অ্যাম্বুল্যান্সের চলাচল বেড়ে গেছে। আর আত্মীয়-স্বজন পরিচয়ে যাত্রীও থাকে ঠাসা। রোগী একজন, কিন্তু তার সঙ্গে গাড়িতে থাকেন ১০ জন। আমাদের সন্দেহ হলে থামাই। কখনো কখনো কাগজপত্রও চেক করি। রোগীর কাগজপত্র না থাকলে অ্যাম্বুল্যান্স যেখান থেকে আসে সেদিকে ঘুরিয়ে দিই।' তিনি স্বীকার করেন, পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে মহাসড়কে অনেক যাত্রীবাহী অ্যাম্বুল্যান্স চলছে।

বগুড়ার সহকারী পুলিশ সুপার (মিডিয়া) ফয়সাল আহম্মেদ জানান, অনেকেই রোগী সেজে পরিবার-পরিজন বা আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে ঢাকায় ফিরছেন এমন তথ্য তাদের কাছে রয়েছে। এ জন্য শহরের বাইপাস মোড়গুলোতে পুলিশের নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৮ মে) সকালে বগুড়ার বনানী মোড়ে গিয়ে দেখা গেল, সারি সারি অ্যাম্বুল্যান্স যাত্রী তোলার জন্য অপেক্ষা করছে। প্রথমে দেখে যে কেউ এ স্থানে বড় ধরনের দুর্ঘটনা হয়েছে ভেবে ভুল করবে। আসলে এরা যাত্রীর জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। দেখা গেল, শফিকুল নামের একজন যাত্রী ঢাকায় যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুল্যান্সচালকের সঙ্গে দরদাম করছেন। চালকের নাম মিরাজ, মাঝবয়সী। তার এক কথা- জনপ্রতি ১২০০ দিতে হবে। আর কোনো লাগেজ থাকা যাবে না। যাত্রী হতে চাওয়া শফিকুল এক হাজার দিতে দরদাম করছেন।

এর পেছনে সাইরেন বাজিয়ে একটি অ্যাম্বুল্যান্স এসে থামল। সেখানে ওঠার জন্য দৌড়ে গেলেন মিনারা বেগম এবং তার স্বামী মনির হোসেন। তারা দুজনই ঢাকার একটি বেসরকারি কম্পানিতে কাজ করেন। সঙ্গে বড় ব্যাগ থাকায় অ্যাম্বুল্যান্সের চালক তাদের নিতে রাজি হলেন না। বেশি টাকা দিতে চাওয়ার পরও চালক আব্দুল গফুর বলে দিলেন ব্যাগ নিলে ট্রাকে যান। অ্যাম্বুল্যান্সে ব্যাগ ছাড়া যেতে হবে। অগত্যা এই দম্পতি দৌড়াল পাশের দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকের দিকে। সেখানেও জনপ্রতি ১ হাজার টাকা আর ব্যাগের জন্য ৫০০ টাকা দিতে হলো তাদের।

পরিচয় গোপন করে যোগাযোগ করা হয় বগুড়া শহরের ঠনঠনিয়া এলাকার প্রাইভেট অ্যাম্বুল্যান্স মালিকের সঙ্গে। তার গাড়ি শহরের মধ্যে বেশি চলে। ঢাকায় রিজার্ভে যাওয়ার কথা শুনে অনেক প্রশ্নের পর রাজি হলেন। কিন্তু ভাড়া দাবি করলেন ১৪ হাজার টাকা। একই সঙ্গে জানিয়ে দিলেন, তার গাড়িটি নন-এসি। আর পথের সব খরচ ভাড়াকারীকে প্রদান করতে হবে। পুলিশি ঝামেলা হলে বলতে হবে এটা রোগীর গাড়ি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু বগুড়া শহরে বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে অ্যাম্বুল্যান্স রয়েছে প্রায় ৩ শতাধিক। এসব অ্যাম্বুলেন্সের শতকরা ৯০ ভাগই এখন যাত্রী বহন করছে। জরুরি প্রয়োজনে অসুস্থ রোগীকে বহনের জন্য শহরে অ্যাম্বুল্যান্স পাওয়া যাচ্ছে না।

কথা হয় অ্যাম্বুল্যান্সচালক আমির হামজার সঙ্গে। তিনি বললেন, রাস্তায় কড়াকড়ি থাকায় অনেক সময় পুলিশকে ম্যানেজ করতে হয়। এছাড়া ব্যবসা মোটামুটি ভাল। তবে রাস্তায় জ্যাম থাকার কারনে যেতে এবং ফিরে আসতে সময় লাগে বেশি। এটা উসুল করতে হয় অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করে। তবে সবগুলো অ্যাম্বুল্যান্স এলপিজি গ্যাসে চলার কারণে লাভ অনেক বেশি। এ জন্য মালিকরাও যাত্রী পরিবহনে আগ্রহী বেশি।

আমিনুল নামের আরো একজন চালক বলেন, আপনি যদি পুরো অ্যাম্বুল্যান্সই নিয়ে যেতে চান তাহলে একজনকে রোগী সাজাতে হবে। কোনো একটি হাসপাতাল বা ক্লিনিক থেকে একজনের পায়ে বা মাথায় ব্যান্ডেজ করে সঙ্গে চিকিৎসার কাগজপত্র নিয়ে নেব। তাহলে পথে কোনো সমস্যা নাই।

বগুড়া প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স মালিক সমিতির নেতা আসাদুল্লাহ প্রামানিক বলেন, আমরা এরকম যাত্রী বহনের অভিযোগ প্রতিদিনই পাই। যাত্রী নেওয়ার কোনো বিধান নেই এটাও মানি। কিন্তু করোনার কারণে ভাড়া কমে যাওয়ায় এখন কেউ সমিতির কথা শোনে না। কোনো গাড়ি ধরা পড়লে আমরা পুলিশের কাছে কোনো তদবিরও করছি না। সবাইকে বলে দিয়েছি নিজের রিকসে গাড়ি চালাতে হবে।



সাতদিনের সেরা