kalerkantho

শনিবার । ৫ আষাঢ় ১৪২৮। ১৯ জুন ২০২১। ৭ জিলকদ ১৪৪২

স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার ‘আটক’

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

১২ মে, ২০২১ ০২:৪৭ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার ‘আটক’

পাঁচ বছর আগে চট্টগ্রামে বহুল আলোচিত মাহমুদা খানম মিতু হত্যাকাণ্ডে তাঁর স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারকে ‘আটক’ করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তিনি এই হত্যা মামলার বাদী।

গত সোমবার রাতে ঢাকা থেকে বাবুল আক্তারকে চট্টগ্রামে আনা হয়। এরপর গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত পিবিআইয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, মামলার বাদীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। রাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানালেও পিবিআইয়ের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি।

পিবিআইয়ের প্রধান উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেছেন, ‘মামলার বাদীকে চট্টগ্রামে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’ আর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সন্তোষ কুমার চাকমা বলেছেন, ‘এখন পর্যন্ত বাদী চট্টগ্রামে আছেন।’

গতকাল ইফতারের সময় পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগরীর ডিটি রোডের পিবিআই মেট্রো কার্যালয়ে ছিলেন বাবুল আক্তার। ওই সময় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সন্তোষ কুমার চাকমা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মামলার বাদী নিজেই মামলা সম্পর্কে আলোচনার জন্য স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রামে এসেছেন। মামলার তদন্ত বিষয়ে তিনি কথা বলছেন।’ দীর্ঘ সময় ধরে কী আলোচনা হচ্ছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তদন্তাধীন বিষয় নিয়ে এর বেশি বলতে পারছি না।’

তবে রাতে পিবিআইয়ের একটি সূত্র জানায়, বাবুল আক্তারকে কাল (আজ বুধবার) মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করা হবে এবং মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। তিনি ওই হত্যা মামলার বাদী আবার তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তাই তাঁর বিরুদ্ধে নতুন একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হবে বলে আদালতকে জানানো হবে। মামলাটি করা হবে পাঁচলাইশ থানায়, কারণ আগের মামলাটিও একই থানায় করা হয়েছে। আজ বুধবারই মামলাটি দায়ের করবেন মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন।

গতকাল বাবুল আক্তারের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত তিনি চট্টগ্রাম কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন, এটা নিশ্চিত করা গেছে।

বাবুল আক্তারকে মিতু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে পিবিআইয়ের প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মামলার বাদীকে কেন গ্রেপ্তার করা হবে। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তিনি নিজেই চট্টগ্রামে গিয়ে মামলার খোঁজ নিচ্ছেন।’ দীর্ঘ সময় কী নিয়ে আলোচনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেটা তদন্তকারী কর্মকর্তা বলতে পারবেন।’

পিবিআইয়ের আরেকটি সূত্র জানায়, মিতু হত্যা মামলা এবং বাবুল আক্তারের ব্যাপারে তদন্ত নিয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা আছে। এ কারণে বাবুলকে গ্রেপ্তার করে আদালতে উপস্থাপনের আগে তাঁর ব্যাপারে পিবিআই কর্মকর্তারা বক্তব্য দিতে চাইছেন না। কিছু বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদে সদুত্তর না পাওয়ায় বাবুলকে সন্দেহের আওতায় নেওয়া হয়েছে। এরপর রাতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রাখা হয়েছে। কিছু ব্যাপারে যাচাই করে তদন্তকারীরা নিশ্চিত হলে বাবুলকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আজ বুধবার আদালতে উপস্থাপন করা হতে পারে।

২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড়ে ছেলেকে স্কুলের বাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় মাহমুদা খানম মিতুকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ওই সময় পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। চট্টগ্রামে ফিরে তিনি পাঁচলাইশ থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলায় তিনি বলেন, তাঁর জঙ্গিবিরোধী কার্যক্রমের জন্য স্ত্রী হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকতে পারেন। এরপর দেশব্যাপী জঙ্গিবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান চালায় পুলিশ। ওই সময় বেশ কয়েকজন কথিত জঙ্গি বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। তবে সপ্তাহ দুয়েকের মাথায় মিতু হত্যার তদন্ত নতুন মোড় নেয়।

হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল আক্তার প্রথমে ঢাকার মেরাদিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে উঠেছিলেন। সেখানে তাঁর এক শ্যালিকার সঙ্গে তাঁর দ্বিতীয় বিয়ের প্রচেষ্টা হয়েছিল—এমন দাবি করে তিনি শ্বশুরবাড়ি থেকে অন্য বাসায় গিয়ে ওঠেন। এর পর থেকে বাবুল আক্তারের শ্বশুর মোশাররফ হোসেন ও শাশুড়ি সাহেদা মোশাররফ অভিযোগ করে আসছেন, বাবুল আক্তারই মিতুকে হত্যা করেছেন। কিন্তু বাবুল আক্তার বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছিলেন। পুলিশের তরফ থেকে কখনোই এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে কিছু বলা হয়নি। গোয়েন্দা বিভাগ মাত্র দুইবার বাদী বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।

হত্যাকাণ্ডের কিছু দিনের মাথায় ২০১৬ সালের ২৪ জুন বাবুল আক্তারকে ঢাকায় পুলিশের গোয়েন্দা শাখার কার্যালয়ে এনে প্রায় ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর তাঁর শ্বশুরের বাসায় পৌঁছে দেওয়া হয়। পরে পুলিশ জানায়, বাবুল চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। অবশ্য বাবুল আক্তার দাবি করেন, তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেননি। পদত্যাগপত্র প্রত্যাহারের জন্য ৯ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবের কাছে তিনি আবার আবেদন করেন। ৬ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘বাবুলের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হলো।’

তবে ওই বছর জুন মাসে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর মধ্যে তিনজন চট্টগ্রামের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দি দিয়ে ওয়াসিম নামের এক আসামি জানিয়েছিলেন, মুছা, নূরুন্নবী, কালু ও তিনি মিতু হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলেন। মুছা হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী। এরপর গ্রেপ্তার হয়েছিলেন হত্যাকাণ্ডে অস্ত্র সরবরাহকারী এহতেশামুল হক ভোলা। পরে ভোলার সহযোগী মনিরের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পিস্তলটি উদ্ধার করা হয়। এই পিস্তল দিয়েই মিতুকে গুলি করা হয়েছিল বলে তদন্তে বেরিয়ে আসে। ওই সময় কথিত বন্দুকযুদ্ধে রাশেদ ও নূরন্নবী নিহত হয়েছিলেন। হত্যাকাণ্ডের পর মুছাকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে—মুছার স্ত্রী এমন দাবি করলেও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ ওই সময় মুছাকে গ্রেপ্তারের তথ্য স্বীকার করেনি। এখন পর্যন্ত মুছার হদিস পায়নি পুলিশ।

শুরু থেকে চট্টগ্রাম পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) মামলাটির তদন্ত করে। তারা প্রায় তিন বছর তদন্ত করেও অভিযোগপত্র দিতে ব্যর্থ হয়। পরে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে আদালত মামলাটির তদন্তের ভার পিবিআইকে দেন।



সাতদিনের সেরা