kalerkantho

শুক্রবার । ৪ আষাঢ় ১৪২৮। ১৮ জুন ২০২১। ৬ জিলকদ ১৪৪২

ফেরিতে মৃত্যু : জীবন বাঁচাতে অনেকেই লাফিয়ে পড়েন পদ্মায়

প্রদ্যুৎ কুমার সরকার, শিবচর (মাদারীপুর)   

১৩ মে, ২০২১ ১৮:২৯ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ফেরিতে মৃত্যু : জীবন বাঁচাতে অনেকেই লাফিয়ে পড়েন পদ্মায়

হুড়োহুড়ি করে ফেরিতে ওঠার পর গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে পদ্মা নদী পাড়ি দেওয়ার সময় প্রচণ্ড গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েন বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌরুটের একটি ফেরির শতাধিক যাত্রী। ফেরিটি শিমুলিয়া থেকে বাংলাবাজার ঘাটে পৌঁছা মাত্র প্রচণ্ড গরম ও হুড়োহুড়ি থেকে বাঁচতে যাত্রীরা পদ্মায় লাফিয়ে পড়েন। অস্থির শরীরটিকে একটু শীতল করতে শতাধিক যাত্রী দীর্ঘ সময় পানিতে শরীর ডুবিয়ে বসে থাকেন। যাত্রীদের গগনবিদারী চিৎকারে স্থানীয়রা এগিয়ে এসে পানি দেওয়ার চেষ্টা করেন৷ ফেরিঘাটেই গুরুতর অসুস্থ চারজনের মৃত্যু হয়।

আশঙ্কাজনক অবস্থায় ১৩ যাত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। গরমে এদিন অপর একটি ফেরির এক যাত্রীসহ দুই ফেরির পাঁচ যাত্রীর মৃত্যু হয়। স্বজনরা এসে লাশ শনাক্তের পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার পদ্মবিল গ্রামের মজিবর রহমান শেখের মেয়ে শিল্পী বেগম (৪০) ও পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার আরামকাঠি গ্রামের আব্দুল জব্বারের ছেলে মো. শরিফুল ইসলামের (২৬) লাশ বৃহস্পতিবার সকালে ও মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের বালীগ্রাম এলাকার আল আমিন বেপারীর স্ত্রী নিপা বেগম (৪০), বরিশালের মুলাদী উপজেলার চর কালেকাং গ্রামের ইসহাক আকন্দের ছেলে মো. নুরু উদ্দিন (৪৫) ও শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কলিকা প্রসাদ গ্রামের গিয়াস উদ্দিন মাধবরের ছেলে আনসুর মাদবরের (১৫) লাশ বুধবার হস্তান্তর করা হয়।

জানা যায়, গত কয়েক দিনের মতো বুধবারও সকাল থেকেই শিমুলিয়া-বাংলাবাজার নৌরুটের ফেরিতে দক্ষিণাঞ্চলগামী যাত্রীদের ঢল নামে। শিমুলিয়া থেকে ছেড়ে আসা প্রতিটি ফেরিই ছিল যাত্রীতে কানায় কানায় পূর্ণ। যাত্রীদের এতই চাপ ছিল যে কোনো কোনো ফেরি যানবাহন না নিয়ে শুধু যাত্রী উঠিয়েই ছেড়ে আসে শিমুলিয়া থেকে। যাত্রীর চাপ সামাল দিতে এদিন বাংলাবাজার ঘাট থেকে অল্প যানবাহন বোঝাই করেই বা খালি ফেরি শিমুলিয়া পাঠানো হয়।

