kalerkantho

শনিবার । ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১২ জুন ২০২১। ৩০ শাওয়াল ১৪৪২

ইন্টারনেট আশীর্বাদে ঘুচেছে বেকারত্ব

এমরান হাসান সোহেল, পটুয়াখালী   

১২ মে, ২০২১ ২০:২৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইন্টারনেট আশীর্বাদে ঘুচেছে বেকারত্ব

মাচায় ঝুলছে চিচিঙ্গা, পটোল, শসা, করলা, লাউ, কুমড়া, রক মেনন। গাছভর্তি পেঁপে, বেগুন, মরিচ। মৌসুম অনুযায়ী বাতাসে দোল খায় লালশাক, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ধনেপাতা, পালংশাকসহ নানা জাতের শাকসবজি। এমন দৃশ্য কৃষকের ক্ষেতে স্বাভাবিক। তবে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার চন্দ্রপাড়া গ্রামের কলেজপড়ুয়া যুবক মেহেদি হাসানের গল্পটা ভিন্ন। দৈনিক তার আয় দুই থেকে তিন হাজার টাকা। মাসে প্রায় লাখ টাকা।

বাবা, মা ও চার ভাই-বোনসহ ছয় সদস্যের সংসার। ২০১৬ সালে বাউফল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। বাবা মো. মজিবুর রহমান একজন কৃষক। পুরনো রীতিতে চাষাবাদের আয় থেকে টানাটানিতে চলছিল সংসার। এরই মধ্যে চাকরির নেশা জন্মে মেহেদির মধ্যে। কিন্তু চাকরি তো সোনার হরিণ। তাই তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে পৈতৃক পেশাকে উন্নত করা এবং আয় বাড়ানোর জন্য ব্যাপক কৌতূহলী হয়ে ওঠেন মেহেদি। একটি স্মার্ট ফোন ব্যবহার করেন তিনি। বাবার কৃষিব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে ইন্টারনেটে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করেন। তারপরই পাল্টে যায় সব।

মেহেদি, সহিদুলের কৃষি বাগান :

মেহেদি জানান, তার বাবা যে কৃষিকাজ করে আসছিলেন তা পুরোটাই সনাতনি পদ্ধতির। তাতে পরিশ্রম হয়, অর্থ খরচ হয়; কিন্তু লাভ তেমন একটা পাওয়া যায় না। তাই কিভাবে ক্ষেত তৈরি, চারা তৈরি, জৈবসার তৈরি করা যায়, গ্রিন হাউস করা, কোন সময়ে কোন সবজি বা শাকের আবাদ করতে হবে এবং গাছের পরিচর্যা কিভাবে করা হয় এগুলো ইউটিউব এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ওয়েব পেইজ দেখে রপ্ত করেন। দুই বছর আগে বাবার কাছ থেকে ৬০ শতাংশ জমি নেন। শুরু করেন সবজি আবাদ। শুরুতে পরিবারের কেউ তাকে সমর্থন করেনি। কারণ বর্তমানে বিএ শেষ বর্ষে অধ্যায়ন করা মেহেদি লেখাপড়া করে ভালো চাকরি করবেন। আর এখন মেহেদির চেয়ে পরিবারের অন্য সদস্যরা বেশী দেখভাল করেন তার সবজি বাগান। মেহেদি এলাকায় এখন মডেল। তার সাফল্য ছড়িয়ে পড়ায় উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের লোকজন এখন সার্বক্ষণিক তার বাগানের খোঁজ খবর নেন। মেহেদিকে দেখিয়ে তারা স্থানীয় কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছেন। মেহেদির বাগানে ব্যবহার হয় আধুনিক সব প্রযুক্তি। আগাছা দমন ও মাটির গুনাগুন রক্ষায় ব্যবহার করা হয় মাঞ্চিং ফ্লিম। একটা পরিপাটি বাগান মেহেদির।

মেহেদি দাবি, ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন ইউটিউব চ্যালেন কিংবা ওয়েব সাইড ব্যবহার করে সহজেই জানাযায় কিভাবে কৃষিতে অল্প ব্যয়ে অধিক লাভ করা যায়। এটা খুব সহজসাধ্য। কারণ যত্রতত্র মোবাইলে ইন্টারনেট পাওয়া যায়। কেউ ইংরেজি না পারলে বাংলায় লিখে সার্স দিলেও কৃষি সংক্রান্ত সব তথ্য পাওয়া যায়। এমনকি শাকসবজির নানা রোগ বালাই কিংবা পোকামাকড় দমনের উপায়ও পাওয়া যায়। সফল্য বাড়ায় মেহেদির বাগানের পরিধি বেড়েছে। এ বছর আরো ৩০ শতাংশ যোগ হয়েছে তাঁর বাগানে।

মেহেদি বলেন, আগামী এক বছর পর প্রতিদিন আমার আয় হবে পাঁচ হাজার টাকা। বেকার যুবকরা চাকুরির জন্য না ঘুরে বরং মোবাইল বা কম্পিউিটারের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করে কৃষিতে ঝুঁকলে চাকুরির চেয়ে কয়েকগুণ টাকা আয় করা সম্ভব। একসময় আমি দেখতাম অন্যের করা কৃষি। এখন স্যোসাল মিডিয়ায় উদ্যোমী যুবকরা আমাকে কৃষি খামার দেখে আমার সাথে যোগাযোগ করছে। এটা অনেক বড় অর্জন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ইন্টারনেট ব্যবহার করে কৃষিতে সফল হওয়া মেহেদি এখন অনেকের  জন্য প্রেরণা। সে এত সারা ফেলেছে যে, আমি এবং আমার কার্যালয়ের সংশ্লিষ্টরা নিয়মিত তার কৃষির খোঁজ নিচ্ছি আমরা।

