kalerkantho

সোমবার । ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৪ জুন ২০২১। ২ জিলকদ ১৪৪২

১৯ বছর পর ফিরলেন হারিয়ে যাওয়া ময়ফুল, জমিয়েছেন আধাবস্তা টাকা-কয়েন

পূর্বধলা (নেত্রকোণা) প্রতিনিধি   

১৬ মে, ২০২১ ১৬:৩৮ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



১৯ বছর পর ফিরলেন হারিয়ে যাওয়া ময়ফুল, জমিয়েছেন আধাবস্তা টাকা-কয়েন

২০০২ সালের কথা। বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন মানসিক বিকারগ্রস্ত ময়ফুল বিবি (৭০)। ২০০৩ বা ২০০৪ সালের দিকে নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার জারিয়া বাজারে গিয়ে আশ্রয় নেন। অবশেষে ১৯ বছর পর স্থানীয় এক ব্যক্তির একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে আজ রবিবার সকালে তিনি স্বজনদের কাছে ফিরে যান। হারিয়ে যাওয়া মাকে দীর্ঘদিন পর ফিরে পেয়ে আবেগাপ্লুত তাঁর মেয়েসহ স্বজনরা।

উপজেলার জারিয়া ইউনিয়নের নাটেরকোণা গ্রামের বাসিন্দা ও আওয়ামী লীগ নেতা মো. এমদাদুল হক এমদাদ জানান, ২০০৩ বা ২০০৪ সালের দিকে একদিন ওই নারীকে জারিয়া বাজারে দেখা যায়। এরপর থেকে তিনি সেখানেই আশ্রয় নেন। সেখানেই তাঁর বসবাস। কখনও ডাকবাংলোর বারান্দা, কখনও বাজারের দোকানপাটের বারান্দা, আবার কখনও রেল স্টেশনের প্লাটফরমে দেখা যেত তাঁকে। একসময় একটি দোকানের পেছনে কাপড়, পলিথিন আর চট দিয়ে নিজেই তৈরি করে নেন মাথা গোঁজার ঠাঁই। তাঁর স্বভাব ও ব্যবহারে স্থানীয় মানুষ তাকে আপন করে নেন। তারাই খাবার-দাবার দিতেন। কখনও কখনও তিনি চেয়ে নিতেন। নাম-ঠিকানা জানতে চাইলে কখনও তিনি বলতেন না। অবশেষে স্থানীয়রা অনেক চেষ্টা করে তাঁর কাছ থেকে নাম ঠিকানা জানতে পারেন। পরে তাঁর স্বজনদের খোঁজে এমদাদুল হক পূর্বধলা হেল্প লাইন নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে তাঁর ছবি ও ঠিকানা শেয়ার করেন। এতে খোঁজ মেলে ময়ফুলের স্বজনদের। গতকাল রবিবার সকালে তাঁর তিন মেয়ের কাছে তাঁকে তুলে দেওয়া। 

এলাকার মানুষকে তিনি এতটাই আপন করে নিয়েছিলেন যে, প্রথমে তিনি যেতেই চাননি। তিনি বার বার বলছিলেন, বাড়ি আর এলাকার মানুষদের ছেড়ে তিনি কোথাও যাবেন না। পরে কৌশলে তাকে রাজি করানো হয়। এসময় তাঁর থাকার খুপড়ি জায়গায় খুঁজে বিভিন্ন অঙ্কের নোট ও কয়েনসহ অর্ধবস্তা টাকা পাওয়া যায়। যেগুলো তিনি মানুষের কাছ পেয়ে দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চিত করেছেন। পরে ওই টাকাসহ হাঁড়ি-পাতিল, কাপড়, সাজসজ্জার জিনিসপত্র তাঁর মেয়েদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

ময়ফুল বিবির বাড়ি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার জিউধরা গ্রামে। স্বামীর নাম কাশেম ব্যাপারী। তিনি আগেই মারা গেছেন। তাদের ৬ মেয়ে সন্তান রয়েছে। 

তাকে নিতে মেয়ে হোসনেরা বেগম জানান, ২০০২ সালে তার মা মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় কিছু দিন তাঁকে তাদের নজরে রাখতে পারলেও একপর্যায়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যান। তারপর থেকে তারা বিভিন্ন জায়গায় অনেক খোঁজাখুজি করেছেন। কিন্তু না পেয়ে তারা ধরে নিয়েছিলেন এতদিনে হয়তো তাদের মা আর বেঁচে নেই। কিন্তু ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে তার মায়ের সন্ধান পেয়ে গতকাল একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে ফেনী থেকে ছুটে আসেন তারা তিন বোন। দীর্ঘদিন পর তাদের মাকে ফিরে পেয়ে তারা আবেগাপ্লুত। তিন মেয়েসহ উপস্থিত সবার চোখে গড়িয়ে পড়ে আনন্দাশ্রু।

অপর মেয়ে বিবি মরিয়ম জানান, তারা বিশ্বাসই করতে পারছেন না দীর্ঘদিন পরে মাকে ফিরে পেয়েছেন। জারিয়াবাসী তার মাকে যেভাবে আগলে রেখেছিলেন তা মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এজন্য তারা মুগ্ধ। তারা জারিয়াবাসীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। 

তার স্বজনরা তাকে নিতে আসছেন শুনে এলাকার অনেক মানুষ ছুটে আসেন একনজর দেখার জন্য। এসময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নাটেরকোণা গ্রামের বাসিন্দা ও আওয়ামী লীগ নেতা মো. এমদাদুল হক এমদাদ, উপজেলা যুবলীগের নেতা ও নাটেরকোণা গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন রোমেল, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. তুহিন মিয়া, নূরুল আমিন প্রমুখ।



সাতদিনের সেরা