এদিন সকালে বাংলাবাজার ঘাট থেকে রো রো ফেরি এনায়েতপুরী ১৫টি যানবাহন নিয়ে শিমুলিয়া ঘাটে এসে পৌঁছায়। এ সময় ফেরিটি যানবাহন ঘাটে নামানোর আগেই শিমুলিয়া ঘাট থেকে প্রায় ৫ হাজার যাত্রী ফেরিতে উঠতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। যাত্রী বোঝাই করে প্রায় ৩ ঘণ্টা অপেক্ষার পর যাত্রীদের চাপে লোড করা যানবাহন শিমুলিয়া ঘাটে না নামিয়েই যাত্রী বোঝাই ফেরিটি আবার বাংলাবাজারের উদ্দেশে ছেড়ে আসে। গরমে দীর্ঘ সময় তপ্ত রোদে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থেকে ফেরির মধ্যেই শতাধিক যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ে। ফেরিটি মাঝ পদ্মায় যখন পৌঁছে তখন ফেরিটিতে লুটিয়ে পড়ে অন্তত ২০ জন যাত্রী। অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকেন তারা। এ সময় ফেরির অন্য যাত্রীরা লুটিয়ে পড়ে থাকা যাত্রীদের পানি পান করানো, বাতাস করা, মাথায় পানি ঢেলে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করেন। এ অবস্থায় ফেরিটি বাংলাবাজার ৩নং ঘাটে আসার সাথে সাথে শতাধিক যাত্রী নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে গরম থেকে কোনোমতে বাঁচার চেষ্টা করেন।

এ সময় ফেরির অন্য যাত্রীদের সহায়তায় ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা আশঙ্কাজনক অবস্থায় ফেরিতে লুটিয়ে পড়ে থাকা যাত্রীদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর আগেই কয়েকজনের মৃত্যু হয়।

এর আগে একই দিন শিমুলিয়া থেকে রো রো ফেরি শাহ পরান যাত্রী বোঝাই করে বাংলাবাজার ঘাটে আসার পথে যাত্রীদের হুড়োহুড়ি ও গরমে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কলিকা প্রসাদ গ্রামের গিয়াস উদ্দিন মাধবরের ছেলে আনসুর মাদবর (১৫) নামের এক কিশোরের মৃত্যু হয়।

রো রো ফেরি এনায়েতপুরীর যাত্রী বরিশালের বাসিন্দা রোকেয়া বেগম বলেন, ফেরিতে এত ভিড় ছিল যে আমরা একপাশ থেকে অন্যপাশে ফিরতে পারছিলাম না। তার ওপর গরমে আমরা অনেক মানুষ অস্থির হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম। মনে হচ্ছিল দম বন্ধ হয়ে আসছে। তাই ফেরি ঘাটে ভেড়ার সাথে সাথে পানিতে নেমে পড়েছি। তা না হলে বাঁচতাম না।

ফেরির আরেক যাত্রী আলমগীর হোসেন বলেন, আমরা ফেরির অপেক্ষায় শিমুলিয়া ঘাটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকার পর এই ফেরিটি ঘাটে আসে। তখন ফেরির গাড়ি নামানোর আগেই হাজার হাজার যাত্রী ফেরিতে উঠতে শুরু করে। আমিও কোনোমতে ফেরিতে উঠে এক জায়গায় দাঁড়াই। সকল যাত্রী ওঠার পরও ফেরিটি প্রায় ৩ ঘণ্টা ঘাটে বাঁধা ছিল। যার ফলে ফেরিতে যাত্রীদের গাদাগাদিতে গরমে আমরা ফেরির অনেক যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ি। আমরা যারা মোটামুটি সুস্থ ছিলাম তারা পানি ও বাতাস দিয়ে অসুস্থদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলাম। তবুও চারজন মারা গেল। আর পানিতে লাফিয়ে না পড়লে আরো অনেকেই মারা যেত।

শিবচর থানার ওসি মো. মিরাজুল হোসেন বলেন, প্রচণ্ড গরমে হিট স্ট্রোকে এ সকল ফেরি যাত্রীরা মারা গেছে বলে ধারনা করা হয়েছে। নিহতদের লাশ শনাক্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।



সাতদিনের সেরা