শুধু মেহেদি একাই না। ইন্টারনেট ব্যবহার করে পটুয়াখালীর বিভিন্ন এলাকার যুবকরা স্বাবলম্বী হচ্ছে। তাদেরই আরেকজন একই উপজেলার দাশপাড়া গ্রামের সহিদুল। তিনি বলেন, দুই বছর আগে ১০০ মাল্টা গাছ দিয়ে একটি বাগান করেছি ফলন আসতে শুরু করেছে। এক বছর পর আমার বাগান থেকে প্রায় তিন লাখ টাকার মাল্টা বিক্রি হবে বছরে। পরবর্তী বছর এ আয় আরো বাড়বে। আমি মুগ্ধ, আমি অভিভূত। আমি উদ্বুদ্ধ হয়েছি ইন্টারনেটে ইউটিউব চ্যানেল আর সামাজিক যোগাযোগ মাল্টার চাষ দেখে। আমার বাগানের সফলতা আসতে শুরু করায় উপজেলা কৃষি অফিস নিয়মিত খোঁজ নিচ্ছেন। এখন তারাও আমাকে পরামর্শসহ সার্বিক সহযোগিতা করছেন। কিভাবে আধুনিক কৃষি করতে হবে অল্প পুঁজিতে এবং লাভ বেশী হবে তা ইন্টারনেট কানেন্ট করে একটু চোখ বুলালেই করায়াত্ত করা সম্ভব। আর নেট সার্ভিসকে সরকার থ্রিজির পরির্বতে ফোরজি করায় ব্যবহারে অনেক সুবিদা হয়েছে। যুবকরা সচেতন হয়ে এগিয়ে আসলে বাড়ি বাড়ি খামার হবে অভাব সব ডুবে যাবে।

রিয়াজ, মামুনরাও স্বাবলম্বী :

শুধু কৃষিতেই না। অল্প শিক্ষা অর্জন করে অনেক বেকার যুবক ইন্টারনেট ব্যবহার করে এখন স্বাবলম্বী। বাউফল পৌরশহরের ৭নম্বর ওয়ার্ডের মো. রিয়াজ। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত রিয়াজের লেখাপড়া। রিয়াজ ওই শহরের ধানঁসিড়ি নেটওয়ার্ক নামক একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইন্টারনেটের কোনো একটি সুবিধা নিতে গ্রাহকরা ছুটে যান রিয়াজের ধানঁসিড়ি প্রতিষ্ঠানে। স্থানীয়রা জানান, ভিসার আবেদন, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজে ভর্তির আবেদন, ওয়ান লাইনে পুলিশি প্রত্যায়নের আবেদন, আমেরিকার ডিভি লটারি, চাকুরির আবেদন, কারো ই-মেইল পাঠাতে হবে কিংবা ই-মেইল আসবে অধিকাংশই ছুটে যায় রিয়াজের কাছে।

রিয়াজ বলেন, আমার হাত দিয়ে অনলাইনে আবেদন পূরণ করা অনেকেই চাকরি পেয়ে আমাকে মিষ্টি খাইয়েছেন। রাব্বি নামের আমার এক বন্ধুর ডিবি ফরম পূরণ করেছিলাম সে এখন আমেরিকায়। ইন্টারনেট ব্যবহার করে টাকা আয় করা কোনো জটিল বিষয় না। মনোযোগ দিয়ে কয়েকদিন কাজ করলেই সম্ভব। ইন্টারনেট হাতের নাগালে হওয়ায় কাজগুলো করতে সুবিদা হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার গলাচিপা, রাঙ্গাবালী ও দশমিনা উপজেলার বেকার যুবকরা ইন্টারনেট ব্যবহার করে বেকারত্বকে মুছে ফেলেছেন। এদের মধ্যে রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ এলাকার আল মামুন। গ্রাহককে ইন্টারনেট সুবিদা দিতে মামুন এখন একা পারছেন না। তার ছোট ভাই শাহরিয়ার কবিরকেও যুক্ত করেছেন চরমোন্তাজ স্লুইজ বাজারের দোকানে।

মামুন বলেন, ‘আমরা সাগরের পাড়ের পুরো বিচ্ছিন্ন জনপদের মানুষ। সাগরের ডাক শোনা যায় চর মোন্তাজ থেকে। সরকার বিভিন্ন মোবাইল কম্পানির মাধ্যমে ইন্টারনেট সুবিদা ছড়িয়ে না দিত তা হলে এই চরমোন্তাজের প্রায় ২০ হাজার মানুষের ওয়ান লাইনের কাজ করতে রাঙ্গাবালী, গলাচিপা কিংবা পটুয়াখালী সদরে যেতে হতো। ওয়ানলাইনের এ যুগে ইন্টারনেট সুবিদা আমাদের চরমোন্তাজ বাসীর জন্য একটা আর্শিবাদ।



সাতদিনের সেরা