kalerkantho

শুক্রবার । ৪ আষাঢ় ১৪২৮। ১৮ জুন ২০২১। ৬ জিলকদ ১৪৪২

সুরুজা বিবির পরিবারে এরকম ঈদের আনন্দ আর আসেনি!

লিটন শরীফ, বড়লেখা (মৌলভীবাজার)   

১৩ মে, ২০২১ ২০:৪৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সুরুজা বিবির পরিবারে এরকম ঈদের আনন্দ আর আসেনি!

গ্রামের এবাড়ি-ওবাড়ি আশ্রয়ে থেকে জীবনের বহু বছর কেটে গেছে সুরুজা বিবির। নিজেদের একটি মাথাগোঁজার ঠাঁই ছিল না। স্বামী মারা গেছেন বহু বছর আগে। ছেলেও মারা গেছেন প্রায় ৯ বছর হয়। এ অবস্থায় অন্যের সাহায্য ও মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কাজ করে ছেলের বউ, নাতি-নাতনি নিয়ে কষ্টে দিনপার করছিলেন। তাদের জীবনে ঈদ এসেছে বহুবার। কিন্তু ঠিকানাহীন জীবনে মনে খুব একটা আনন্দ আসেনি। তবে এবার তাদের ঈদের আনন্দ এসেছে। প্রায় ৫০ বছর পর সুরুজার নিজস্ব আশ্রয় হচ্ছে। আনন্দের কারণ এটাই। এবার ঈদে উপহারের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন ভিটে বাড়ির আনন্দ। জীবনে প্রথম নিজের জমি আর ঘর পাচ্ছেন তিনি।

সুরুজা বিবি মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের করমপুর এলাকার বাসিন্দা। তিনি ওই এলাকার মরহুম সিরাজ উদ্দিনের বাড়িতে আশ্রয়ে থাকেন। সম্প্রতি মালিক বাড়ি বিক্রি করে দিবেন তাই ঈদের পর বাড়ি ছাড়ার কথা বলেছেন। এমন অবস্থায় কোথায় যাবেন কি করবেন চিন্তায় পড়ে যান সুরুজা। তাদের এই কষ্টের কথা জেনে এলাকার কিছু তরুণ ফেসবুকে একটি মানবিক পোস্ট করেন। বিষয়টি নিয়ে কয়েকটি গণমাধ্যমেও খবর প্রকাশ হয়। 

মানবিক এই সংবাদটি নজরে আসে বড়লেখার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নূসরাত লায়লা নীরার। বুধবার বিকেলে (১২ মে) বড়লেখার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নূসরাত লায়লা নীরা বৃদ্ধা সুরুজা বিবির অস্থায়ী বাড়িতে খাদ্যসাগ্রী ও শাড়ি নিয়ে হাজির হন। তিনি তার (সুরুজা) হাতে তুলে দেন প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহারের দুই প্যাকেট খাদ্যসামগ্রী ও নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগে ঈদের উপহার হিসেবে একটি নতুন শাড়ি। এসময় তিনি ‘মুজিব শতবর্ষে’ প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে ভূমিহীন সুরজবা বিবি ও তার ছেলের পরিবারকে দুটি ঘর তৈরি করে দেওয়ার আশ্বাস দেন।

সুরুজার পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সুরুজা বিবির স্বামী দিনমজুর ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের বছর খানেক আগে বর্তমান উত্তর শাহবাজপুর এলাকায় এসেছিলেন। এরপর থেকে এই গ্রামেই বাস। এখন এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা ও ভোটার। পরিবারের অসচ্ছলতায় কোনো বাড়ি করতে পারেননি। মানুষের বাড়ি বাড়ি ছেলে-মেয়ে নিয়ে থাকতে হয়েছে। একসময় স্বামী মারা যান। ছেলে বিয়ে করেন। তার তিন মেয়ে ও এক ছেলে। সংসারের অনটনের মধ্যে নিজের মাথাগোঁজার ঠাঁই করা হয়নি। প্রায় ৯ বছর আগে মারা যান সুরুজার ছেলে আব্দুল মান্নান। এরপর দুর্দিন নেমে আসে সুরুজা বিবির পরিবারে। নিজে ও ছেলের বউসহ মানুষের সাহায্যে কখনো বাড়ি বাড়ি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। করমপুর গ্রামের এবাড়ি-ওবাড়ি অস্থায়ী হিসেবে বসবাসের পর ঠাঁই হয় সাবেক চেয়ারম্যান সিরাজ উদ্দিন চৌধুরীর পরিত্যক্ত বাড়িতে। দীর্ঘ চার বছর থাকার পর সেই বাড়িও ছাড়ার তাগিদ আসে। সহায় সম্বলহীন সুরুজা বিবি কোথায় যাবেন! কি করবেন সেই চিন্তায় চোখে আঁধার দেখছিলেন। তখনই তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে প্রশাসন। প্রশাসন ওই এলাকায়ই তাদেরকে খাস ভূমিতে ঘর তৈরি করে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।

সুরুজা বিবি বলেন, ‘জীবনটা মানুষের বাড়ি ঘরে থাকিয়া কাটি গেছে। শেষ বয়সে আইয়া সরকার আমারার কষ্টের কথা জানিয়া ঘর দিছইন। মনে কিছু শান্তি নিয়ে মারমু। সরকারি অফিসের স্যার আমরার লাগি ঈদের আগে খানি আনছইন (খাদ্যসামগ্রী)। ঈদের একটি নতুন শাড়ি দিছন। সবার লাগি দোয়া করমু।’

সুরুজা বিবির ছেলে বউ (স্ত্রী) আফিয়া বেগম বলেন, ‘আমার শ্বশুর স্বাধীনতার বছর খানেক আগে আইছন এই এলাকাত। কোনো দিনও একটু নিজর মাটি আছিল না আমরার। মাইনষের (মানুষের) বাড়িত থাকিয়া আমরার জীবন পার অইগেছিল। মাইষের বাড়িত থাকিয়া আমার একটা মেয়ে বিয়েও দিছি। কোনো দিন আমরা নিজের জায়গা, পাকা ঘর করমু ইতা চিন্তা দূরে থাকুক স্বপ্নও দেখছি না। এবার ঈদের আগে আমরার কষ্টের কথা হুনিয়া এসিল্যান্ড স্যার আমরার লাগি খানি (খাদ্যসামগ্রী), আমার শ্বাশুড়ির জন্য একটি নতুন শাড়ি নিয়া আইছন। কইছন আমরারে নতুন পাকা ঘর বানাইয়া দিবা। মুখ দিয়া ভাষায় প্রকাশ করতাম পারতাম নায় কত আনন্দ লাগের। জীবনে কোনো দিন ঈদে মন খুলিয়া আনন্দ করছি না। পরার বাড়ি, পরার ঘরে আনন্দ থাকে না। জীবনে এইরকম আনন্দের ঈদ আর আইছে না।’ 

বড়লেখার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুসরাত লায়লা নীরা (১৩ মে) বিকেলে বলেন, ‘ভূমিহীন বৃদ্ধা সুরুজা বিবির সংবাদ দেখে তাদের বাড়িতে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের খাদ্যসামগ্রী নিয়ে যাই। ব্যক্তিগতভাবে একটি নতুন শাড়ি দিয়েছি। তাদেরকে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর বরাদ্দের উদ্যোগ নেই। ঈদের পর ঘর নির্মাণের কাজ শুরু হবে। ওই এলাকায়ই সুরুজা বিবি ও তার ছেলের জন্য দুটি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’



সাতদিনের সেরা